প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভিটেমাটিহীন এক মুক্তিযোদ্ধা আকুল আবেদন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাক এবং দেশমাতৃকার টানে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ৭৫ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলী আহমদ। তিনি হাজীগঞ্জের হাটিলা পশ্চিম ইউনিয়নের ধড্ডা গ্রামে বসবা করেন।

দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হয়েগেলেও হয়নি এই মক্তিযোদ্ধার কোন ভিটে-মাটি। নেই নিজের কোনও বসতঘরও।

গত ৪৫ বছর ধরে আত্মীয়ের কাচারিঘরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দিনযাপন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলী আহমদ। কাচারিঘরটি পরিত্যক্ত হওয়ায় এখানে থাকছেন তিনি। উপরন্তু বৃদ্ধ বয়সে ভুগছেন নানা রোগে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে ভাতা পান তা দিয়ে ওষুধ আর সংসার চলে কোনওভাবে।

মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী ছায়েরা খাতুন রানু জানান, আমাদের চার সন্তান। এরমধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে একটি দুর্ঘটনার পর প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। তবে এখনও প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েকে দেখতে হয় আমাদের।

তিনি আরও বলেন, আমার স্বামীর খালু মৃত ডা. ছলিম উদ্দিনের দেওয়া কাচারিঘরে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতাম। পরে সেই ঘরটি বসবাসের অনুপযোগি হওয়ায় বর্তমানে অন্য এক আত্মীয়র ঘরে থাকছি। কিন্তু এই মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও থাকবে না সেই ঘরটি আত্মীয়ের প্রয়োজন হলে।

ছায়েরা খাতুন রানু জানান, স্বামী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একমাত্র আয় সরকারি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ১২ হাজার টাকা। কিন্তু স্বামীর চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য মাসে প্রয়োজন প্রায় ৪০ হাজার টাকা। তাই স্বামীর চিকিৎসা করাতে পারছেন না টাকার অভাবে।

জায়গা কিনেন নাই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, থাকি অন্যের ঘরে আর যেখানে স্বামীর চিকিৎসা করাতেই পারছিনা সেখানে কিভাবে জায়গা কিনবো।

মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমদ বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়ায় আর আইএ পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন স্থানে অনেক ঘুরেও কোথাও চাকরি হয়নাই। পরে ঢাকায় হকারি এবং পান-সিগারেট বিক্রি করে সংসার চালিয়েছি।

মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আমার পৈত্রিক কোন সম্পত্তি নেই। আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখছি খালু ডা. ছলিম উদ্দিনের দেওয়া একটি কাচারি ঘরে বাবা, মা ও ৯ বোনসহ বসবাস করে আসছি। এক এক করে আমার সব বোনের বিয়ে হয়ে যায়। পরে এক সময় বাবা-মা মারা যান। আমি স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে কাচারিঘরেই বসবাস করছিলাম। কিন্তু এই কাচারিঘরটা নষ্ট হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পরে। তাই এখন অন্য এক আত্মীয়ের ঘরে বসবাস করছি। বর্তমানে সরকার অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের ঘর দিচ্ছে কিন্তু জমি না থাকায় আমি সেই ঘর পাচ্ছি না।

তিনি আরও বলেন, আমি কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিলাম জমি কেনার জন্য। কিন্তু সেই টাকা ক্যান্সার, হার্টে ব্লক এবং ফুসফুসে ইনফেকশনের চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়ে যায়।

তিনি অভিযোগ করেন, আমাদের সরকার ফ্রি করে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার প্রায় সব চিকিৎসাই টাকা দিয়ে করতে হচ্ছে। এই করোনাকালীন সময়েও আমাকে টাকা দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। আমাকে ছয় মাস পর পর ৪২ হাজার টাকা মূল্যের একটি ক্যান্সারের ইনজেকশন নিতে হয়।

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং প্রতিবন্ধী হলেও কোন কোটায় চতুর্থ শ্রেণির চাকরিও তাদের হয়নি। সন্তানদের চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন লাভ হয়নি।

গাজী আলী আহমদের আবেদন, আমি এখন নিঃস্ব, থাকার জায়গা নেই, টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। তাই বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনিার সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমাকে একটু আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিন। অন্তত নিজ ঘরে থেকে যেন মরতে পারি।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বৈশাখী বড়ুয়া বলেন, ভিটি জমির জন্য মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলী আহমেদ আবেদন করলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৈশাখী বড়ুয়া বলেন, সরকার সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে ক্যান্সার,কিডনি ও হৃদরোগসহ বেশ কয়েকটি জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করে থাকে। তিনি যদি আবেদন করেন, সে ক্ষেত্রেও আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এসব বিষয় দেখার জন্য উপজেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। তিনি সেখানে আবেদন করলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

বার্তা বাজার কে.কে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর