রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ-বসিলা জুড়ে ‘গাঙচিল বাহিনী’ আতঙ্ক
হঠাৎ করেই রাজধানীতে বেড়েছে বিভিন্ন গ্যাং বাহিনীর দৌড়াত্ম। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ জুড়ে ঠিক তখনই গাঙচিল বাহিনীর চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক বাণিজ্য, ভূমি দখল, অপহরণ,চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট মোহাম্মদপুরবাসী। সূর্যাস্তের সাথে সাথে প্রিয় চেনা শহরের মোহাম্মদপুরবাসীদের মধ্যে নেমে আসে অজানা আতঙ্ক। আর এই আতঙ্কের নাম “গাঙচিল” বাহিনী।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে নেমে দেখা যায়- গাঙচিল বাহিনীর সেকেন্ড-ইন কমান্ড শীর্ষ সন্ত্রাসী লম্বু মোশারফের নেতৃত্বে বেড়িবাঁধের বুড়িগঙ্গা ফিলিং স্টেশনের সিনিয়র স্টাফ গ্যাস জুম্মুন (৩৫), আদাবরের মৃত আবুল কমিশনারের ছেলে মোঃ রুবেল (২৬), মাদক বিরোধী অভিযানে র্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত মোহাম্মদপুর-আদাবরের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী মৃত ফালু মিয়ার ছেলে মোঃ রবিন (২২), জুবায়ের আহমেদ প্লাবন, মোঃ নাঈম (২১), কালা জাকির (৩৫), শামীম (২২), রাফাত (২৪), জসিম (২১), রিয়াজ (২১), মোস্তফা (২৩), সাগর ওরফে বিলাই চোখ সাগর (১৮), নাসির (২০), ইমন(২০), ইব্রাহীম (১৬), হৃদয় (১৭), ময়লা মোশারফসহ ২৫-৩০ জনের এই বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর।
অভিযোগ পাওয়া যায়, গাঙচিল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড লম্বু মোশারফ পিস্তল এবং বাকি সদস্যরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিরাতে অপারেশনে মাঠে নামে। গাঙচিল বাহিনী প্রধানের নাম জানা থাকলেও প্রাণনাশের শঙ্কায় কেউ বলতে রাজি হননি। তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, প্রশাসন যখন সতর্ক হয় লম্বু মোশারফ তখন ঢাকা উদ্যানের তুরাগ নদীর ওপাড়ে সাভার থানার মধ্যে আত্মগোপন করে থাকে। আর বুড়িগঙ্গা ফিলিং স্টেশনের জুম্মন ও প্লাবন সকল অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ছক এঁকে তাদের বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড লম্বু মোশারফ-কে জানান। লম্বু মোশারফ গাঙচিল বাহিনীর প্রধানের সাথে কথা বলে অপারেশন ফাইনাল করে।

এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর গাবতলী থেকে সিকশন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গ্রুপ সন্ধ্যার পর থেকে চুরি-ছিনতাই এবং ডাকাতি করে থাকে। এরা দিনে ভূমি দখল এবং চাঁদাবাজি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর সন্ধ্যার পর থেকে আদাবরের সুনিবিড় হাউজিং এলাকার বেড়িবাঁধে সাইনিষ্ট গার্মেন্টস এর সামনে থেকে শুরু করে শ্যামলী হাউজিং এর ৬নং ও ২য় প্রকল্প, তুরাগ হাউজিং, একতা হাউজিং, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় চুরি-ছিনতাই এবং ডাকাতি করে বেড়ায়।
এছাড়াও এই বাহিনীর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা এবং মাদক সেবনের অভিযোগ করেন অনেকেই। প্রতিদিন অনেক কিশোরী, নারী পথচারী, গৃহিণী এবং মহিলা তাদের ইভটিজিংয়ের শিকার হন বলেও জানা গেছে। অনেক সময় জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায় এবং অনেকক্ষেত্রে তারা সফলও হয়। তবে, ভয়ে কেউ মুখ খোলার দুঃসাহস করে না কেউ। প্রতিটা গ্রুপে ১৫-২০ জন করে রাতে অপারেশনে তারা মাঠে নামে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
সরেজমিনে জানা যায়, গাঙচিল বাহিনীর সদস্যরা গত আগষ্ট মাসের ২৪ তারিখে অতিরিক্ত মাদকাসক্ত হয়ে মোহাম্মদপুরের তুরাগ হাউজিংয়ের বাসিন্দা আব্দুর রহিমের বাসার ম্যানেজারের স্ত্রী-কে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। বাধা দেওয়ায় ম্যানেজার এবং বাড়িওয়ালা দুজনের উপরই হামলা করে মারাত্মক আহত করে গাঙচিল বাহিনী। তাদের বাঁচাতে আদাবর থানা ১০০ নং ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্ন-আহবায়ক শাহীন মুন্না ও ১০০ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল ছুটে গেলে তাদের উপরেও হামলা চালায়। রামদা-চাপাতির কোপে মুন্না ও সোহেলকে গুরুতর যখম করলে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে।
এসময় গাঙচিল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড লম্বু মোশারফের নেতৃত্বে রামদা-চাপাতি নিয়ে গাঙচিল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপরেও হামলা চালায়। ডিএমপির মোহাম্মদপুর থানার এসআই সজীব কোচ-কে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো চাপাতি দ্বারা মাথায় কোপ দিলে এসআই সজীব কোচ মাথা সরানোর চেস্টা করলে চাপাতির কোপে উপরের ঠোঁটের ডান পাশে ও নাকের উপরে লেগে গুরুতর জখম হয় এবং মাড়ির দুটি দাঁত নড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বেতার যোগে মোবাইল/৬৩, রোমিও/৬৩ এবং কিলো/৬৩ মোবাইল ডিউটি পার্টিকে ইমার্জেন্সী মেসেজ দিলে রোমিও/৬৩ ডিউটিরত এএসআই সোহেল রানা, মোবাইল/৬৩ এএসআই মোঃ সাজেদুল হক এবং কিলো/৬৩ এএসআই বাদল চন্দ্র রায় তাদের সঙ্গীয় ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে গাঙচিল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে আব্দুর রহিম, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা শাহীন মুন্না, যুবলীগ নেতা সোহেল এবং এস আই সজীব কোচকে আশঙ্খাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ২৫ আগষ্ট বাদি হয়ে এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় এসআই সজীব কোচ ও ভূক্তভোগী আব্দুর রহিম মামলা দায়ের করেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অসংখ্য মামলা রয়েছে। তবে, সাধারণ মানুষ বলছে এদের কেউ কিছু করতে পারবে না।
জানা যায়, আগষ্টের ২৮ তারিখে এই গাঙচিল বাহিনী বছিলা গার্ডেন সিটির শাওনকে অপহরণ করে। তারপর তাকে মারধর করে ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে পুলিশ অপহৃত শাওনকে উদ্ধার করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইটভাটার মালিক জানান, গাঙচিল বাহিনীকে প্রতিমাসে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে একটু দেরি হলেই লম্বু মোশারফ তার বাহিনী নিয়ে এসে রাতের আঁধারে সিকিউরিটিকে বেঁধে মারধর করে ট্রলার ভরে ইট নিয়ে চলে যায়। আমরা বাধ্য হয়ে গাঙচিল বাহিনীকে চাঁদা দিচ্ছি।
এসকল অভিযোগের সত্যতা জানতে কথিত গাঙচিল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড মোশারফের সাথে দফায় দফায় যোগাযোগ করলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। জানা যায়, ২৫ ও ২৮ আগষ্টের ঘটনায় গাঙচিল বাহিনীর কয়েকজন সদস্য পুলিশের হাতে আটকের পর থেকে আত্মগোপনে চলে যায় লম্বু মোশারফ।
এদিকে, আদাবর থানা ১০০ নং ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক শাহীনকে দেখতে ঢাকা মেডিকেলে ছুটে যান কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ এবং পরবর্তীতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ছুটে আসেন মহানগর উত্তরের সভাপতি, সেক্রেটারীসহ আদাবর, মোহাম্মদপুর, শের-ই- বাংলা নগরের নেতারা। এসময়, এ হামলার ঘটনায় সুষ্ঠ তদন্ত করে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান নেতারা। বর্তমানে আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে স্বেচ্ছাসেবকলীগের এই নেতা।
এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ জানান, আমরা এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করেছি। বাকিদের আটক করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বার্তাবাজার/জুলভার্ন