আদিতমারীতে ইউএনও-উপজেলা চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্ব তুঙ্গে

লালমনিরহাটের আদিতমারীতে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে থানায় এবং জেলা প্রশাসক এর কাছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর অভিযোগসূত্রে জানা যায় গত বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) মাসিক সমন্বয় সভায় ভিজিডি ও মাতৃত্ব ভাতার তালিকায় নিজের অংশ দাবি করেন উপজেলা চেয়ারম্যান। যা বিধিসম্মত না হওয়ায় ইউএনও নাকোচ করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সভা অসমাপ্ত রেখে চলে যান চেয়ারম্যান।

এরপর চেয়ারম্যান ইউএনও অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরা লোক মারফতে খুলতে গেলে তার ছবি তোলেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন। একইসঙ্গে ক্যামেরা খুলে ফেলার কারণ জানতে চাইলে ইউএনওকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করেন চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস।

এ সময় চেয়ারম্যান ইউএনওকে বলেন, ‘বেশি কথা বললে পিটিয়ে নরসিংদী পাঠিয়ে দিবো। উপজেলা পরিষদ কি তোর বাবার সম্পত্তি, উপজেলা পরিষদ কি তুই চালাবি?’।এভাবে গালমন্দ করে হত্যার হুমকি দেন।এ ঘটনায় ওই দিন রাতে ১৭ জন অফিসার ও ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

এরপর একই ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে রোববার (১৫ নভেম্বর) বিকেলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করে আদিতমারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি ৫৫৮) করেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন। একই দিন উপজেলার উন্নয়ন তহবিলের ইউএনওসহ যৌথ স্বাক্ষরিত ১৯টি চেকের পাতা ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ উঠে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এর বিরুদ্ধে।এ ঘটনায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্টানোটাইপিস্ট হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে রোববার (১৫ নভেম্বর) আদিতমারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি ৫৫৯) করেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সব ক্ষেত্রে ইউএনও’র অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়গুলো এখন সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। তাই সাধারণ জনগনের নজর ভিন্ন দিকে প্রভাবিত করতে নাটক করছেন ইউএনও। তিনি আরো বলেন- আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিশেষ স্বার্থান্বেসী প্রভাবশালী মহলের সাথে যোগ সাজস করে আমাকে বিপদে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবারের ঘটনা সম্পর্কে ফারুক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগী ব্যক্তির নামের তালিকাকরণ ও সুবিধা প্রদানে ব্যাপক অসঙ্গতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে মাতৃকালীন ভাতার চেক ইস্যু করার পরেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসেবে টাকা না থাকায় জনসাধারণ হয়রানি হয়ে আসছে।

এসব বিষয় নিয়ে প্রতিদিন পরিষদে হয়রানীর শিকার ভুক্তভোগীরা হট্টগোল করে। যা আমার স্বাভাবিক কাজের পরিবেশকে বাধাগ্রস্থ করছে। বিষয়গুলো ১২ নভেম্বর মাসিক সমন্বয় সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্বশীল ও অনিয়ম না করার তাগিদ দেওয়া হয়।

এতে আকস্মিক ভাবে ইউএনওসহ ঐ কর্মকর্তা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে অশোভন আচরণের চেষ্টা করলে আমি নিজের সম্মান রক্ষার্থে উঠে কক্ষে যাই। সেখানে সিসিটিভি’র সংযোগটি বিচ্ছিন্ন মনে হওয়ায় আমার ব্যক্তিগত সহকারী হুমায়ূন দেখতে বলি। সে দেখার চেষ্টা করলে ইউএনও এসে হুমায়ূনকে অশালীন আচরণ করে মারপিট করতে তেড়ে যায়।

এসময় সে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ করে এবং বলে ব্যাটা তোর কোন বাবার ওর্ডারে এখানে উঠেছিস। মোবাইল কোর্ট করে চৌদ্দ শিকের ভাত খাওয়াই ছেড়ে দিবো। তোর কোন বাপ আছে তোকে বাঁচায় দেখবো। হুমায়ূন হতবম্ব হলে আমি এগিয়ে যাই এবং বলি সংযোগটি ছেঁড়া মনে হল, তাই আমি উঠতে বলেছি। আমার কথা শেষ না হতেই ইউএনও পরিস্থিতি উতপ্ত করে।

এসব ঘটনায় তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন এবং সোমবার (১৬ নভেম্বর) রাতে ইউএনওর বিরুদ্ধে আদিতমারী থানায় একটি জিডি (নং ৬১২) করেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন,মনসুর উদ্দিন এই উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর উপজেলাটিকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছেন। প্রত্যেকটি কাজেই উৎকোচ আদায় করেন তিনি। তার অনিয়ম দুর্নীতিতে ঠিকাদার, ইউপি চেয়ারম্যান, অধ:স্তন কর্মকর্তারা অতিষ্ট হয়ে উঠেছেন। কিস্তু ভয়ে কেউ-ই মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।

ইউএনও মনসুর উদ্দিন কাল্পনিক প্রকল্প দেখিয়ে এবং একই প্রকল্প বারবার দেখিয়ে সরকারের অপ্রত্যাশিত খাতের টাকা নিজের খেয়াল খুশিমত ব্যক্তিগত কাজে খরচ করছেন। পূর্বের গাড়িচালক আজিজুলকে দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়ে তার মাধ্যমে উপজেলা চত্তরের গাছ কেটে সাবার করেছেন। তার মাধ্যমে সরকারী গাড়ি ব্যবহার করে চাকুরির প্রলোভন, ঠিকাদারি কাজ দেয়ার কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে আর্থিক অনিয়ম করেছেন। পরবর্তীতে নিজের পিঠ বাঁচাতে গাড়ি চালক আজিজুলকে সাময়িক বহিস্কার করে নিজে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

শুধু তাই নয়, হাট-বাজারের ইজারার ২০ শতাংশ টাকা ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার নিয়ম থাকলেও সেই টাকা তহবিলে রেখে তাদের হয়রানি করেন। পরে মোট টাকার ১০ শতাংশ টাকা কমিশন নিয়ে ছাড় করেন তিনি। প্রত্যেকটি উন্নয়ন কাজে নিজের পছন্দসই ঠিকাদার নিয়োগ ও কোন কোন কাজের ঠিকাদারি নিজেই করেন। এক্ষেত্রে কোন নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। বর্তমানে কোন রেজুলেশন ছাড়া উপজেলা কোয়ার্টার মেরামতের কাজ তিনি নিজেই করছেন।

এছাড়াও, মুজিবশতবর্ষ উদযাপনের নাম করে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি করে সেই টাকা নিজে আত্মসাৎ করেছেন ইউএনও।এসবের প্রতিবাদ করায় ইউএনও তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যান্য দপ্তর প্রধানদের উষ্কে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ১২নভেম্বর জেলা প্রশাসকের নিকট তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট, কাল্পনিক অভিযোগ দিয়েছে বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস।

অপরদিকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে ৯ দফা অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাব করেছেন উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা।

গতকাল মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের কাছে অনাস্থার প্রস্তাবটি জমা দেন ইউপি চেয়ারম্যানরা।

উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের অভিযোগে জানা গেছে, আদিতমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুর কায়েস নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন সময় ইউপি চেয়ারম্যানসহ সব কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ ও দুর্নীতি করে আসছেন।

এ কারণে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৯ দফা অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাব করেন ইউপি চেয়ারম্যানরা।

অভিযোগসূত্রে জানা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন তহবিল (এডিপি) উন্নয়নমূলক কাজের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জোর করে সিংহভাগ নিজের নামে নেন এবং খেয়াল খুশিমত ব্যয় করেন এবং ওই প্রকল্পের কাজ শেষ না হতেই জোরপূর্বক বিল উত্তোলন করেন।সভা চলাকালীন সদস্যদের অশালীন ও অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করেন।

গত বছর মাতৃত্ব ভাতার ৪০টির মধ্যে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান একই সবগুলো বন্টন করেন। বিধি অনুসরণের কথা বলায় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করেন।সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাতাভোগীদের তালিকা প্রণয়নে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিজেই সিংহভাগ দাবি করেন। যা বিধিবর্হিভূত বলে কর্মকর্তারা জানালে তাদের ও ইউপি চেয়ারম্যানদের ওপর ক্ষেপে গিয়ে অশালীন আচরন করেন এবং সদস্যদের হুমকি দেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।

এ ছাড়াও উপজেলা পরিষদের সভায় নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। এরপরও তিনি টিআর খাবিখা প্রকল্পের একক সিদ্ধান্তে ২৫ শতাংশ একাই ইচ্ছেমত বাস্তবায়ন দেখিয়েছেন। প্রায় সব সরকারি কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থেকে মোবাইল বন্ধ রাখেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। ফলে সরকারি কাজ চরম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিজের অংশ দাবি করেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।

বিধিসম্মত না হওয়ায় দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে মোবাইলে ইউপি চেয়ারম্যানদের অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ ও হুমকি দেন। নিজের ভাগ না পেয়ে হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড় দেননি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস। ফলশ্রুতিতে উপজেলার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।তাই উপজেলার উন্নয়নের স্বার্থে ৮ জন ইউপি চেয়ারম্যান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জ্ঞাপন করেন।

ইউপি চেয়ারম্যানদের অনাস্থার প্রস্তাবটির অনুলিপি স্থানীয় সংসদ সদস্য সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে পাঠানো হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, আদিতমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সব ইউপি চেয়ারম্যানদের অনাস্থার প্রস্তাবটি পেয়েছি।উপজেলা পরিষদ বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।সেই সাথে সকল অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বার্তাবাজার/অমি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর