পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে তালমা এলাকায় অবস্থিত তালমা নদী। তালমা নদীর জমি দখল করে আগেই স্থাপনা তুলেছে সৌদি বাংলা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইকো ফ্রেন্ড লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
নদী দখলদারদের উচ্ছেদে নদী কমিশনের প্রণিত তালিকায় এই প্রতিষ্ঠান নাম থাকলেও দীর্ঘদিনেও তা উচ্ছেদে কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। তাই নতুন তারা আবারো বাড়াচ্ছে দখলের পরিধি।
নদীর প্রবাহমান অংশে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিরোধ করে দিন দুপুরে তারা প্রশাসনের নাকের ডগায় ভরাট করে যাচ্ছে নদীর বুক। ফেলা হচ্ছে শত শত জিও ব্যাগ। আর মাঠে থেকে জমি দখলের পাহাড়া দিচ্ছেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী।
পরে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সোমবার সকালে পঞ্চগড় সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলাম ও সদর উপজেলার চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম নদীর ওই স্থান পরিদর্শন করে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
একই সাথে তারা জেলা প্রশাসক বরাবরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
এর পাশেই নদীর প্রায় সাড়ে ৮ একর জমি দখল করে হিমালয় বিনোদন পার্ক তৈরি করেছেন শাহীন নামে এক ব্যবসায়ী। দুটি স্থাপনাই বাংলাদেশ নদী কমিশনের প্রকাশিত নদী দখলদারদের উচ্ছেদের তালিকার মধ্যে থাকলেও সেখানে উচ্ছেদের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি আজও।
এদিকে গত বছরের ডিসেম্বরে জেলা শহরের তুলারডাঙ্গা এলাকায় করতোয়া নদীর তীর থেকে ৯৬ টি দরিদ্র পরিবারের ঘর বাড়ি উচ্ছেদ করেই উচ্ছেদ অভিযানের ইতি টানে প্রশাসন। অন্যদিকে বহাল তবিয়তে প্রভাবশালী নদী দখলদারেরা তাদের শেকর আরও পাকাপোক্ত করতে থাকে। প্রশাসনও এ ব্যপারে তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি অদ্যবধি।
এ দিকে তালমা নদীর ওই এলাকায় ২০০৫-৬ অর্থবছরে দেড় হাজার হেক্টর জমিতে সেচের জন্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যায়ে রাবার ড্যাম্প ও দেড় কোটি টাকা ব্যায়ে রাবার ড্যাম্প তৈরী করে এলজিইডি।
যার মাধ্যেমে খরা মৌসুমে তালমা এলাকার কৃষকদের জমিতে সেচের পানির ব্যবস্থা করা হয়। কৃষকেরা ফলান নানা জাতের ফসল। কিন্তু সব কিছুকে উপেক্ষা করে নদীর পানি প্রবাহে বাধাঁ দিয়ে নদী ভরাট করায় হুমকীর মুখে সেচ ব্যবস্থা। ফসল আবাদে সেচ ব্যবস্থা না থাকলে না খেয়ে মরতে হবে বলে জানান কৃষকেরা।
বামন পাড়া এলাকার কৃষক খতিবুল ইসলাম জানান, অনেকদিন থেকেই প্রশাসনের নাকের ডগায় তালমা দখল হয়ে যাচ্ছে। এই সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ফসলে পানি দেয়া হয়। নদীটি মরে গেলে এই এলাকায় কোন প্রকার কৃষি হবেনা।
স্থানীয় কৃষকরা আরো জানান নদী ভরাট করার ফলে পানিশুন্য হয়ে পড়েছে তালমা। ফলে আগামী দিনে চাষাবাদ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। কৃষকেরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমরা এর আশু সুরাহা চাই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন পঞ্চগড়ের সভাপতি একেএম আনোয়ারুল খায়ের বলেন, তালমা নদীতে বাঁধ দিয়ে ভরাট করে দখল করছে সৌদি বাংলা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইকো ফ্রেন্ড লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তারা দিন দুপুরেই লুকোচুরি করে নদীর প্রবাহমান অংশে বালু ও মাটি ফেলে ভরাট করছে।
সারাদেশে যখন নদী দখলদারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, নদী দখল মুক্ত করা হচ্ছে সেই মুহুর্তে পঞ্চগড়ে নতুন করে নদী দখল হচ্ছে। এরা পঞ্চগড়ের স্থানীয় কেউ না, এরা বাইরে থেকে এসে কল কারখানা করার নাম করে এভাবে নদী দখল করে যাচ্ছে।
তারা আর যাই করুন না কেন তা নদী দখল করে করতে পারে না। সরকার যেখানে নদীর স্বাভাবিক গতিধারা রক্ষা করার জন্য নদী খনন করছে সেখানে দিন দুপুরে নদী দখল আমাদের বিস্মিত করেছে। আমরা অবিলম্বে এসব দখল উচ্ছেদের দাবি জানাচ্ছি। আর তা না হলে আমরা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রয়োজনে আন্দোলনে নামবো।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন পঞ্চগড়ের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, এমনিতেই নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে। এই সুযোগে কিছু প্রতিষ্ঠান স্থানীয় প্রভাবশালীদের ব্যবহার করে নদীর বুক ভরার করে দখল করছে। এটা আমরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারি না। আমরা বিষয়টি প্রশাসনকে শক্তভাবে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে সৌদি সৌদি বাংলা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইকো ফ্রেন্ড লিমিটেডের কাউকেই পাওয়া যায়নি।
তবে বালু সরবরাহের দায়িত্বে থাকা বালু ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বিন্দু বলেন, আমি বালুর ব্যবসা করি। বালু কিনে নিয়ে কে কোথায় ফেলবে এটা তাদের ব্যাপার।
পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফইজুর রহমান বলেন, আমরা নদী নিয়ে কাজ করি কিন্তু নদীর মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয়। তাই আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া কিছুই করতে পারবো না।
পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক ড. সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, স্থানীয় এক ব্যক্তি আমাকে মোবাইলে বিষয়টি জানান। আমি সাথে সাথে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার ভূমিকে বিষয়টি সরেজমিনে গিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। নদীর দখলে জড়িতদের কোন মতেই ছাড় দেয়া হবে না।
কেএস/বার্তাবাজার