৩০ বছর ধরে ঘানি টেনে আসছেন মরিয়ম ও তার স্বামী লোকমান হোসেন। গরু কেনার সামর্থ্য না থাকায় এ দম্পতি নিজেরাই ঘানি টেনে তেল মাড়াই করে জীবন-যাপন করছেন। এ দম্পতির বাড়ি সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের বিলধলী গ্রামে।
নতুন নতুন প্রযুক্তি আর আধুনিকতায় অনেক কিছুই বিলপ্তি পথে। কয়েক দশক আগে কমবেশি সব এলাকাতেই গরু দিয়ে টানা হতো তেলের ঘানি। তেল সংগ্রহের সনাতন এই পেশা বিলুপ্তির পথে। তার পরও পৈত্রিক পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন কেউ কেউ। বিয়ের ১ মাস পরে থেকেই মোছাঃ মরিয়ম বেগম (৪৫) তার স্বামী লোকমান হোসেন (৫৫) কে নিয়ে ৩০ বছর ধরে এ ঘানি টানছেন।
দুটি ঘানি থেকে যে টাকা পান তা দিয়েই টেনেটুনে তিন ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে সংসার চলে তাদের। তবে দুইটি ঘানি টানতে দুটি গরুর প্রয়োজন হলেও একটি ঘানি টানার জন্য গরু কেনার টাকা নেই তাদের।
ঘানিটানা সংগ্রামী নারী মোছাঃ মরিয়ম বেগম (৪৫) জানান, বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি আমার শ্বশুর ও স্বামী এই ঘানি টেনেই সংসার চালাচ্ছেন। আমার বিয়ের হাতের মেহেদীর রং না উঠতেই আমাকে এই ঘানির কাজে লাগিয়ে দেন শ্বশুর বাড়ির লোকজন। প্রথম অবস্থায় খুব খারাপ লাগতো মাথা ঘুরতো। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতাম আবার ঘানি টানতাম।
এই ঘানি টানছি প্রায় ৩০ বছর ধরে। ঘানি টানার কারণে আমার কিডনির সমস্যা হয়েছে। ডাক্তার বাড়ির কাজ করতে নিষেধ করেছে। তারপরেও বাধ্য হয়ে ঘানি টানছি। ঘানি টেনে যে টাকা পায় তা দিয়েই টেনেটুনে সংসার চালাচ্ছি। আর ঘানি যদি না টানি তাহলে সংসার চলবে না। এদিকে নিজের ঔষধ ও স্বামীর ঔষধও কিনতে পারবো না।
সরকারিভাবে যদি আমাকে আর্থিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন অথবা দুটি বলদ বা বড় গরু কিনে দিতেন তাহলে খুব উপকার হতো। মরিয়মের স্বামী লোকমান হোসেন প্রামাণিক (৫৫) বলেন, অনেক কষ্টে আছি। নিজে অসুস্থ আবার আমার স্ত্রীও অসুস্থ। আমাদের দুটি ঘানি আছে একটি ঘানি গর দিয়ে টানি অন্যটি আমি আমার স্ত্রী ও ছেলেকে দিয়ে টানাই। ঘানি টেনে সরিষা থেকে যে তেল বের হয় তা বিক্রয় করে যেটা আয় হয় তা দিয়ে নিজের ঔষধ স্ত্রীর ঔষধ কিনি আর টেনেটুনে সংসার চালাই।
ঘানি না টানলে খাওবো কি? ঘানি টানার জন্য ভালোমানের বলদ গরু কেনার প্রয়োজন কিন্তু টাকার অভাবে তা পারছি না। আমাদের সরকারের সাহায্য সহযোগিতা চাই৷ তিনি আরও বলেন, এই পেশা আমার বাপ দাদার আমলের। বাবা বলেছে হালাল খাওয়ার জন্য এই পেশায় থাকতে। কোন দিন হারাম খাবি না যার জন্য এই পেশায় এখনো আছি।
এদিকে প্রতিদিন প্রায় এক মণ সরিষা ঘানির মাধ্যমে তেল তৈরি হয় ১০-১৫ কেজি। প্রতি কেজি বিক্রয় হয় ২২০-২৫০ টাকা। বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা থাকায় ক্রেতারা এখান থেকেই তেল ক্রয় করছেন বলেও জানা যায়।
বার্তাবাজার/কে.জে.পি