শাহজালাল বিমানবন্দরের ভেতরে অস্বাস্থ্যকর খাবারের রমরমা ব্যবসাঃ বৈধ ব্যবসায়ীরা বিপাকে
বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দেশের প্রাণকেন্দ্র হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি স্পর্শকাতর ও সংরক্ষিত এলাকা। যেখানে দেশী-বিদেশী যাত্রী ও পর্যটকেরা প্রতিনিয়ত যাতায়াত করেন। বাংলাদেশ সরকারের শক্তিশালী প্রশাসনিক সহযোগিতায় সেখানে নিরবিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এমন একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশকে উপেক্ষা করে অবৈধ দোকানপাট ও ভাতের বাটির রমরমা ব্যবসা বিমানবন্দরের পরিবেশকে করছে অপরিচ্ছন্ন আর ঝুঁকিপূর্ণ। যা দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সুনাম করছে বিনষ্ট। বিশেষত দেশের করোনা মহামারিতে এমন লজ্জাজনক অধ্যায় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম অব্যবস্হার নামান্তর।।
বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারে শক্ত অবস্থানে রয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান (এপিবিএন)। সকল যাত্রী ও দর্শনার্থীদের নিয়মিত তল্লাশি করে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে ভেতরে। এপিবিএন এর তল্লাশির আওতায় বিমানের সকল স্টাফ ও সাধারন মানুষ। কিন্তু কি এক অদৃশ্য শক্তি!! সবার অলক্ষ্যে ভেতরে প্রবেশ করছে ভাতের বাটি বা বক্সসহ পায়ে চালিত ভ্যান, কভার্ড ভ্যান কিংবা মোটরসাইকেল। এই দূর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে এসব মানহীন খাবার কিভাবে এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকছে- তা শুধু জাগ্রত বিবেক কে ভাবায় না বরং সারা বাংলাদেশকেই ভাবিয়ে তোলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন খাবার ব্যবসায়ী জানান- আমি ভ্যানে করে খাবার বাটি মেইনরোড পর্যন্ত নিয়ে আসি। পরে ভেতর থেকে মাইক্রোবাস এসে খাবার নিয়ে যায়। আমি প্রতিদিন ১৫০/২০০ খাবার বক্স ভেতরে দেই।
বিদেশের মাটিতে যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্হান সমৃদ্ধশালী করছে তাদের পাঠানো বিভিন্ন সামগ্রী এয়ারপোর্ট হতে বের করতে কাজ করছে সি এন্ড এফ। সি এন্ড এফ এর কাজের গতি বাড়ানো ও আরো ডিজিটাল করতে সরকার নির্মাণ করেছে নতুন বহুতল ভবন। কিন্তু সেখানে ও তার আশেপাশে দেখা যায়, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তুপ। বাটিতে বিক্রিত খাবার খেয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে প্লাস্টিকের খাবার বক্স বা বাটি। এ বিষয়ে বলার কেউ নেই। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে আমরা এতটাই উদাসীন- এটা তারই নামান্তর।
কাস্টমস্ হাউজের মূল গেটে রয়েছে আনসার বাহিনীর চেকপোস্ট। আনসারের লোকজন এখানে কার্ড প্রদর্শন পূর্বক কাস্টমস্ হাউজে ঢুকতে দিচ্ছে সবাইকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়- এই কাস্টমস্ হাউজের ভেতরেই চলছে ভাতের বাটি ও দোকানের রমরমা ব্যবসা। যেখানে কাস্টমস্ সংশ্লিষ্ট লোক ছাড়া অন্যকেউ ঢোকার অনুমতি নেই। সেখানে শতশত ভাতের বাটিসহ ব্যবসায়ীরা কিভাবে ঢুকছে? তাহলে কি এই অবৈধ ব্যবসার সাথে আনসার বাহিনী জড়িত?
কাস্টমস্ হাউজের ভেতরে ছোট ছোট প্লাস্টিকের টুল কিংবা ইটের দেয়ালের উপর বসে খোলা আকাশের নীচে খোলা খাবার খাচ্ছে মানুষজন। বিষয়টি বিচিত্র বটে!! প্লাস্টিকের বড় বোতলে
ডাল, ভাতের বাটিতে তরকারি ও প্লাস্টিকের ড্রামে সরবরাহ করা হচ্ছে পানি। লাইনে দাঁড়িয়ে কিংবা ইটের দেয়ালের উপর বসে খোলা খাবার খাচ্ছে মানুষজন। এটা কতটুকু স্বাস্থ্যকর আর এসব খাবার ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছে কে? এই অবৈধ খাবারের ব্যবসায় লাভবান হচ্ছে কে? সেটাই বিবেচ্য বিষয়!!
অনুসন্ধানে জানা যায়- একশ্রেণির অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তার যোগসাজশে চলছে এসব অবৈধ দোকান ও খাবারের ব্যবসা। প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ভেতরের ব্যবসা করা পর্যন্ত যাদের হাতে দায়িত্ব তারা সহযোগিতা না করলে কখোনোই এটা সম্ভব নয়। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান ভেতরে প্রবেশ করতে না দিলে তারা ঢুকতে পারবে না। কাস্টমস্ কর্তৃপক্ষ ভেতরে দোকান বসতে না দিলে ব্যবসা হবে না। তাহলে কার অবহেলা আর সহযোগিতায় এসব অবৈধ খাবারের দোকান চলছে তা সহজেই অনুমান করা যায়! এসব স্পর্শকাতর জায়গায় এতো দোকানের হাট কতটুকু বৈধ- তা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
এয়ারপোর্টের ভেতরে থাকা সরকার অনুমোদিত “এয়ারপোর্টে হোটেল” এ সরেজমিনে দেখা যায়, এটি বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ইজারার মেয়াদ শেষ হবার কারণে এটি বন্ধ রয়েছে। কিন্তু পাশেই ছোট কিছু দোকান ইজারায় চললেও সেখানেও রয়েছে বিপত্তি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দোকানদার জানান- আমার দোকানের বাহির অংশে এক ফুট জায়গা বেশী ভোগ করায় আমার মোটা অংকের জরিমানা করা হয় কয়েকবার। এভাবে জরিমানা দিতে দিতে এখন আমি নিঃস্ব। আমরা এক ফুট জায়গা বেশী এগুতে যদি এত জরিমানা হয় তাহলে সিএন্ডএফ পার্কিং ও কাস্টমস হাউজের ভেতরে এতগুলো অবৈধ দোকান কার ইশারায়, কিভাবে চলে? আমি ১৩লাখ টাকায় এক বছরের ইজারা নিয়েছি। এখন আমাদের লাভ নয় বরং আমরা ভূর্তকি দিচ্ছি প্রতিদিন।।
অবৈধ খোলা খাবার বিক্রি হচ্ছে কেন জানতে চাওয়া হলে একজন কর্মচারী জানান- এক শ্রেনির অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তা সামান্য সুবিধা ভোগের লোভে এসব করছে। তিনি বলেন- এত নিরাপত্তা ভেদ করে কিভাবে এসব বাটি খাবার ঢুকছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে আমরা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে লিখিত অবিহিত করলেও বিশেষ কোন ফলাফল লাভ হয়নি। বিমান কর্তৃপক্ষ আমর্ড পুলিশ সহ আনসার বাহিনীকে নোটিশ প্রদান করলেও বন্ধ হয়নি এসব খাবারের দোকান ও বাটি খাবারের ব্যবসা। তিনি আরো বলেন- এরা এয়ারপোর্টের পরিবেশ নষ্ট করছে। আর এসব খাবার খেয়ে কেউ অসুস্থ হলে এর দায়ভার নিবে কে? আমরা বাংলাদেশ বিমান, সিভিল এভিয়েশন ও বিমান মন্ত্রণালয়ের সু দৃষ্টি কামনা করছি।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে সিভিল অ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান, কাস্টমস কমিশনার ও ম্যানেজার কাউকেই পাওয়া যাইনি। সিভিল অ্যাভিয়েশনের একজন উপ-সচিব জানান- আপনারা কর্তৃপক্ষকে জানান। আমার বলা যুক্তিযুক্ত হবে না। পরে বিমানবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জনাব ফরমান আলী কে ফোন করলে তিনি জানান- এটা আমাদের দায়িত্ব নয়, সিভিল অ্যাভিয়েশনের দায়িত্ব। আপনারা সেখানেই কথা বলুন।।
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত এই বাংলাদেশ আমাদের সকলের। দেশ-বিদেশের সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুনাম ও মান রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সামান্য লোভে না পড়ে বিমানবন্দরের পরিবেশ নষ্ট না করে একটি সুন্দর আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সকলের কাজ করা উচিত বলে মনে করেন বিজ্ঞ মহল। তারা এয়ারপোর্টের পরিবেশ সুন্দর রাখতে সুষ্ঠু শৃঙ্খলিত ব্যবস্হাপণার জোর দাবী জানান। এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ, বিমান মন্ত্রণালয়, সিভিল এভিয়েশনসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের সু দৃষ্টি দেয়া ও যাবতীয় সুব্যবস্হা গ্রহণ এখন সময়ের দাবী।
বার্তাবাজার/এসজে