মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রামপুরে বিগত বছরগুলোর থেকে এবছর সবচাইতে চরা মূল্যে আলু বিক্রি করতে পাড়ায় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে আলু চাষিরা এখন স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ছে। টানা কয়েক বছর লোকসান ও দাম কম পাওয়ায় ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল কৃষকরা। এবছরের দামে বিগত দিনের লোকসান কিছুটা হলেও মোচন হবে। তবে এবছর আলুর ন্যায্য দাম না পেলে অনেক কৃষক নিঃস্ব হয়ে যেত।
অন্যদিকে হিমাগার মালিকদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ও ৫০ কেজি বস্তা করার কারণে প্রতিবছর লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। এমনটাই জানা যায় হিমাগার সূত্রে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় ২০১৮ সালে ৯ হাজার ৫০০শ’ হেক্টর ও ২০১৯ সালে ৯ হাজার ২০০ শ’ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছিলো। ২০২০ সালে ৯ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি আলু আবাদ হবে বলে কৃষি অফিস ধারণা করছে। ২০১৯ সালে এ উপজেলায় ১৬ হাজার ১০০শ’ মেট্রিক টন আলু বীজ লেগেছিল। এবছর ২০২০ সালে ১৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন আলু বীজের চাহিদা রয়েছে।
কোল্ড স্টোরেজ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১০ টি কোল্ড স্টোরেজে ধারন ক্ষমতা ৭৪ হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে এ বছর ১০ টি কোল্ড স্টোরেজে ৬১ হাজার ২২০ মেট্রিক টন আলু রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৫০ মেট্রিক টন বীজ রয়েছে এবং ২৮ হাজার ২২০ মেট্রিক টন খাবার আলু বিক্রি হয়েছে। বাকি ২৩ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন আলু বিক্রি করতে হবে ২ মাসের মধ্যে। তা না হলে বাজারে নতুন আলু চলে আসবে। জানা যায়, প্রতিদিন ১০টি হিমাগার থেকে ২শত ২৩ মেট্রিক টন আলু বিক্রি করা হয়। যা দেশের বিভিন্ন পাইকারি আরত বা বাজারে বিক্রি করা হয়।
ডায়মন্ট বা এসটেরিক্স আলুর ৫০ কেজির বস্তা ২হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ আলুর ৫০ কেজির বস্তার দাম ছিলো ৬শ থেকে ৭শ টাকা। তবে খুচরা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ৫০/৫৫ টাকা কেজি দরে।
বীজ ব্যবসায়িদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ উপজেলায় মোট আলু বীজের প্রয়োজন ১৮ হাজার মেট্রিক টন। কোন্ড স্টোরেজে রয়েছে ৯ হাজার ৫০ মেট্রিক টন। বিএডিসি ও প্রাইভেট কোম্পানি গুলো সব মিলিয়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন। বিদেশ থেকে আশা বাক্স ১ হাজার মেট্রিক টন বীজের চাহিদা পূরণ করবে। সর্বমোট ১৪ হাজার ৫০ মেট্রিক টন বীজের চাহিদা পূরণ হবে। কৃষি অফিসের তথ্য মতে ২ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন ও ব্যবসায়িদের তথ্য মতে প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন বীজ আলুর ঘাটতি রয়েছে।
শাহাজালাল কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আবুল বাসার বলেন, ১৫ বছর আগে যে ভাড়া ছিলো এখনোও সে ভাড়াই আছে। ভাড়াতো বারেনি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলতো বেড়েছে। এজন্য কোল্ড স্টোরেজ চালানো এখন লোকসান। ৫ থেকে ৭ বছর যাবত আমাদের কোল্ড স্টোরেজে লোকসান দিয়ে আসছে।
তবে, ৫০ কেজি বস্তা করায় লস এর পরিমাণ আরো বেড়ে গেছে। ৮০ কেজির একশত বস্তা যে জায়গাটাতে রাখতাম ৫০ কেজির বস্তা একি জায়গায় সংকলন হয়না। বস্তার পরিমাণ বেশি হওয়ায় জায়গা বেশি প্রয়োজন হয়। কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ২২০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করলেও ৫০ কেজির বস্তা ১৪০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া রাখছে অনেক হিমাগার মালিকরা। একটি বস্তাপ্রতি বিদ্যুৎ বিল ৮ মাসে খরচ হয় ১০০ টাকা। লেবারের প্রত্যেক বস্তা স্টোর থেকে ভিতরে ও বাহির করতে ২৪ টাকা খরচ হয় এবং এ বস্তা কয়েকবারে উল্টে দিতে হয়। সেখানে আমাদের খরচ গয় ১ টাকা ৬০ পয়সা। এরমধ্যে স্টাফদের বেতন, গ্যাসসহ অন্যান্য খরচ তো আছেই।
উপজেলার রামানন্দ গ্রামের কৃষক জাকির মুন্সি বলেন, ২০০৯ সাল থেকে আমাদের আলুতে লোকসান হচ্ছে। তবে এবছর আলুর দাম না পেলে আমার মত অনেক চাষি নিঃস্ব হয়ে যেত। এবারের মত আলুর চড়া মূল্য বিগত কোন বছরই পাইনি। তিনি আরো বলেন, গত বছর ৬৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। এবছর কোল্ড স্টোরেজে ৬০ কেজি ওজনের ৬ হাজার বস্তা আলু রেখেছি। আমি ১২শ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত বস্তা বিক্রি করেছি। এরমধ্যে বস্তাপ্রতি হিমাগার ভাড়া ২০০ টাকা নিয়েছি। আর দুই মাস পরেই আবার শুরু হবে আলু রুপনের মৌসুম। সামনের মৌসুমে ২০০ বিঘা আলু চাষ করবো।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো.শাফীয়ার রহমান বলেন, এ বছর আলুর দাম ভালো হওয়ায় জমির পরিধি বাড়বে। আর এ কারনে সার ও বীজ আলুর চাহিদা বেড়েছে। এ উপজেলায়সার ও বীজের অতিরিক্ত চাহিদা যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
জানা যায়, করোনা মহামারি, বর্ষার পানি ও বৃষ্টির কারনে নিত্যদিনের পন্যের দাম বেড়েই চলছে। আর এ কারনে আলুর উপর ভরসা রাখছিলো নিম্ন আয়ের মানুষরা । এখন সেই আলুর দামও আকাশচুম্বী। আরো জানা যায়, গত ১১ বছর পর আলুর চড়া মূল পেলো কৃষক। তবে এবারের আলুর দাম বিগত বছর গুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এবছর আলুর ন্যায্য দাম না পেলে অনেক কৃষক নিঃস্ব হয়ে যেত।
বার্তাবাজার/আর.আর