শেরপুরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরী হচ্ছে শিশু খাদ্য ও ভেজাল জুস

বগুড়ার শেরপুরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরী এবং মোড়কজাত করা হচ্ছে তাল মিশ্রি, সুজি, আটা, চাল, জুস ও বিভিন্ন ভেজালযুক্ত শিশু খাদ্য। এসব খাবার খেয়ে নানারকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশিরভাগ শিশু ও বৃদ্ধ মানুষ। উপজেলা প্রশাসন উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিভিন্ন লুকায়িত স্থানে গড়ে উঠেছে এসব কারখানা।

এসব কারখানার মালিকদের নেই বিএসটিআই এর অনুমোদন, নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন, নেই অগ্নি সনদ, নেই ট্রায়াল ব্যাসেজে খাদ্য প্রস্তুতের জন্য বিসিকের কোনো নিবন্ধন কিংবা খাবার তৈরী ও মোড়কজাতের মাননিয়ন্ত্রণের নূন্যতম ব্যবস্থা। এভাবে উৎপাদিত খাদ্য এবং মোড়কজাত শিশু খাদ্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের খন্দকার টোলা মাজারের উত্তর পাশে লুকায়িত স্থানে রুদ্র ফুড প্রোডাক্টস এর কারখানায় গিয়ে এসব চিত্র দেখা গেছে। বাহিরে থেকে বোঝার উপায় নেই ওই স্থানে কোনো কারখানা রয়েছে। কড়া নেড়ে ভিতরে ঢুকতেই লক্ষ্য করা যায় নোংরা একটি গাদযুক্ত গামলার ভেতরে রাখা মিশ্রি মোড়কজাত করা হচ্ছে। পাশেই পরে আছে জাল দেয়া চিনির গাদ যা দিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আরেক ঘরে চলছে নোংরা চাল, আটা ও সুজি মোড়কজাতকরনের কাজ। ওই কারখানাটিতে শিশুরাও কাজ করছে। তার মধ্যে একটি শিশুর নাম- রহমত আলী (৯)। অন্য শিশুদের নাম জানা যায়নি। সেখানে কর্মরত কোনো শ্রমিকের হাতেই নেই গ্লাভস। মাটিতে পরে আছে মিশ্রি, চাল, সুজি যার ওপর দিয়ে হাটাহাটি করে কাজ করছে শ্রমিকরা। এসব ময়লাযুক্ত নিম্নমানের মিশ্রি, চানাচুর, সরিষার তেল, জান্নাত ফ্রুটো জুস, চাল, সুজিতে মানহীন কেমিক্যাল ব্যবহার করে প্রতিদিন প্যাকেটজাত করা হচ্ছে শতশত মন খাদ্য সামগ্রী যাতে দেয়া হচ্ছে ইচ্ছে মত উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ন তারিখ। সরবরাহ করা হচ্ছে সারা বাংলাদেশে।

তবে ভিতরে ঢ়ুকতেই ঘরের ভেতরে আরএকটি ঘরে তারাতারি করে তালা মেরে দেয় কারখানার লোকজন। জিজ্ঞাসা করলে বলা হয় ওই ঘরে লাগানো তালার চাবি আমাদের কাছে নেই, ওই ঘরে প্রবেশ নিষেধ। পরে বাহিরে বের হয়ে তালা লাগানো ওই ঘরের বিষয়ে প্রতিবেশিরা জানান, কাশমিরি চিনিগুড়া নামক চাল, সুজি, মিশ্রি মোড়কজাতের সময় এখানে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় এবং এই কোম্পানির আরেকটি কারখানার কিছু কেমিক্যালও এখানে আনা-নেওয়া করতে দেখা যায়। যখন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় তখন আশেপাশে গন্ধ ছড়িয়ে পরে এবং খাদ্যে ব্যবহিত বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালগুলো তালা লাগানো ওই ঘরেই রাখা হয়।

প্রতিবেশি আয়নাল হক জানান, আমার বাড়ির ভেতরে আগে কেমিক্যাল মেশানো পানি গড়ে আসত এবং খুব দুর্গন্ধ সৃষ্টি হতো, পরবর্তীতে কারখানায় অনেকবার অভিযোগ জানানোর পর অন্য দিক দিয়ে পানি গড়ানো হয়।

ওই কোম্পানির আরেকটি কারখানা একই ইউনিয়নের খন্দকারটোলা দক্ষিণ পাড়া এলাকায়। সেখানেও একই ভাবে নোংরা পরিবেশে অনুমোদন ছাড়াই তৈরী ও প্যাকেটজাত করা হচ্ছে বিভিন্ন নামীয় ভেজাল সরিষার তেল, “জান্নাত ফ্রুটো নামক ভেজাল জুস, চানাচুর, লাচ্চা-সেমাই, মরিচগুড়া, হলুদগুড়া, বিভিন্ন মুখরোচক খাবারসহ সর্বমোট ৫১ টি আইটেম। সেখানেও প্রবেশের ব্যাপারে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। আসলে দীর্ঘদিন যাবৎ এই ধরনের কারখানাগুলিতে নাম মাত্র ভেজাল বিরোধী অভিযান করায় যত্রতত্র গড়ে ওঠা কোম্পানির মালিকরা এভাবে বেপরোয়া ভাবে মানহীন খাবার তৈরী করে বাজারে সরবরাহ করছে। নিম্নমানের ডালডা আর পোড়া তেল দিয়ে তৈরী হচ্ছে শিশু খাদ্য ও অন্যান্য মুখরোচক খাদ্য। আর নিম্নমানের রং ও কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরী হচ্ছে হুবহু প্রাণ ফ্রুটোর মতো জান্নাত ফ্রুটো জুস।

এসব চিত্র দেখার পর কথা হয় রুদ্র ফাউন্ডেশন ও রুদ্র ফুড প্রোডাক্টস এর মালিক মো: রঞ্জু সরকারের সাথে। এমন অস্বাস্থ্যকর-নোংরা পরিবেশে এসব ভেজাল ও মানহীন মিশ্রি, ভেজাল জুস, সরিষার তেল ও অন্যান্য বাচ্চাদের মুখরোচক খাদ্য তৈরী এবং প্যাকেটজাতের অনুমোদনের ব্যাপারে তিনি বলেন, খন্দকার টোলা মাজার এলাকার কারখানায় মিশ্রি, সুজি, চাল, ও আটা উৎপাদন এবং মোড়কজাত করা হয় যার কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। আর খন্দকারটোলা দক্ষিণ পাড়া এলাকার কারখানায় তৈরী করেন লাচ্চা-সেমাই, সরিষার তেল, চানাচুর, ঝালমুড়ি ও অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী যা নাকি বিএসটিআই অনুমোদিত। তবে তার পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারেননি তিনি। এগুলো আমি গত দের বছর যাবৎ ট্রায়াল ব্যাসেজে তৈরী ও মোড়কজাত করছি বলে জানান তিনি।

তার অফিসে রাখা জান্নাত ফ্রুটো নামক ভেজাল জুস দেখলে জুসের ব্যাপারে তিনি বলেন, এই জুসও নাকি ট্রায়াল ব্যাসেজে অন্য এক ক্লিনিকের ছাদে তৈরী করছেন তিনি।

এরপরে বিভিন্ন ভাবে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য চাপ সৃষ্টির একপর্যায়ে শেরপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির ভাই পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, আমার ছোট ভাই উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং তার সার্বিক তত্বাবধায়নে এই প্রতিষ্ঠান চলে, এইটা আপনাদেরকে জানিয়ে রাখলাম।

তিনি আরো বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে গত কয়েকদিন আগেই ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান করে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে গেছে। আপনাদের সংবাদ প্রকাশের পর না হয় আবারও পাঁচহাজার টাকা জনিমানা দিব বলে গতদিনের পাঁচ হাজার টাকার জরিমানার রসিদ দেখিয়ে দেন তিনি।

এ ব্যাপারে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: লিয়াকত আলী সেখ বলেন, এ ধরনের ভেজাল কারখানার খবর পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর