২১, জুলাই, ২০১৮, শনিবার | | ৮ জ্বিলকদ ১৪৩৯

থেমে নেই ইয়াবার প্রবেশ, গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

আপডেট: জুলাই ১০, ২০১৮

থেমে নেই ইয়াবার প্রবেশ, গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন মাদকের গডফাদাররা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান শুরুর পর চিহ্নিত অনেক মাদক গডফাদার গা-ঢাকা দিলেও এখন তারা এলাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে কেউ কেউ নিজ এলাকায় ফিরেও এসেছেন। পাশাপাশি চলমান সাঁড়াশি অভিযানেও থেমে নেই ইয়াবার প্রবেশ। এখনো এগুলো ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৌশল বদল করে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। তবে অভিযানের কারণে ইয়াবার দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, চলমান অভিযানে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেফতার হয়েছেন ২১ হাজার মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী। মামলা হয়েছে ১৫ হাজার। অন্যদিকে, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ১৫৩ জন; যার মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ৮৪, র‌্যাবের সঙ্গে ৩৪ এবং বাকি ৩৫ জন ‘মাদক ব্যবসায়ীদের দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। এর পরও ইয়াবা চক্রের শক্ত নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হয়নি। রাঘব-বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন। মাঝে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও র‌্যাব ও পুলিশের তালিকাভুক্ত অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ী সিলেটের আবদুল্লাহ শাফি সাঈদ ও ডুম শাহেদ অনেকটা প্রকাশ্যেই তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এরকম শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীও পলাতক থেকে প্রকাশ্যে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সূত্র জানায়, মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের আগে পাঁচটি সংস্থা পৃথকভাবে তালিকা তৈরি করেছিল। এসব তালিকায় সর্বমোট মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার। ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে সর্বশেষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তুত করা তালিকায় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৫৫০। এর মধ্যে প্রায় দেড় শ রয়েছেন মদদদাতা। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবসায়ীর অবস্থান কক্সবাজারে। বর্তমানে রাজধানীতে তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৮২। ওয়াকিবহালরা মনে করছেন, মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আসা পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলে মাদক রোধ করা সম্ভব নয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সংশ্লিষ্টতা ও সহযোগিতা ছাড়া মাদকের চালান সীমান্ত থেকে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অসাধু সদস্যরা মাদক ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন— মাঝেমধ্যে এমন অভিযোগ উঠছে। ধরাও পড়ছেন কেউ কেউ। তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তেমন কোনো লাভ হয়নি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা কঠোর না হলে মাদক প্রবেশ কিংবা ব্যবসা ঠেকানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় অভিযানও হবে ‘চোর-পুলিশ’ খেলার মতো। তারা আরও বলছেন, অনেক এলাকায় মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নামও উঠে এসেছে। এখন মাদক ঠেকাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাতেই শুদ্ধি অভিযান দরকার। এ বিষয়ে মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.) বলেন, ‘শর্ষের ভিতরে যদি ভূত থাকে তাহলে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যই সফল হবে না। একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য মাদকই যথেষ্ট। ইয়াবার মতো ভয়ঙ্কর মাদক কোথা থেকে আসছে, কোন পয়েন্ট দিয়ে আসছে তা তো দেশের সবকটি গোয়েন্দা সংস্থা এমনকি সরকারের সর্বোচ্চ মহল পর্যন্ত অবগত। তাই আমার পরামর্শ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কক্সবাজারকেন্দ্রিক একটি যৌথবাহিনী গঠন করা উচিত। যতদিন পর্যন্ত না ইয়াবার প্রবেশ বন্ধ হবে, ততদিন পর্যন্ত ওই যৌথবাহিনী ওই এলাকায় কাজ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাদক নির্মূলের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মতো একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের অস্ত্র দেওয়া হয় না। এটা তো কোনোভাবেই ভালো লক্ষণ হতে পারে না। একই সঙ্গে মাদক আইনও যুগোপযোগী করা দরকার।’ উল্লেখ্য, ঘোষণা দিয়ে গত ১৮ মে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে পুলিশ। তবে ৪ মে থেকে পৃথকভাবে অভিযানে নামে র‌্যাব। অভিযানে যারা গ্রেফতার হয়েছেন কিংবা মারা গেছেন তার বেশির ভাগই নিচের পর্যায়ের, কেউ কেউ মাঝারি পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী। সম্প্রতি কক্সবাজারে জব্দ ৭ লাখ পিস ইয়াবা বিক্রির ঘটনা তদন্তে নেমে নয়জন পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত দল। এ ছাড়া একটি গোয়েন্দা সংস্থা সারা দেশে মাদক স্পট ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন পেশার যেসব ব্যক্তি অনৈতিক সুবিধা বা মাসহারা নেন তাদের তালিকা তৈরি করে। এ তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়দাতাদের নামও উঠে আসে। যদিও তার সিকিভাগও আইনের আওতায় আসেনি। ফলে মাদক স্পটগুলো থেকে তাদের মাসহারা আদায়ও অব্যাহত রয়েছে। এ তালিকাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর সেখান থেকে যাচাই করে পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যারা মাদকের সঙ্গে জড়িত তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। এ নিয়ে কাজ চলছে।’ র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান বলেন, ‘মাদকের সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মাদক অভিযানে আরও পরিবর্তন আসবে। অনেক মাদক ব্যবসায়ী গা-ঢাকা দিয়েছেন। মাদকবিরোধী অভিযানের কারণেই এসব ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে।’ তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী সে যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এখানে কে ছোট, কে মাঝারি আর কে গডফাদার— তাদের কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

ঢাকায় অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্ন : রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বনানীর কড়াইল বস্তি ও কমলাপুরের টিটিপাড়া বস্তিতে আয়োজন করে পুলিশের অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্নের অবতারণা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের খবর আগেই চলে গেছে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। ফলে আগেভাগেই তারা মাদক নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রেখে নিজেরাও সটকে পড়েছেন। এ অবস্থায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের শীর্ষ ৮২ জন মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে মাত্র সাতজনকে আইনের আওতায় আনতে পেরেছে।