২২, জুলাই, ২০১৮, রোববার | | ৯ জ্বিলকদ ১৪৩৯

নারী নির্যাতন বন্ধে পরিশুদ্ধি প্রয়োজন

আপডেট: জুলাই ১২, ২০১৮

নারী নির্যাতন বন্ধে পরিশুদ্ধি প্রয়োজন

মানবাধীকারকর্মী ও বৃটিশ রাজবধূ মেগান মার্কেল বলেছেন, পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী। সুতরাং তাদের কথা সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকদের কাছে পৌঁছাবে না, সেটা হতে পারে না। সম্প্রতি নারী অধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আলোড়ন ও আন্দোলন চলছে সময় প্রেক্ষিতে মেগানের কথাটি বিশেষগুরুত্বে দাবি রাখে। বিশেষ করে যখন পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় বা যানবাহনে নানা ধরণের হয়রানি, শ্লীলতাহানী ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর ভিকটিমের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষকে প্রতিবাদ করতে দেখা গেলেও অধিকসংখ্যক মানুষ নিরব থাকে। এবং প্রতিবাদ হলেও এসব ঘটনার পুনঃরাবৃত্তি বন্ধ হচ্ছে না। সে প্রেক্ষিতে মেগানের কথাটি বিশেষগুরুত্ব বহন করে। নারীর প্রতি এমন দুরাচারণ বারংবার ঘটছে তথাপি ভিকটিমের বেদনা-অর্তি আমাদের মানসিকতাকে প্রভাবিত করছে না।

এক্ষেত্রে আইনও যথাযোথ কাজ করতে পারছে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত তথ্যমতে ২০০২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা জেলার ৫টি ট্রাইব্যুনালে ৭ হাজার ৮৫৪টি ধর্ষণ মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ২৭৭টি। সাজা হয়েছে ১১০টি মামলার। অর্থাৎ ৩ শতাংশের কিছু কম। আর ৯৭ শতাংশ মামলায় আসামি ছাড়া পেয়েছে। ৯৭ শতাংশ মামলার মধ্যে ৪১ শতাংশ আসামি বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে। ৫৫ শতাংশ মামলায় সাক্ষ্য শুনানি শেষে আসামিরা ছাড়া পেয়েছে। বিচার হওয়া ৩ শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৫ ভাগ আসামির।

উপরোক্ত সমীকরণের আলোকে এটা প্রমাণিত যে, আমাদের দেশের আইন ধর্ষণ রোধে যথেষ্ট নয়। যদি বলা হয় আইনী ব্যবস্থা যুগোপযোগী করলে ধর্ষণ রোধ সম্ভব তাহলে সে ক্ষেত্রে দ্বিমত অধিক জোরালো হয়। কারণ বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ নারী কোনো না কোনোভাবে নির্যাতন বা যৌন হয়রানীর শিকার। নারী নির্যাতনের ঘটনা পরিমাণে ইউরোপের দেশগুলোতেই বেশি। তাদের দেশের আইন আমাদের দেশের চাইতে অধিক শক্ত ও যুগোপযুগী।

২.
তাহলে এখন প্রশ্ন হতে পারে, কিভাবে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব? এক্ষেত্রে আমি সরাসরি কোনো উত্তর দিতে পারবো না। কারণ যেভাবে লাগামহীন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে এটা আমাদের সমাজিক অবক্ষয়ের চ‚ড়ান্ত পর্যায়ের প্রমাণ। আর এ অবক্ষয় শুধুই আইন প্রয়োগ করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ আইনী শাসনের মাধ্যমে মানুষকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। আবার আইনের প্রয়োগ যথাযথ না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে যায়। মানুষ যখন অপরাধ করে তখন তার মনে আইনের ভয় খুব অল্পই থাকে। অন্যদিকে কম-বেশি সব দেশেই প্রভাবশালীরা আইনকে ক্ষমতাবলে প্রভাবিত করে। তাই এখানে আইন অনেকটাই হাতবাঁধা। আর আইনের মাধ্যমে সব সময় সময়োপযুগী কাজ করা সম্ভব হয় নয়। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়। বিশেষ করে যাদের ক্ষমতা আছে তারা সাক্ষ্য-প্রমাণ লুপাট করতে পারে। অনেকে ভয়ে সাক্ষ্য দিতে চায় না। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও অনেকসময় ক্ষমতা বা অর্থের জোরে হারিয়ে যায়। তখন ঘটনা সত্য হলেও আইন কিছুই করতে পারে না। তবে আইনকে যুগোপযোগী করে তৈরি করতে হবে এবং আইনী সমতা বজায় রাখে বৈষম্যহীনভাবে তা প্রয়োগ করতে না পারলে অবক্ষয় আরও প্রকট আকার ধরাণ করবে। আমি নারী নির্যাতনরোধে আইনকে শেষ ধাপে রাখি। শেষ চিকিৎসা হিসেবে আইন আশ্রয়স্থল হতে পারে। যদি এমন কিছু করা যায় যা আইন প্রয়োগের মতো জটিলতায় না পরতে হয় তাহলে সেটাই উত্তম। তাই আমি বলছি যে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে আগে আমাদের সমাজব্যবস্থার পটপরিবর্তন করতে হবে। আর এক্ষেত্রে শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে আমি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছি।

৩.
শিক্ষা একজন মানুষের ব্যবহার, রুচিবোধ, আচার-আচরণ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আমি এখানে শিক্ষা বলতে প্রতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে সিলেবাসসর্বস্ব কিছু বই পড়া বুঝাচ্ছি না। কারণ সাক্ষরতা আর শিক্ষা দুটি ভিন্ন বিষয়। শিক্ষা মানুষের ভেতরে সুপ্ত থাকা বিবেককে জাগিয়ে দেয়। তখন মানুষ আবেগ থেকে মুক্ত হয়ে বিবেকের তাড়নায় পরিচালিত হয়। তখন সে ব্যক্তির কথায়, আচরণে অন্যকেউ আঘাতপ্রাপ্ত হয় না। আর এটা তখনই সম্ভব যখন শিক্ষায় নৈতিকতার সংশ্লেষ ঘটে। তাই শিক্ষা শুধুই জীবিকার হাতিয়ার নয়, শিক্ষা দেশপ্রেম, নৈতিকতার জাগরণ ও লালন সত্য সুন্দর আদর্শ ধারণ করে মানবতাবাদী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেমন দায়িত্ব তার চাইতে বেশি দায়িত্ব হলো পরিবারের। কারণ একটি শিশু অনৈতিক চরিত্র নিয়ে জন্মায় না। সে যদি জন্মের পর নৈতিকতা ভিন্ন কিছু স্পর্শ না করতে পারে তাহলে অনৈতিক কর্ম সে শিশুর দ্বারা সম্ভব নয়। তাই আমি মনে করে প্রত্যেক পরিবারকে সচেতন হতে হবে সন্তানের ব্যাপারে। যেনো ভবিষ্যতে এরা সমাজে উৎপীড়ক না হয়, নারীকে সম্মান করতে শিখে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পরিবার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার বিকাশ ঘটানো। তবেই আমি মনে করি আমাদের সমাজ থেকে শুধু নারী নির্যাতন নয়, সব ধরণের অপকর্ম উঠে যাবে।

সহজ ভাষায় বললে, সমাজস্থ মানুষের পরিশীলীত রুচিবোধ, আচার-আচরণ ও কর্মই হলো সংস্কৃতি। যখন সমাজস্থ মানুষের রুচিবোধ, আচার-আচরণ ও কর্ম অবক্ষয় কবলিত হয় তখন সংস্কৃতিও অবক্ষয় কবলিত হয়। এভাবেও বলা যায় যে, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় শুরু হলে মানুষের চরিত্রেও অবক্ষয় শুরু হয়। যখন সামষ্টিক চরিত্রের পতন হয় তখন সংস্কৃতিরও পতন ঘটে। সেসময় ব্যক্তি চরিত্র আর ঠিক থাকে না। সংস্কৃতি যেমন মানুষের সৃষ্টি তেমনি সংস্কৃতি মানুষকে নিয়ন্ত্রণও করে। আমরা যখন একটা সমাজিক ও শিক্ষণীয় ফিল্ম দেখি তখন তা মনে মনে আয়ত্ত করে রাখি; বাস্তব জীবনে কাজে লাগাই। কিন্তু আমরা যদি এমন কিছু দেখি বা পড়ি যা আসলে শালীনতা বর্হিভ‚ত বা আমাদের সমাজস্থ সুস্থ্যসংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়, তখন সেটা মনের অজান্তেই ধারণ করে রাখি। ক্রমে এ ধারণ যখন বেশি হয় তখন আমরা সেদিকে প্রভাবিত হই। আর সেটা বাস্তব জীবনে কামনা করি। বিপত্তিটা তখনই ঘটে। তাই আমাদের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে ব্যক্তি চরিত্র ও মানস পতনের মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করবে। আমাদের শিক্ষাকে জাতীয় মানস চেতনা আলোকে সাজা হতে এবং সংস্কৃতিকে অবক্ষয় ও আগ্রাসন মুক্ত রাখতে হবে।

৪.
মানুষ ভুল করবেই। সমাজে যখন শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে মানবিক ও নৈতিক মানস গঠনে ভ‚মিকা রাখবে তখন প্রজন্ম পরম্পরায় সমাজে থেকে অবক্ষয়ের রেখা বিলুপ্ত হবে। অপরাধের মাত্রাও কমে আসবে। আর মানুষ বিবেকতাড়িত হয়ে কাজ করলে অপরাধের শঙ্কা নিতান্তই কম। আইন সবসময় অপরাধ দমনের জন্য যথেষ্ট নয়। আইনের কিছু দুর্বলতা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। আর সবসময় শাসনের মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। সুতরাং সে স্বাধীনতার শক্তিকে নৈতিক পথে পরিচালিত করলে অনৈতিকতা সমাজে বেপরোয়া হতে পারবে না। সে সময় নারীদের কথা সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষের কানে পৌঁছাবে।

জি. কে. সাদিক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক