আচরণ বিধি লঙ্ঘন করায় নিক্সনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে চিঠি

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আচরণ বিধি লঙ্ঘন করায় ফরিদপুর-৪ আসনের এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের বিরুদ্ধে ফরিদপুর জেলা নির্বাচন কমিশন থেকে নির্বাচন কমিশন ঢাকায় চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।

জেলা নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ফরিদপুর-৪ আসনের এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন ও বিজয়ী প্রার্থী মোঃ কাওছার বিধি বর্হিভূতভাবে উপজেলা বাজারে মিছিল ও সভা করেন। এই সভা থেকে তারা বিভিন্ন আপত্তিকর কথা বলে পরিস্থিতি উত্তাল করেন। এসময় নির্বাচনী যে বিধি রয়েছে সেই বিধি ভঙ্গ হওয়ায় জেলা নির্বাচন কমিশন থেকে নির্বাচন কমিশন ঢাকায় চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।

এদিকে এই একই বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসক অতুল সরকার গত রবিবার (১১ অক্টোবর) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে লেখা এক চিঠিতে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ করার প্রয়োজনে প্রয়োজনীয়সংখ্যক এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করায় নির্বাচনের পূর্বের দিন ও নির্বাচনের দিন বিজয় মিছিল-পরবর্তী জনসভায় বিজয়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সংসদ সদস সদস্য কর্তৃক দায়িত্ব পালনরত বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি হুমকি এবং মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য প্রদান করেছেন।’

ডিসি তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের চাহিদার প্রেক্ষিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে ১২ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়।’

ডিসি লিখেছেন, ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য (ফরিদপুর-৪) মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী ৯ অক্টোবর সকালে তাকে (ডিসি) ফোন করে কৈফিয়ত তলব করেন এবং অধিকসংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করায় তার সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয় হলে মহাসড়ক অবরোধসহ নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ডিসি তাকে (সংসদ সদস্য) অনুরোধ করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে নানা ধরনের অশোভন মন্তব্য করেন। চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গেও অনুরূপ আচরণ করেন।

ডিসি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ১০ অক্টোবর নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং নিক্সন চৌধুরীর সমর্থিত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বিজয় লাভ করেন। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী জনসভায় নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিজয়ী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরী এবং তার অনুসারীরা নির্বাচনে ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করার বিষয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসনের প্রতি চরম বিষোদগার করেন।

দায়িত্ব পালনরত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটসহ জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অত্যন্ত মানহানিকরভাবে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি প্রদর্শন করেন। তার অনুসারীদের দিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়ান যা একজন সংসদ সদস্য বা একজন সুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে অকল্পনীয়। তিনি নির্বাচকালীন দায়িত্ব পালনরত একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (ভাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার) কর্তৃক নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে স্বল্প সময়ের জন্য আটক রাখার কারণে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে ভদ্রলোকের পক্ষে উচ্চারণ অনুপযোগী অশালীন অভব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।

ডিসি তার চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে অত্যন্ত মানহানিকর ও অশোভন উক্তি জেলা পর্যায়ে সরকারের সব উন্নয়ন কর্মকান্ডের সমন্বয়কারী জেলা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। এ ধরনের হীন বক্তব্য সরকারের সাফল্য সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে ভুল বার্তা দেয় একই সঙ্গে সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

এদিকে ডিসির ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় রিটার্নিং অফিসারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়।

কিন্তু ১২ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিজয়ী উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং ইউএনওকে হুমকি দিয়েছেন; যা উপজেলা পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১৬-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এ চিঠির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচন পরবর্তী বিজয়ী সভায় প্রকাশ্য সভায় জেলা প্রশাসক অতুল সরকার ও সকালে মোবাইলে চরভদ্রাসন ইউএনওকে নিয়ে ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের বক্তৃতায় গোটা জেলাজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নিক্সন চৌধুরীর ভিডিও এবং অডিও ভাইরাল হয়েছে জেলা সহ সারাদেশে। বিষয়টি অনভিপ্রেত ও শিষ্টাচার বর্হিবভূত বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা।

মাঠ প্রশাসনের একজন যোগ্য সৎ অফিসারকে নিয়ে অশ্রাব্য ভাষার গালিগালাজ মেনে নেওয়া যায় না বলে জেলার বিসিএস কর্মকর্তারা বলছেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিশেন ফরিদপুর জেলা শাখার উদ্যোগে গত রোববার দুপুরে জরুরি সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বলা হয়, জেলা প্রশাসক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরুদ্ধে মানহানিকর ও অশোভন উক্তি সরকারের সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সমন্বয়কারী জেলা প্রশাসনের জন্য অবমাননাকর। এ ধরনের বক্তব্য স্থানীয় জনগণের মাঝে একদিকে যেমন সরকারের সার্বিক সাফল্য সম্পর্কে ভুল বার্তা প্রেরণ করে, অন্যদিকে মাঠ প্রশাসনে সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পথেও চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সব সদস্য এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ ছাড়া এই ধরনের কর্মকান্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। সভার কার্যবিরণীর চিঠি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদসহ সংশ্নিষ্টদের পাঠানো হয়েছে।

কেএস/বার্তাবাজার

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর