উপকূলীয় বিশ্ববিদ্যালয় খ্যাত নোবিপ্রবির গল্প

উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয় জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে গড়ে তোলে। আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভরশীল উন্নত জাতি গঠনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেক। ২০০১ সালের ১৫ জুলাই, বৃহত্তর নোয়াখালীবাসীদের জীবনে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে লেখা থাকবে। মহান জাতীয় সংসদে এ দিনে পাস হয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন। যার ওপর ভিত্তি করে দেশের ২৭তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)।

২০০১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মাধ্যমে কাগজে- কলমে যাত্রা শুরু করলেও ২০০৬ সালের ২২ জুন দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ‘উপকূলীয় অক্সফোর্ড’ খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টি একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি সূচনালগ্ন থেকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে।

বর্তমানে ১০১ একরের নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি অনুষদ, ২টি ইনস্টিটিউট, ২৮টি বিভাগের অধীনে ৭ হাজার শিক্ষার্থী। প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষক এবং ৪ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে নোবিপ্রবি পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের চালু রয়েছে ৩টি হল- ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হল, হযরত বিবি খাদিজা হল, সাবেক স্পীকার আব্দুল মালেক উকিল হল। এছাড়া ২টি হল চালু হওয়ার পথে। হল দুটি হলো- ৫৫০ শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও ৬৫০ নারী শিক্ষার্থীর আবাসনের জন্য বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুনন্নেছা মুজিব হল।

১০ তলা বিশিষ্ট ২টি একাডেমিক ভবন, ৪ তলা বিশিষ্ট আধুনিক লাইব্রেরি ভবন, অতিথিদের জন্য ৩ তলা বিশিষ্ট ভিআইপি গেস্ট হাউস রয়েছে। এছাড়া ৫ তলা বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস ভবন, ৫ তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন, বৈদ্যুতিক লাইনসহ ১ হাজার কেবিএ বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ৩শ’ লাইন বিশিষ্ট বিটিসিএলের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও ৫শ’ লাইন ক্ষমতা বিশিষ্ট পিএবিএক্স এক্সচেঞ্জ স্থাপন করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাতটি বাস ও পাঁচটি ভাড়ায় চালিত বিআরটিসির দোতালা বাস , শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৩টি সিভিলিয়ান বাস ও ৪টি মাইক্রোবাস রয়েছে। নোবিপ্রবি পরিবারের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পুকুরের সৌন্দর্য বর্ধনে চারপাশে বৃক্ষরোপণ, দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং চারপাশ বর্ণিল আলোয় সজ্জিত করা হয়েছে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মোবাইল অ্যাপস অ্যান্ড গেইম ডেভেলপমেন্ট ল্যাব এবং একটি নেটওয়ার্কিং ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।

বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহের মধ্যে ১০ তলা বিশিষ্ট বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ১০ তলা বিশিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা টাওয়ার, হাউস টিউটর, স্টাফ কোয়ার্টার ও প্রভোস্ট টাওয়ার নির্মাণাধীন। একতলা কেন্দ্রীয় মসজিদ, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট ভবন এর নির্মাণ কাজ চলমান। সম্প্রতি তিন তলা ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন। একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধা- মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য এসব সেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনে কার্যক্রমে সারা বছরই মুখরিত ১০১ একরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, নোবিপ্রবি ডিবেটিং সোসাইটি, মডেল ইউনাইটেড নেশন্স, বিজনেস ক্লাব, রয়েল ইকোনমিকস ক্লাব, সিএসটিই ক্লাব, লুমিনারি, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, কালের কণ্ঠ শুভসংঘ, শব্দকুটির, অভিযাত্রিক ব্লাড ব্যাংক, এনএসটিইউ ব্লাড ডোনার সোসাইটি, নোবিপ্রবি থিয়েটার ইত্যাদি।

শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। রয়েছে অবিস্মরণীয় সাফল্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ফিশারিজে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পোস্টার প্রেজেন্টেশনে ২১ জনের মধ্যে সেরা ১০ জন প্রতিযোগী নির্বাচিত হন। শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে চীন ও ভারতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ‘শিক্ষার্থীদের নোবেল’ নামে খ্যাত হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় সফলতা লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ ম ব্যাচের শিক্ষার্থী কাউসার আলম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণামূলক কাজের স্বীকৃত হিসেবে অর্জন করেছেন বিভিন্ন আন্তজাতিক পদক। বর্তমানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে দেশীয় ও আন্তজাতিক জার্নালে।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সুনাম রয়েছে। ফিমস বিভাগের অধ্যাপক ড. বেলাল হোসেন ছয়টি নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী আবিষ্কার করেন।এরমধ্যে ‘নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া’ নামটি নোবিপ্রবির নামে নামকরণ করা হয়। মাইক্রো বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দ্রুত করোনা সনাক্তকারী যন্ত্রের আবিষ্কারে আবদান রাখেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সাথে যৌথ গবেষণায় ড. ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বে নোবিপ্রবি গবেষক দল বর্জ্য পানিতে কোভিড -১৯ ভাইরাসের উপস্থিত শনাক্ত করে।

বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. সুবোধ কুমার সরকার জাপানের হিরোশাকি ইউনিভারসিটি অব হেলথ সায়েন্সের সাবেক বিখ্যাত প্রফেসর ড. জিন ইচি সাসাকির সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রথম তিন ধরনের কালো রসুন উদ্ভাবন করেন। যার নাম- নোবিপ্রবি-বিজি-১ (ডিএল-বিজি), নোবিপ্রবি-বিজি-২ (ডিএস-বিজি) ও নোবিপ্রবি-বিজি-৩ (সিএল-বিজি)। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে দেশীয় ও আন্তজাতিক জার্নালে।

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে দেশমাতৃকা সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রো বায়োলজি বিভাগের ল্যাবে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের কোভিড -১৯ নমুনা শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে। বর্তমানে নোবিপ্রবি ও নর্থ সাউথ বিশ্বববিদ্যালয়ের গবেষক দল যৌথভাবে কোভিড -১৯ ভাইরাসের জীবনরহস্য উন্মোচনের জন্য গবেষণা করছে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সফলতার উপর ভর করে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের প্রথম সারির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবে এমন আশা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের উপকূলীয় জনপদের আলোর দিশারী হয়ে উঠুক ১০১ একরের নোবিপ্রবি নামক এ স্বপ্নপুরী।

লেখক
মোঃ ফাহাদ হোসেন
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর