রেলওয়ের পুর্বাঞ্চলে ভয়াবহ দুর্নীতি ও উন্নয়নের নামে অর্থ লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৮৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৭ ফুট প্রস্থের এক কক্ষের টিনশেড ভবন মেরামতে খবরচ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৬২ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৭ টাকা। বাস্তবে এই টাকায় এমন ভবন বেশ কয়েকটা নির্মাণ কোনো ব্যাপারই না।
এই কাজের জন্য আবার সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে ৫৪টি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে পূর্তকাজের মালপত্র সরবরাহের বিপরীতে দু্ই কোটি ৬২ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৭ টাকার বিল পরিশোধও করা হয়েছে।
তবে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদনেই ধরা পড়েছে এইসব দুর্নীতির ফিরিস্তি।
তারা বিল ও ভাউচার বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, ওই কক্ষ মেরামতকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন অনেক দ্রব্য সরবরাহের জন্য চুক্তি করা হয়েছে। প্রতিটি দ্রব্য বাজারদরের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি ধরে প্রাক্কলন ও দাম পরিশোধ করা হয়েছে। ওই কক্ষের মেরামত কাজটি ওয়ার্কস-সংক্রান্ত হওয়ায় রেলওয়ের প্রটোকল অনুসারে ইঞ্জিনিয়ারিং কোডের ৯০১ এবং প্রকৌশল বিভাগ প্রণীত শিডিউল অব রেইট/২০১৩ অনুযায়ী দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরি করে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে ওয়ার্কস-সংক্রান্ত কাজ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে শেষ করা হয়েছে।
আবার পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী (কারখানা) ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্রাংশ, সরঞ্জাম ও আসবাব কিনেছেন। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে চার লাখ সাত হাজার ৩২ টাকা।
আবার পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (চট্টগ্রাম) ছয় হাজার ৫০০ টাকা দামের এলইডি টানেল লাইট প্রতিটি ক্রয় করেছেন ২৭ হাজার ৭৪০ টাকা দরে। একটি ডুয়েল ক্লিপস এলইডি ফিটিং ল্যাম্পের প্রকৃত দাম ছয় হাজার ৫০ টাকা। তা কেনা হয়েছে প্রতিটি ১৪ হাজার ২৮৮ টাকায়। এলইডি টানেল লাইট ৯০টি এবং এলইডি ফিটিং ল্যাম্প কেনা হয়েছে ৫০টি। এই খাতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ২০ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩২ টাকা।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিভিন্ন মেশিনারিজ মালপত্র, স্টোন ব্যালাস্ট, লিফটিং জ্যাক, রেল ড্রিলিং মেশিন ইত্যাদি বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনায় আর্থিক ক্ষতি করেছে দুই কোটি ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৪ টাকা। বিভিন্ন মেশিনারিজ মালপত্র কিনে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ৭৮ লাখ ৮৩ হাজার ৯৪ টাকার। স্টোন ব্যালাস্ট কিনে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬০ লাখ ১০০ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি লিফটিং জ্যাকের প্রকৃত বাজারদর ১৮ হাজার ৬৮৮ টাকা। এর প্রতিটি কেনা হয়েছে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ টাকা দরে। এভাবে পাঁচটি লিফটিং জ্যাক কেনা হয়েছে।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সিলিং ও এগজস্ট ফ্যান কিনে ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭০ টাকা লোপাট করা হয়েছে। প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে এই দুই ধরনের ফ্যান। সিলিং ফ্যান কেনা হয়েছে ১৭০টি। এগজস্ট ফ্যান কেনা হয়েছে ৬০টি। একটি সিলিং ফ্যানের প্রকৃত বাজারদর ছয় হাজার টাকা, তা কেনা হয়েছে ১৪ হাজার ৪৭০ টাকা দরে। একইভাবে একটি এগজস্ট ফ্যানের দাম বাজারে এক হাজার ২৫০ টাকা, তা কেনা হয়েছে আট হাজার ৪০০ টাকা দরে।
গত অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে অতিরিক্ত দামে ৮১৬ কেজি গ্যাস কিনে আর্থিক ক্ষতি করেছে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৬ টাকা। প্রতি কেজি ৭৩০ টাকা দামের গ্যাস কেনা হয়েছে দুই হাজার ৪৪৮ টাকা কেজি দরে। এভাবে মোট ৮১৬ কেজি গ্যাস কেনা হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৬ টাকা।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের কোচের এসি মেরামতের জন্য বিভিন্ন মালপত্র কেনা হয়। এ ক্ষেত্রেও প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে মাল কেনায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯০০ টাকা। তিনটি ফটোকপি মেশিন কিনতে গিয়েও দামের গরমিল করা হয়েছে। প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দরে কেনার কারণে ক্ষতি হয়েছে ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৫ টাকা। প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে কেনা হয় এই ফটোকপি মেশিনগুলো। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনা হয়েছে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে এক কোটি আট লাখ ২২ হাজার ৮১০ টাকা।
এ ছাড়া আরো বেশ কিছু সামগ্রী কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ব্যাপারে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৮-১৯ অর্থবছরের কেনাকাটা ও অন্য কোনো বিষয় আমার জানার কথা নয়। ওই সময় আমি এখানে ছিলাম না। আমি এসেছি পাঁচ-ছয় মাস হলো। অডিটের কোনো কপিও আমি দেখিনি। আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। তা ছাড়া কেনাকাটার কথা যদি বলেন, সরকারি কেনাকাটায় ভ্যাট ও আনুষঙ্গিক খরচ নিয়ে রেট একটু বেশিই হয়।’
সূত্র-কালের কন্ঠ।
বার্তাবাজার/এসজে