পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার জবেদা অটো রাইস মিল যেন পাখিদের এক মহা মিলনমেলা তৈরী করেছে। এ মিলে প্রতিদিন সকাল হলেই দেখা মেলে ঘুঘু,সাদা বক,শালিক,কবুতর সহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১০-১৫ হাজার পাখির। মিলের চাতালে ধান মেলতেই ঝাঁকে-ঝাঁকে হাজার-হাজার পাখি তাদের খাবারের সন্ধানে ছুটে আসে মিলটিতে।
কেউ পাখিদের ধরছেনা,মারছেনা এমনকি পাখিদের বিরক্ত করতে দেখা যায়নি কাউকে। পাখিরা নিজ ইচ্ছায় মিলটিতে এসে তাদের খাবার খাচ্ছে, চলেও যাচ্ছে নিজ ইচ্ছায়, এমনকি কেউ তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছেনা। মিল সংলগ্ন বৈদ্যুতিক লাইন ও গাছ-গাছালিতে হাজার-হাজার পাখি লাইন হয়ে বসে রয়েছে খাবারের অপেক্ষায়।
একদল পাখি খাবার খেয়ে চলে যাচ্ছে পরে আরেকদল পাখিদের আসছে খাবারের জন্য। এ যেন পাখিদের খাবার খাওয়ার এক সন্ধিপত্র । সব মিলিয়ে এ যেন এক অপরুপ প্রাকৃতিক দৃশ্যে। পালাক্রমে পাখিদের খাবার এ নয়নাভিরাম দৃশ্যে নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের। প্রতিদিন পাখিদের এ খাবার দৃশ্য দেখতে মিলে ভীড় জমাচ্ছেন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
মিলটির অবস্থান জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের মাঝিপাড়া চৌধুরীগছ এলাকায়। ২০০১ সালে হাস্কিং মিল দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন ওই এলাকার বাসিন্দা মো শাহজাহান আলী। তখন থেকেই তার মিলে পাখিদের আসা যাওয়া ছিল। তখন এত পাখির আনাগোনা না থাকলেও পাখিদের নিরাপত্তা,খাদ্য ও বাসস্থান মেলায় দিনে দিনে তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তখন থেকেই তিনি তার মিলে পাখিদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। পাখিরা খাবারের সন্ধানে তার মিলে এলে তিনি কখনো পাখিদের তাড়াতেন না। এভাবেই পাখিদের সাথে বন্ধুত্ব হয় শাহজাহান আলীর। কখনো কোন কারনে মিলে উৎপাদন কাজ বন্ধ থাকলে তিনি পাখিদের জন্য গুদামের দরজা খুলে দিতেন যেন তাদের খাবারের কোন সমস্যা না হয়। যখন মিলে ধান,চাল থাকেনা তখন তিনি খাবার কিনে এনে দিতেন যেন পাখিদের খাবারের কোন সমস্যা না হয়।
মিলের শ্রমিক মো জসীম উদ্দীন (৩৫) জানান, আমি এ মিলে প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছি। এখানে প্রতিদিন হাজার-হাজার পাখি খাবারের সন্ধানে আসে। মহাজনের নির্দেশ পাখিদের ধরা বা মারা যাবেনা এমনকি পাখিরা খাবার খেতে এলে তাড়ানোও যাবেনা। তাই আমরা পাখিদের বিরক্তও করিনা । তারা নিজেদের মত করে এসে খাবার খেয়ে চলে যায়।
মিলের শ্রমিক মো রমজান আলী (৪৬) জানায়, আমাদের মিলে প্রতিদিন সকাল-বিকেলে হাজারো পাখি খাবার খেতে আসে। মিলের মধ্যে এ যেন এক অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আমরা পাখিদের দেখে রাখি কেউ যেন তাদের না মারে। প্রতিদিন পাখিদের এ মিলনমেলা দেখতে আমাদের মিলে বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষজন আসে। এসব দেখতে আমাদের ভালই লাগে।
জবেদা অটো রাইস মিলের অন্যতম কর্ণধার শফিকুল ইসলাম (৪৫) জানান,আমার বাবা একজন পাখিপ্রেমী মানুষ। তিনি পাখিদের খাবার খাওয়াতে ভালবাসেন। আমাদের মিলে যখন ধান বা চাল থাকেনা কিংবা ঈদে মিল বন্ধ থাকে তখন তিনি পাখিদের খাবার কিনে এনে খাওয়ান। তিনি মিলে খাবার খেতে আসা পাখিদের দেখে রাখতে আমাদের নির্দেশ দেন। আমরাও তার নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করি। সেই সাথে পাখি দেখতে আসা দর্শনার্থীদের পাখিদের বিরক্ত না করতে অনুরোধ করেন তারা।
মের্সাস জবেদা অটো রাইস মিলের মালিক মো শাহজাহান আলী (৭০) বলেন, আমার অটো রাইস মিলে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১০-১৫ হাজার পাখির দেখা মেলে। পাখিগুলো মূলত খাবারের সন্ধানে আমার মিলে আসে। আমি আমার শ্রমিকদের বলেছি কেউ যাতে খাবার খেতে আসা পাখিদের ধরা,মারা কিংবা বিতাড়িত না করে। সেই সাথে কোন দর্শনার্থীও যাতে পাখিদের ভয়-ভীতি প্রর্দশন না করে।
তিনি পাখিদের কেন খাবার খাওয়ান বা এতে তার মিলে ধান বা চালের কমতি হয় কিনা এমন প্রশ্নে তিনি জানান, পাখিদের খাবার খাওয়াতে আমার ভালই লাগে। হাদীসে আছে, কারো কোন কিছুতে পাখি বা কোন প্রাণী খাবার খেলে তা সদ্কায়ে জারিয়ার ছওয়াব পাওয়া যায়। তাই আমি আর পাখিদের খাবার খাওয়া হতে বিতাড়িত না করে বরং খেতে দেই। পাখিদের এই খাবার খাওয়াতে আমার কোন কমতি হয়না। আল্লাহর রহমতে আমার ধান বা চালের টার্গেট পূরণ হয়।
পঞ্চগড় মকবুলার রহমান সরকারী কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহনাজ পারভীন বলেন, পাখিরা মুলত তিনটি ভৌগলিক কারণে ওই এলাকায় যায় তা হল নিরাপত্তা,বাসস্থান ও খাদ্য। এসব বিষয় পাখিরা সেখানে পায় বলে তারা ওই এলাকায় ভীড় করে। আর পাশেই পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সীমান্ত ও চা বাগান রয়েছে। যার কারণে সে দেশ থেকেও পাখিরা আসে। এখানে মুলত ঘুঘু,কবুতর,শালিক,সাদা বক এসবের বেশি দেখা মেলে। আমরা যদি পাখিদের নিরাপত্তা দিতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে আরো বেশি পাখির দেখা মিলবে বলে আশা করছি।
তেতুঁলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোহাগ চন্দ্র সাহা বলেন, মিলার শাহজাহান আলী আসলেই একজন পাখি প্রেমিক । তার মিলে অসংখ্য পাখিদের মিলনমেলা বসে। আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই তার এই মহৎ উদ্দ্যোগের জন্য। পাখিদের এই মিলনমেলা কেউ যাতে ভাঙ্গতে না পারে বা পাখিদের অভয়াশ্রম যাতে বাঁধাগ্রস্থ না হয় সে ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
কেএস/বার্তাবাজার