রাজধানী জুড়ে বেড়েছে ছিনতাই, আলোশূন্য হওয়ায় বেড়িবাঁধ এলাকাগুলো প্রধান টার্গেট

অতুল চন্দ্র বর্মন(ছদ্মনাম) নবোদয় কাঁচাবাজার থেকে ঢাকা উদ্যানের ঢাল দিয়ে হেটে বাসায় যাচ্ছিলেন। ঢাকা উদ্যান কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে আসতেই লাল কালারের চুল,হাতে ষ্টীলের চুড়ি, চেহারায় কাটা দাঁগওয়ালা দুই যুবক এগিয়ে আসলো। একজনের হাতে রাম দা, আরেকজন চাপাতি বের করে “দাঁড়া” বলতেই সাথে সাথে আরো দূজন চলে আসলো। দুজন হাতে থাকা ধারালো ছুরি বের করে তলপেট বরাবর ধরলো। এতেই অতুলের শরীর ঘেঁমে হাটু কাঁপাকাঁপি শুরু করলো।ভয়ে পুরো শরীরে বরফ জমে গেছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই চাপাতির উল্টো পিঠ দিয়ে অতুলের পাঁয়ে প্রছন্ডভাবে আঘাত করলে সে ব্যাথায় বসে যায়। তাদের মধ্য থেকে একজন পকেট হাতিয়ে সব নিয়ে ঢাকা উদ্যান খালের উপরে থাকা ব্রীজ দিয়ে শেখেরটেক মাঠের দিকে চলে যায়। পিছন থেকে ব্রিজের উপরে থাকা দশ-বারোজন যুবকের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে তারা উল্টা ধমক দিয়ে বললো, চলে যাও। না হয় তোমাকে মেরে ফেলবে।’

এ ঘটনায় আদাবর থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ ছিনতাইয়ের মামলা করতে বলে। কিন্তু মামলার ভোগান্তি এড়াতে মোবাইল ফোন ও টাকা হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। আদাবর থানার জিডি নং -১২১২।

অতুল যেখানে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন।সেখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক সপ্তাহে ঐ জায়গায় অন্তত পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।যা গত মাস দুয়েক আগেও ছিনতাইয়ের প্রবণতা এতটা ছিল না বলে স্থানীয় লোকজন জানান।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নবোদয় থেকে ঢাকা উদ্যান যাওয়ার পথে যে কালভার্ট আছে। কালভার্টের এপাড়ে মাঠে বসে শেখেরটেক থেকে কয়েকজন ছেলে এসে মাদক সেবন ও ছিনতাই করে। তাদের সাথে নবোদয় হাউজিং এলাকার কিছু ছেলে জড়িত। এ ব্যাপারে সবাই জানলেও কেউ ভয়ে কিছু বলার সাহস পায়না।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, শেখেরটেক ৬ নম্বর সড়কের আফসু মিয়ার বাড়ির পাশে ভাঙারির দোকান এবং ময়লার ডাস্টবিনে কাজ করা ছেলেরা এই ছিনতাই করে থাকে। তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শ্যামলী হাউজিং এলাকার একাধিক দল সহযোগিতা করে।

আদাবর থানা এলাকার শেখেরটেক, আদাবর ১০, ১৬, মনসুরাবাদস হাউজিং, সুনিবিড় হাউজিং, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন তুরাগ হাউজিং, হাড্ডিপট্টি, স্লুইজ গেট, আহমেদ নগর এলাকা ঘুরে ছিনতাইয়ের ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেছে।

নবোদয় হাউজিংয়ের এই জায়গাতেই নয়। মোহাম্মদপুর থানা এলাকার মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়, লাউতলা, কাটাসুর, শ্যামলি, কলেজগেট, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ও লেগুনা ষ্ট্যান্ডে এসব ঘটনা এখন নিয়মিত।

মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প সূত্র জানায়, ক্যাম্পের উত্তর অংশ, বাবর রোড, শ্যামলী, শিশুমেলা, কলেজগেট, শাহজাহান রোড এলাকায় ছিনতাইয়ে জড়িতদের বেশির ভাগই জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা। ক্যাম্পে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় গত দুই মাস ধরে ক্যাম্পের বেশ কিছু সংঘবদ্ধ চক্র বর্তমানে ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমাদের এলাকাজুড়ে আইন-শৃঙ্খলার টহল আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অপরাধের প্রবনতা বেশি বলে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। ঐ এলাকাগুলোতে আমরা ডিউটিরত টহল গাড়ির টহল বাড়িয়ে দিয়েছি। যেকোনো ঘটনায় আমরা দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

আদাবর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আলম তিনি বলেন, ‘যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমাদের থানা জুড়ে টহল অব্যাহত রয়েছে।’

মোহাম্মদপুর, আদাবরের পাশাপাশি রাজধানীর গাবতলী, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, কল্যাণপুর, সায়েদাবাদ, সদরঘাট, কামরাঙ্গীর চর, হাজারীবাগ এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে।

গাবতলী দ্বীপনগর এলাকার বাসিন্দা শাহজালাল (ছদ্মনাম) বলেন, ‘বেড়িবাঁধে তো লাইট নাই। তাছাড়াও এই এলাকা জনশুন্য হওয়ায় সন্ধ্যার পর অন্ধকারে ছিনতাইকারীরা খুব সহজে ছিনতাই করার সুযোগ পায়। এছাড়াও তাদের হাতে ধারালো অস্র থাকায় আশপাশের লোকজন ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পায়না।

গাবতলী এলাকার আরেক বাসিন্দা রেজাউল (ছদ্মনাম) হোসেন বলেন, ‘বাস টার্মিনাল, মাজার রোডের কোনায় প্রায়ই ছিনতাই হয়। কে বা কারা করে কেউ জানে না। এখন এমন কিছু লোক এলাকায় দেখা যায়। যাদের এলাকায় আগে কখনো দেখা যায় নি।

মিরপুর-১ নম্বর এলাকার বাসিন্দা ফিরোজ (ছদ্মনাম) আহমেদ বলেন, ‘সন্ধ্যার পর এখন ফুটওভার ব্রিজে ওঠা রিস্কের। ছোট গলিতে যেতেও ভয় লাগে। যে কোন মুহুর্তে চিনতাই হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুলিশের টহল আরও বাড়ানো দরকার।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, বাবুবাজার ব্রিজের আশপাশের এলাকা, গাবতলী বেড়িবাঁধ, বাড্ডা এলাকায় ছিনতাকারীরা ব্যাটারি চালিত রিকশায় ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ বুঝে ছিনতাই করে ওই রিকশা করেই পালিয়ে যায়। আর তাদের আড্ডা হয়ে উঠেছে এসব এলাকার রিকশার গ্যারেজ।

এদিকে হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, ইসলামবাগ, পোস্তাসহ আশপাশের এলাকায় ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন বিক্রির হাঁট বসে বেড়িবাঁধের সিকশন এলাকায়। বেড়িবাঁধ সড়কের দুই পাশে প্রতিদিন বিকালে ৩ টা থেকে এই হাট বসে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন বিক্রি হয় এসব অস্থায়ী দোকানে। ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন জানা সত্ত্বেও এসব মোবাইলের খদ্দের কম নয়।

কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেড়িবাঁধ সড়কটি আমাদের আওতাভুক্ত নয়। বেড়িবাঁধের একটি অংশ হাজারীবাগ থানার, আরেকটি অংশ লালবাগ থানার অন্তর্ভুক্ত।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সিকশন এলাকার একজন বলেন, অনেক সময় দামি দামি মোবাইল ফোন কম দামে পাওয়া যায়। তাই অনেকেই এখান থেকে মোবাইল কিনতে আসে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার চারজনকে ছিনতাই করা মোবাইল ফোন বিক্রির দায়ে আটক করে আদালতে চালান করা হয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে লালবাগ থানা এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে নাই।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘চুরি ছিনতাই ও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান শক্তভাবেই চলছে।বিশেষ করে মাদকাসক্তরা নানা অপকর্ম করে থাকে। এছাড়া ছিনতাই দমনে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি এবং নিচ্ছি।’

ভুক্তভোগীদের দাবি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় অভিযোগ করতে গেলে মামলা করতে হয়। মামলার ঝামেলায় জড়াতে চান না অনেকে। তাই তারা মোবাইল ফোন, টাকা বা ব্যাগ হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না করে যারা জিডি করছেন তাদের উদ্দেশে ডিসি ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ঝামেলার কথা চিন্তা করে আমরা সবাই এগিয়ে না এলে তো এদের আইনের আওতায় আনা একটু কঠিন হয়। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, মামলা অবশ্যই করবেন। তাহলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া আমাদের পক্ষে সহজ হবে।’

উল্লেখ্য, রাজধানীর মুগদা এলাকায় এ বছরের গত ২৯ ফেব্রুয়ারী শনিবার ভোরে স্বামী ও দুই সন্তানসহ কমলাপুর রেল স্টেশনে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীদের একটি চক্র লিপার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তিনি রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সকাল ৬টা ৫ মিনিটের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

এছাড়াও, ২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারিতে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছিনতাই এর ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, রাজধানীর গ্রীন লাইফ হাসপাতালের আয়া হেলেনা বেগম জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার জন্য গ্রামের বাড়ী বরিশালে যান। গ্রাম থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তার স্বামী মনিরুল ইসলাম সহ ২৬ জানুয়ারি রাতের লঞ্চে করে ভোরে ঢাকার সদরঘাটে এসে পৌঁছায়। সদরঘাট থেকে লোকাল বাসে করে ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে নামেন তাঁরা। হেঁটে কলাবাগানের বাসায় যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি প্রাইভেট কার থেকে কেউ একজন হেলেনার ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। আচমকা টানে তাল সামলাতে না পেরে ওই প্রাইভেট কারের নিচে পড়েন হেলেনা। চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।হেলেনা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্বামী মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা করেন।

বার্তাবাজার/নিমফুল

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর