কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কাটাখালি রওজাতুন্নবী (সঃ) দাখিল মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি, হারুন রশিদ সিকদারের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়ম বহির্ভূতভাবে পুরাতন শিক্ষকদের ছাটাই, নিজের পছন্দ ও স্বজনপ্রীতি করে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া এবং মাদ্রাসার টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে অনুসন্ধানে।
টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কাটাখালি রওজাতুন্নবী (সঃ) দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। পরে ২০০৪ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মতিনউল হককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। উক্ত কমিটি সে সময় নিয়মতান্ত্রিকভাবে ১৭ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়। নিয়োগ পরবর্তী মাদ্রাসাটি সুন্দরভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলো।
মাদ্রাসা সুপার আ ন ম উসমান সরোয়ারের অভিযোগ, ২০০৯ সালে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আসেন হোয়াইক্যং ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি হারুন রশিদ সিকদার। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর তার বিভিন্ন দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার হলে ২০১০ সালে মাদ্রাসার সুপারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মাদ্রাসার অপর শিক্ষক মৌলানা নূরুল আমিনকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দেন।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্যদের অভিযোগ, একইভাবে নূরুল আমিন তার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণে তাকে সরিয়ে অপর সহকারী শিক্ষক মৌলানা ছিদ্দিক আহমদকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দেন। ভারপ্রাপ্ত সুপার আর সভাপতি মিলে মাদ্রাসাকে পরিনত করেছে লুপাটের আখড়া।
পরবর্তীতে, সভাপতি নিজে ২০১৪ সালে মাওলানা ইদ্রিসকে বহাল রেখে সুপার আ ন ম উসমান সরোয়ারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জালিয়াতির অভিযোগ এনে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের লিখিত আবেদন করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বরাবর। সর্বশেষ মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলে ২০০৪ সালে নিয়োগ প্রাপ্ত পাঁচ জন পুরাতন শিক্ষককে বাদ দিয়ে সেই কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে টাকার বিনিময়ে নতুন করে সহকারী শিক্ষক মো. জাকারিয়া (ইন: নং M0006259), সহকারী শিক্ষক, রফিক উল্লাহ (ইন: নং (M0006261), সহকারী শিক্ষক মো. ইউছুপ আলী (ইন: নং (M0006260), ইবি, ক্বারী মো. আলী (ইন: নং M0006234), জুনিয়র শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম (ইন: নং M0006233) এমপিওভুক্ত করা হয়। এই পাঁচ নতুন শিক্ষক ইতিপূর্বে এই মাদ্রাসার শিক্ষকতার সাথে জড়িত ছিলেন না বলে জানা গেছে। এছাড়াও রফিকুল ইসলাম একজন প্রবাস ফেরত বলে সত্যতা উঠে এসেছে। অপরদিকে, পুরাতন পাঁচজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হলেও তাদের পদবী পরিবর্তন করা হয়েছে বলে দাবী শিক্ষকদের।
এদিকে, শিক্ষক নিয়োগের নামে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুখ খুলেন কয়েকজন শিক্ষক। গেলো বছর জুলাই থেকে চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত বোর্ড থেকে ১০ জন শিক্ষকদের বকেয়া বেতন বাবদ মঞ্জুরকৃত ১৭ লক্ষ ৪ হাজার ৫০০ টাকা প্রেরন করা হয়। ১শত টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে সেই অর্থ উত্তোলন করে সভাপতি হারুন রশিদ সিকদার। তবে সেই অর্থ থেকেও নিয়োগ বানিজ্য বাবদ দেড় লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেয়ার প্রমান পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। এছাড়াও যেসব পুরাতন শিক্ষক, কর্মচারীদের বাদ দিয়েছে, সভাপতি হারুন রশিদ সিকদারের চাহিদা মতো টাকা দিতে অপারগতার কারনে তাদেরকে বাদ দেয়ার প্রমান উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
এসব বিষয়ে, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি হারুন রশিদ সিকদারের কাছে জানতে চাওয়া হলে এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবী করেন। কিন্তু এসব অভিযোগের প্রমান রয়েছে এমন প্রশ্নে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার প্রতিহিংসার শিকার বলে বিষয় গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এদিকে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এক আবেদনের প্রেক্ষিতে এসব অনিয়ম বিষয় তদন্তের জন্য গত ১ সেপ্টেম্বর টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি চিঠি প্রেরণ করে। তার ভিত্তিতে তদন্তের জন্য উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার নূরুল আবছারকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা নূরুল আবছার জানান, তদন্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন অসংগতির বিষয় উঠে এসেছে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে, খুব দ্রুত সময়ে তদন্ত রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া হবে।
এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবকদের দাবী- একজন দায়িত্ববান লোক, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতি করে পয়সা হাতিয়ে নেয়া কোনভাবেই কাম্য নয়। সভাপতি হারুন সিকদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির উপর প্রভাব ফেলছে। তার বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতির অনুসন্ধান করে, প্রমানের ভিত্তিতে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা জরুরী হয়ে পড়েছে।
বার্তা বাজার / ডি.এস