চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে মাধ্যমিকে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৪.৬৫ অর্জন করেছিলেন দরিদ্র বাবার সন্তান আয়েশা। আশা ছিল কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করবেন। কিন্তু মহামারী করোনাকালে রডমিস্ত্রি বাবা ও গার্মেন্টসকর্মী মায়ের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বপ্ন ভেঙে তাকেও দুপুরের খাবারের বাটি হাতে সকাল ৮টায় ছুটতে হয় গার্মেন্টস পানে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগ্নজ রেকমত আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর মাধ্যমিকের গন্ডি পার করেন আয়েশা। তার বাবার পৈতৃক নিবাস টাঙ্গাইল সদরে। সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পিএম একাডেমি মোড়ের কাছে একটি ভাড়া বাসায় মা-বাবা ও তাদের দুই বোনের বসবাস। ছোট বোন মরিয়ম পরে তৃতীয় শ্রেণিতে। আয়েশার মা একটা গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসাবে কাজ করলেও ২০১৮ সালে অসুস্থতার কারণে ছেড়ে দেন কাজ। সেই থেকে অভাবে শুরু। আর অভাবে সর্বশেষ ধাক্কাটা দেয় মহামারি করোনা। ফলে সংসারের হাল ধরতে বই খাতা ছেড়ে হাতে তোলে নেন খাবারের বাটি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৩ আগস্ট আয়েশার বাবা কাঁচপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আয়েশার মা রওশন আরা। করোনার প্রভাবে তার বাবার কাজ বন্ধ থাকায় চার মাসের বাসা ভাড়া বাকি রয়েছে। উপার্জন না থাকায় বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করে আয়েশার বাবা সংসার চালাতেন। গত পাঁচ মাসে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ হয়েছে তাদের। এজন্য দুই মাস আগে নয় হাজার টাকা বেতনে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের ইউনেসকো গার্মেন্টসে চাকরি নেন আয়েশা।
আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আমি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই। লেখাপড়া শেষে ভালো একটা চাকরি করে আমার অসুস্থ মাকে সুস্থ করতে চাই। ছোট বোনকে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। নিখোঁজ বাবার খোঁজ চাই। আসলে আমরা খুবই অসহায়। শেষ পর্যন্ত কলেজে ভর্তি হতে পারব কি-না জানি না। বাড়ি ভাড়া, ঋণের বোঝা ও পড়াশোনা কীভাবে চালিয়ে নেব কিছুই বুঝতে পারছি না।’
আয়েশার মা রওশন আরা বলেন, প্রায় ২০ দিন ধরে আয়েশার বাবা নিখোঁজ। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পাইনি। উপায় না পেয়ে কলেজের পরিবর্তে গার্মেন্টসে ভর্তি হয়েছে মেয়ে। বাসা ভাড়া, সংসারের খরচ; সব মিলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের। মেয়েকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা আছে। সংসারে অভাব থাকায় মেয়ে চাকরি করছে। গত কয়েক মাসে আমাদের এক লাখ টাকার মতো ঋণ হয়েছে। বাসা ভাড়া বাকি। মেয়ে চাকরি না করলে রাস্তায় নামতে হতো আমাদের।
রেকমত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেন, আয়েশা মানবিক বিভাগ থেকে এবার ভালো ফলাফল করেছে। আমার বিশ্বাস লেখাপড়ায় তাকে কেউ সহযোগিতা করলে ভালো ফলাফল করবে। সেই সঙ্গে নিজের পরিবারের অভাব দূর করতে পারবে।
বার্তাবাজার/এসজে