মহামারি করোনার নীল থাবায় থমকে গেছে মানুষের কর্মজীবন। পাল্টে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা। সবাইকে করে দিয়েছে একেবারে ঘরবন্দি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চরম ইচ্ছাশক্তিই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তীরে এসে ভিড়ায়। এরপর থেকেই তৈরি হয় এক নাড়ির বাঁধন। তীব্র টান অনুভূত হয় এই বাঁধনে। দীর্ঘ দিন ধরে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অনলাইনে ক্লাস চললেও আশানুরূপ ফলাফল নেই। তাত্ত্বিক জ্ঞান কিছুটা মিটলেও ব্যবহারিক ক্লাস থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা।
দীর্ঘ ৭ মাস ক্যাম্পাস থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ছুটিতে দুরন্তপনা স্বভাবের শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েছে ঘরকুনো। বাড়ছে হতাশা। প্রায় সবকিছু খুলে দিলেও বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ক্যাম্পাসে ফেরার প্রহর গুনছে প্রতিটা শিক্ষার্থী। ঘরে বসে বসে নবীন-প্রবীণরা বন্দিজীবনে স্বপ্ন দেখছে ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার। আশায় বুক বেঁধে আছে কবে ফিরবে স্বপ্নের ক্যাম্পাসে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কিছু শিক্ষার্থীর ভাবনা তুলে ধরেছেন ববি শিক্ষার্থী মো: ইমদাদুল ইসলাম।
মো: আশরাফুল ইসলাম, আইন বিভাগ
বিশ্বজুড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র, কবির ভাষায় পৃথিবী জুড়ে পাঠশালা হলেও আমার পাঠশালার প্রাণ কেন্দ্র বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। অসুস্থতা থাকলে ক্যাম্পাসে গেলেই যেন হঠাৎ করে সেটা উধাও হয়ে যেত, পরিচিত প্রিয় মুখ গুলোর দেখা পেলেই দিনটা প্রানবন্তো হয়ে যেত, কোথায় গেল সে দিনগুলি? প্রিয়ো পরিচয়ের সাথে সাক্ষাৎ না হওয়াতে যেন ক্রমেই মন খারাপের পাহাড় বুকে জমে যাচ্ছে।
হলের ডাল, শামিম মামার চিনি বেশি চা, বিকাল ৫ টায় বাসে উঠার হিড়িক এ সব স্মৃতি সারাক্ষণ যেন তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রিয়ো শিক্ষক, ক্লাসরুম সবগুলো যেন এখন কল্পনার বিলাসিতা, অনেক দিন হয়ে গেল বিকালের ব্যাস্ততা দেখিনা হতাশ চত্তরের গান শুনিনা। আপুদের জন্য ভাইদের হাতে বাজার দেখিনা, টিউশনি যুদ্ধের গল্প শুনিনা, শুনিনা মাঠের বিভিন্ন কোণ হতে ভেসে আসা বেসুরা গলার গান। রিডিং রুমের গুন গুনিয়ে পড়ার সুরও শুনিনা, এসব স্মৃতি যেন আমাকে কাঁদিয়ে ভাসায় মনের ছোট্ট ঘর।
ফিরতে চাই সবাইকে নিয়ে ৫০ একরের আপন ভূবনে। সুস্থ থাকুক আমার ববি পরিবারের সবাই নিজের পরিবার নিয়ে।
মো: জাকির হোসাইন, মার্কেটিং বিভাগ
ভালোবেসে হয়েছি ঋণী
আমি অচিন ভিখারিনী
এসেছি তোমার কাছে
বড্ড ভয় হয়, হারিয়ে ফেলি পাছে!
সব হারিয়ে পেয়েছি তোমায়
ফিরিয়ে দিও না আমায়!
এরকমই; মা-বাবা, পরিবার-পরিজন, পুরনো সব বন্ধু আর আমার বকুল তলা, নদীর পাড়ের স্মৃতি, সবকিছুকে পেছনে ফেলে বুক ভরা হাহাকার নিয়ে যখন প্রিয় ক্যাম্পাস তোমার মাটিতে পিঠ ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকাতাম, মনে হতো আমার নদী পাড়ের দূর আকাশের সাথে কীর্তনখোলা নদীর উপরের ওই আকাশ বুঝি এক যোগাযোগ করে দিলো এপাড় ওপাড়ে! যখন ক্লান্ত শরীর এ ক্যাফে থেকে নিয়ে আসা কফির মগে চুমুক দিতাম মনে হতো হাজারো প্রাণশক্তি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছো। আবার, শরৎ এর কাশফুলে ঢাকা তুমি আর বসন্তে পলাশে সাজানো তোমার রূপ, যেন ঝলসে দিতো আমার চোখ! আড্ডা আর গানের তালে মশগুল আমরা সবাই। মুক্তমঞ্চে তখন ই কোথা থেকে একঝাঁক বৃষ্টি দিয়ে ভিজিয়ে দিতো আমাদের!
বিশ্বাস করো, ভালোবাসি তোমায় খুব! আমার প্রিয় ক্যাম্পাস যে মায়ায় বেধেছো আমায়, সে মায়া উপেক্ষা করে তোমার থেকে দূরে থাকার শক্তি আমার নেই!
হুমায়ুন মাহমুদ ইলিয়াস, কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস মানেই অন্যরকম এক ভালোবাসা এবং অনুভূতির জায়গা। যেখানে একাডেমিক শিক্ষাচর্চার বাইরেও জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি। করোনার জন্য দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ।
শিক্ষার্থী ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন অমাবস্যার রাত নেমে এসেছে। এমনিতেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট একটা বড় সমস্যা। আর করোনার জন্য এই সমস্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে যাদের পড়াশোনা একদম শেষপ্রান্তে। অপেক্ষা শুধু সার্টিফিকেটের। তারা ভুগছে মানসিক সমস্যায়।
শিক্ষার্থীদের জন্যে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করা হলেও তার সুবিধা পাচ্ছে হাতে গোনা কিছু শিক্ষার্থী। এছাড়া অনলাইনে তাত্বিক বিষয়ের ক্লাস করতে পারলেও ব্যবহারিক ক্লাস করা সম্ভব না। আর এটা আমাদের উচ্চশিক্ষার জন্য বড় বাধা হয়ে দাড়াবে। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের আয়ের উৎস ছিল টিউশনি। দীর্ঘদিনের বন্ধে তাদের অবস্থা আজ শোচনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থী প্রাপ্তবয়স্ক। তাই অফিস-আদালতের পাশাপাশি উপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকল বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া যুক্তিসংগত বলে মনে করি।
সাদিয়া রহমান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
এ-ই মহামারির মধ্যে যখন দেশের সব কার্যক্রম চলছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ও চলতে পারে। কারন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ বিধি মেনেই ক্লাস করতে পারবে। আর যারা ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থী বা রেজাল্ট প্রত্যাশী তারা খুব হতাশার মধ্যে আছে, হল বন্ধ, টিউশন নেই। আবার অনেকের আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ।
সর্বোপরি, এখন পড়াশোনায় গতি ফেরানোর জন্য ক্যাম্পাসে ফেরা দরকার।কারণ, অনলাইন ক্লাসে ব্যবহারিক পড়াটা হচ্ছে না আর প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বইও আমরা পাচ্ছি না।
রাইসুল ইসলাম জনি, মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ
আবেগ অনুভূতি জড়ানো বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ দিন বন্ধ আছে। যদিও পুরো বিশ্বেও একই ভাবে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। এবারের ছুটিও একটু ভিন্ন যেন নতুন কিছু শিক্ষা দেয়। অনিচ্ছার সত্ত্বেও থাকতে হচ্ছে প্রিয় ক্যাম্পাস থেকে দূরে। এখন ক্যাম্পাসকে খুব বেশি মনে পড়ে।
ক্লসের ব্যাস্ততা, চায়ের কাপের সাথে গান, চিরচেনা মুখ, লাল বাস যেন ক্ষণিক সময়ের জন্য হারিয়ে গেছে। বাসায় চার দেওয়ালের মাঝে এলবামে তুলে রাখা ছবি গুলো দেখে সময় কাটে। আসলেই মনে হয় যেন ক্যাম্পাস দ্বিতীয় বাড়ি ছিল।
কেএস/বার্তাবাজার