“সফল ও গ্রহণযোগ্য বক্তব্য দেওয়ার ১০ টি বৈজ্ঞানিক কৌশল”

সাবলীলভাবে সুন্দর বক্তৃতাকে একটি শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয়। বক্তৃতা অর্থ- ভাষণ, বাক-বিন্যাস, বাকপটুতা ইত্যাদি। একজন বক্তা যখন কোন নিদিষ্ট বিষয়ে যথার্থভাবে ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং টার্গেটে জনসাধারণের সামনে সাবলীলভাবে বলে যাওয়া শব্দমালাকে বক্তৃতা বলে।

বক্তৃতার মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন সফল নেতা, একজন সফল শিক্ষক ও একজন সফল ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন পেশা এবং কর্মে সফল হতে গেলে ভালো বক্তা অবশ্যই হতে হবে। বলা হয় ” কথা হলো এক প্রকার জাদু বা হাতিয়ার, যা দ্বারা মানুষের মনকে শিকার বা বশীভূত করা যায় এবং নিজের ইচ্ছাকে অন্যের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া যায়। ” সুতরাং, সুন্দর ব্যক্তিত্বের বিকাশ, নিজের চিন্তাধারাকে প্রচার ও স্বীয় কথার জাদুর মাধ্যমে অনেকের মাঝে নিজেকে নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তুলে এক সফল জীবন গড়তে একজন সফল বক্তা হওয়ার কোন বিকল্প নেই।

সাবলীল ও সুন্দর বক্তৃতা দেওয়া বেশকিছু কার্যকারী কৌশল দেওয়া হলোঃ

১)বক্তৃতার বিষয়ে যথার্থ ধারণাঃ

ঢাল- তলোয়ার ছাড়া যেমন যুদ্ধ করা যায় না। ঠিক তেমনি, সুন্দর বক্তৃতা দেওয়া জন্য অবশ্যই বক্তৃতার বিষয় সম্পর্কে যথার্থ ধারণা রাখা প্রয়োজন। আপনি কোন বিষয়ে বক্তৃতা করবেন, তা আগে থেকেই জেনে নিন। নিদিষ্ট বিষয়ের উপর পড়াশোনা করুন এবং এ ধরনের বিভিন্ন বক্তব্য শুনুন। একটি ভালো বক্তৃতার জন্য প্রয়োজনীয় দিক হচ্ছে আপনার বক্তৃতা জন্য তৈরি স্কিপ্ট। পৃথিবীর সকল সফল বক্তা নিজের বক্তৃতা স্কিপ্ট নিজেই তৈরি করতেন।

২) দর্শক সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণাঃ

বক্তা হিসেবে অবশ্যই আপনার দর্শকের সম্পর্কে ধারণা রাখা প্রয়োজন। আপনার দর্শকদের বয়স, পেশা, কি ধরনের বক্তব্য তা শুনতে চায়, তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং জ্ঞানের পরিসরকে বিবেচনা করে অবশ্যই আপনার বক্তব্যকে সাজাতে হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও শহুরে জনগোষ্ঠীর কাছে করোনা সচেতনতা নিয়ে বক্তৃতা কিন্তু একই রকম দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, দুই জায়গায় মানুষের জ্ঞানগত ও আচার-আচরণগত পার্থক্য বিদ্যমান। ফলে, একই বক্তৃতা দিয়ে তাদেরকে মূল বিষয়টি বুঝানে কঠিন।

৩) নিজের সুস্পষ্ট ও সুচিন্তিত মতামত প্রকাশঃ

একজন বক্তা তার বক্তব্য ব্যাপারে সুস্পষ্ট ও সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করা আবশ্যক। আপনি বক্তা হিসেবে যে বিষয়ের বক্তব্য রাখবেন, সে বিষয়ে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তা না হলে, বক্তৃতার মাঝে গোঁজামিল সৃষ্টি হয়। এতে করে দর্শকদের বক্তার উপর বিরূপ ধারণা তৈরি হয়।

৪) প্রেক্ষাপট দিয়ে বক্তব্য শুরুঃ

বাংলাদেশে কোথাও বক্তৃতা দিয়ে গেলে অবশ্যই সেখানকার কিছু সাধারণ প্রচলন রীতি থাকে। ধরুন, আপনি কোথাও বিজয় দিবসের মাহাত্ম্য নিয়ে বক্তব্য রাখবেন। প্রথমেই আপনাকে অনুষ্ঠান আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো, উপস্থিত বিশেষ অতিথিদের ও শ্রোতাদের শুভেচ্ছা জানাইয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন। এতে করে শ্রোতাদের আর্কষণ আপনার বক্তৃতার প্রতি কেন্দ্রীভূত করা সহজ হয়।

৫) আত্নবিশ্বাসের সাথে কথা বলাঃ

জীবনে যেকোনো কাজে আত্নবিশ্বাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আত্নবিশ্বাস যেকোনো কাজে সফলতা আসা সম্ভাবনার উপর প্রভাব ফেলে। তাই নিজের মধ্যে আত্নবিশ্বাসের জন্ম দিন। বক্তৃতা দেওয়া সময় ভাবুন, আপনি অনেককিছু জানেন বিধায় আপনাকে বক্তৃতা বানানো হয়েছে। আপনিই আপনার বক্তব্যের বিষয়ে শ্রোতাদের থেকে বেশি জানেন। নিজের প্রস্তুতি ও যোগ্যতার উপর বিশ্বাসী হয়ে নিজের উপর আস্হা রাখুন। এতে করে আপনার বক্তৃতা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

৬) বার বার অনুশীলনঃ

ইংরেজি প্রবাদ আছে, ” Practice makes a man perfect “.অথ্যাৎ অনুশীলনই একজন মানুষকে তার কাজের জন্য দক্ষ করে তুলে। বক্তৃতা দেওয়া সময় আমাদের সবার মধ্যে একধরণের ভয় ও অস্থিরতা কাজ করে। চমৎকার বক্তব্য দিতে হলে ঝেড়ে ফেলতে হবে এসব ভয় ও অস্হিরতা। আয়নার সামনে অথবা বন্ধুদের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করে দিন এবং খুঁজে বের করুন নিজের দুর্বলতাগুলো। নিজের বক্তব্যকে রের্কড করে শুনতে পারেন। এতে করে খুঁজে পাবেন নিজের দুর্বলতাসমূহ এবং সে অনুযায়ী কিভাবে আরো ভালো করা যায় তা নির্ধারণ করে অনুশীলন করতে পারেন নিজে নিজে।

০৭) ভাষাগত মান উন্নয়নঃ

শুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণ শুনতে সবারই ভালো লাগে। একটি প্রানবন্ত ও ভালো বক্তব্য এর প্রধান শর্ত শুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণ।আন্ঞলিকতা পরিহার করে শুদ্ধভাষী হওয়া উচিত। তাছাড়া, বক্তব্যকে একনাগাড়ে বলার চেয়ে ছোট ছোট বাক্যে বলা উচিত। এতে করে আপনার বক্তৃতা সবার বোধগম্য ও শ্রুতিমধুর হয়ে উঠবে।

০৮) তথ্যসমৃদ্ধ কিন্তু সংক্ষিপ্ত বক্তব্যঃ

অনেক বক্তা আছেন, যারা শ্রোতাদের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তব্য রাখাকে তাদের বক্তব্যে সফলতা হিসেবে দেখেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় বক্তব্য শুনতে গিয়ে শ্রোতারা বক্তব্যে প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাই, আপনার বক্তব্যকে যত তথ্যবহুল করতে পারেন এবং সেটা সহজ ভাষায় শ্রোতাদের সামনে সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করতে পারেন তত ভালো। সেজন্য নিজের বক্তব্যকে কয়েকটা ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে নিন। সেসব ভাগের জন্য সময় নিধারণ করুন এবং সে সময়ে মধ্যে সেগুলো বলার চেষ্টা করুন। আপনি হইতো ১০ মিনিট সময় পেয়েছেন বক্তব্য রাখার জন্য কিন্তু ৭ মিনিটে আপনার বক্তব্য শেষ হয়ে গেলো। এতে আপসোস করার কিছুই নেই। চেষ্টা করুন ৭ মিনিট সময়কেই তথ্যবহুল করে তুলতে। এতে করে আপনার বক্তৃতা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

আমেরিকান সাবেক রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট নিজের পুত্র জেমসকে ভাষণের মুলমন্ত্র
দিয়েছিলেন, তোমাকে যখনই বলতে বলা হবে –
” সত্য বল, সরল বল, সংক্ষিপ্ত বল এবং বসে পড়।”

০৯) বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও হাসিমুখঃ

শ্রোতাদের মনোযোগ আর্কষণ করতে আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও হাসিমুখ অনেকখানি প্রভাব ফেলতে সক্ষম। আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও হাসিমুখ আপনার ভিতরে আত্মবিশ্বাসকে আরো বৃদ্ধি করতে পারে। বক্তৃতা দেওয়া সময় সোজাভাবে আরামে দাঁড়াবেন। বক্তব্যের প্রয়োজনে রুচিসম্মত অঙ্গভঙ্গি করবেন। আপনার হাসিমুখ শ্রোতাদের আপনার বক্তব্য শুনতে আরো আগ্রহী করে তুলবে। শ্রোতাদের দিকে মুখ করে চোখে চোখ রেখে বক্তৃতা করুন। অতি উচ্চস্বর ও নিন্মস্বর পরিহার করুন। বক্তৃতা দেওয়া সময় আবেগে উত্তেজিত হয়ে উঠবেন না।

১০) সাহিত্যরস ও মজাদার কথা বলাঃ

দীর্ঘ সময় একটানা বক্তব্য শুনতে কারোই ভালো লাগে না। এক রকম বিরক্তি সৃষ্টি হয় একই ধরনের বক্তব্য শুনতে। একজন ভালো বক্তা, শ্রোতাদের মনোযোগ ধরে রাখতে বিভিন্ন ধরনের মজার কথা, কবিতা, পঙক্তি বা প্রবাদ বলতে পারেন। এতে করে, শ্রোতা বক্তার বক্তব্যে উপর বিরক্ত বোধ করে না। পাশাপাশি বিভিন্ন উদাহরণও দিতে পারেন বক্তব্য দেওয়ার সময়। এতে করে শ্রোতা আপনার বক্তব্যে উপর আরো মনোযোগ সৃষ্টি করবে।

আমেরিকান খ্যাতমাম বক্তা উইলিয়াম জেনিং ব্লায়ান তার প্রথম বক্তৃতা করার সময় কম্পনের ফলে তাঁর হাঁটুদ্বয় জোড়া লেগে গিয়েছিল। বিশ্ববিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েন প্রথম দিন বক্তৃতা করতে উঠলে এমন অনুভব করেন – তাঁর মুখগহ্বর তুলা দিয়ে পরিপূর্ণ এবং তাঁর নাড়ীর স্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। তাই, ভয়কে জয় করতে হবে। সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আপনিও হয়ে উঠুন একজন সফল বক্তা।

লেখক
মোঃ ফাহাদ হোসেন ;
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর