দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমকে হত্যার নেপথ্যে কারা জড়িত এ বিষয়ে কোন পক্ষ থেকেই এখনো সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। শুক্রবার ভোররাত থেকে বিকাল পর্যন্ত মোট ৪ জনকে সন্দেহভাজন আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম, যুবলীগের সদস্য আসাদুল ইসলাম, উপজেলার ৩নং সিংড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মাসুদ রানা ও নৈশ প্রহরী নাহিদ হোসেন পলাশকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
যাদের এখন পর্যন্ত আটক দেখানো হয়েছে তার মধ্যে নৈশ প্রহরী নাহিদ হাসান পলাশ বাদে সবার নামেই আছে একাধিক মামলা, মাদকের ব্যবসা, মাদক সেবন, জমি দখলের অভিযোগ, চাঁদাবাজি, ত্রাণ চুরি, মেয়র, সাংসদসহ সাধারণ মানুষকে মারার অভিযোগ। এছাড়া গত কয়েকদিন আগে বালু মহাল নিয়েও ইউএনও’র সাথে আটকৃতদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল বলে জানা যায়।
বার্তা বাজারের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যুবলীগের আহ্বায়কসহ অন্যান্য নেতাদের বিভিন্ন অপকর্ম। জাহাঙ্গীর-আসাদুল ও মাসুদ বাহিনীর কাছে জিম্মি ঘোড়াঘাটের অনেকেই। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন, হামলা-মামলা এসব নিত্য দিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই তিন ব্যক্তির কাছে। এসব অপকর্ম দূর করতেই ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম জাহাঙ্গীর-আসাদুল ও মাসুদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে, এসব কারণেই ইউএনও’র উপর চড়াও হন তারা।
যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের একটি ভিডিও বার্তায় দেখা যায়, এই যুবলীগ নেতা জেলার হাকিমপুরের হিলি এলাকায় গিয়ে মাদক সেবন করছেন। এ সময় হাতেনাতে পুলিশের কাছে ধরা খেয়ে নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা বলে পরিচয় দেন। পরে পুলিশের কাছে সেবারের মত ক্ষমা চেয়ে পার পান।
এখানেই সীমাবদ্ধ নেই জাহাঙ্গীর আলম! চলতি বছরের ১৩ মে ঘোড়াঘাট পৌরসভার মেয়র ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছিলেন। মেয়রের ত্রাণ বিতরণ বানচাল করার জন্য মেয়রকে মারপিট করে জাহাঙ্গীর-আসাদুল বাহিনী। ওই সময় মেয়রের মামলায় জাহাঙ্গীর আলমসহ তার বাহিনীর ৪ সদস্যকে আটক করে পুলিশ।

ঘোড়াঘাট উপজেলার রাণীগঞ্জ বাজার এলাকায় নুনদহ ঘাটে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছিল সিংড়া ইউনিয়নের যুবলীগ সভাপতি মাসুদ রানা। সেখানে ইউএনও ওয়াহিদা খানম বেশ কিছুদিন আগে বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম পুড়িয়ে দেয়। ফলে ইউএনও’র উপর ক্ষিপ্ত হয় যুবলীগ নেতা মাসুদ রানা। বালু উত্তোলনের ঘটনাই শেষ নয়, এই বছরের ১৪ মে ইউএনও’র কাছে মুক্তিযোদ্ধা সায়েদ আলীর জামাতা আবিদুর রহমান জাহাঙ্গীর আলম ও মাসুদ রানার বিরুদ্ধে জমি দখল ও চাঁদা দাবি করার অভিযোগ করেন। অভিযোগে আবিদুর রহমান জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই বছর ধরে জাহাঙ্গীর আলম ও মাসুদ রানা পাঁচ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। মৃত্যুভয়ে আবিদুর রহমান ২ লাখ টাকা জাহাঙ্গীর আলম ও মাসুদ রানাকে দেয়। পরে বাকি ৩ লাখ টাকা দিতে না পারায় উপজেলার কলোনি পাড়া এলাকায় ১ একর জমি দখল করে নেয় জাহাঙ্গীর বাহিনী। এই বিষয়টা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম গুরুত্বের সাথে দেখে। সেই সাথে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের বিষয়ে তৎপরতা চালান।
অভিযোগ আছে, জাহাঙ্গীর-আসাদুল এবং মাসুদ রানা প্রায় সময় উপজেলার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে জমি কেনাবেচার সময় চাঁদা নিয়ে আসছিলেন। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বাহিনী দিয়ে সেই জমিতে দখলদারি করত। এই বাহিনীর প্রধান অর্থদাতা হিসেবে ছিলেন মাসুদ রানা। মাসুদ রানা ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩ নং সিংড়া ইউনিয়নের যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, জাহাঙ্গীর আলম একজন মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। পুরো উপজেলাতে তিনি মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করতেন। তার নেতৃত্বে নান্নু, মাসুদ রানা, ইয়াদ আলী, নাহিদ, আব্দুর রব, নবিউল ইসলাম নামের বেশ কয়েকজন যুবক নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তোলেন।
এছাড়াও দিনাজপুর-৬ আসনের সাংসদ শিবলী সাদিককেও ত্রাণ বিতরণে সময় রাস্তা আটকিয়ে মারার পরিকল্পনা করেছিলেন জাহাঙ্গীর-আসাদুল ও মাসুদ বাহিনী।
দিনাজপুর-৬ আসনের সাংসদ এমপি শিবলী সাদিক বলেন,‘আটক জাহাঙ্গীর আলম একাধিক মাদক মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত তিন মাস আগে দল থেকে বহিষ্কার করার জন্য কেন্দ্রে চিঠি পাঠিয়েছি।
তিনি বলেন,‘ করোনাকালীন সময়ে নিজ তহবিল থেকে চার উপজেলায় ৬০ হাজার মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছি এরই অংশ হিসেবে ঘোড়াঘাট পৌর সভায় রক্ষিত ত্রাণ ছিনতাইয়ের জন্য জাহাঙ্গীর আলম মেয়রকে হুমকি দেয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় জানতে পারি, জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে নান্নু, মাসুদ রানা, ইয়াদ আলী, নাহিদ, আব্দুর রব এর একটি দল এমপি’র ওপর হামলার জন্য রাস্তায় পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরে সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।’
দলীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম ২০১৭ সাল থেকে ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত ক্ষুব্ধ। এর আগে গত ৭ জুন তাকে বহিষ্কারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক ডিও দেয় এবং জেলা যুবলীগের সুপারিশসহ কেন্দ্রে পাঠায়। কিন্তু তাকে বহিষ্কার করা হয়নি।
দিনাজপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি রাশেদ পারভেজ বলেন, ‘জাহাঙ্গীর যুবলীগের আহ্বায়ক হলেও সেই কমিটি হয়েছিল ৩ বছর আগে। সাধারণ নিয়মে ৩ মাসের বেশি সময় হলে সেই কমিটির কার্যকারিতা থাকে না। এরপরেও তাকে বহিষ্কারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও নিয়ে সুপারিশসহ কেন্দ্রে চিঠি দেয়া হয়েছিল। কারণ, তাদেরকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা জেলা কমিটির নেই।
তবে শুক্রবার বিকেলে জেলা যুবলীগের সভাপতি রাশেদ পারভেজ বলেন, ‘জাহাঙ্গীর হোসেন ও মাসুদ রানাকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মোবাইল ফোনে এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল নিশ্চিত করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোন চিঠি পাননি বলে জানান তিনি।’
বার্তা বাজার / ডি.এস