পঞ্চগড়ে দুর্নীতির মাধ্যমে এক নামে একাধিক মাদ্রাসা স্থাপনের অভিযোগ

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জাল স্বাক্ষর, জাল জমির দলিল এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরি সহ নানান অনিয়ম আর দূর্নীতির আশ্রয় নিয়ে পঞ্চগড়ে একই নামের একাধিক মাদরাসা স্থাপন করা হয়েছে। জেলায় প্রতিষ্ঠিত ও এমপিওভুক্ত তিনটি মাদরাসার নাম নকলসহ কাগজপত্র ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে এসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি সরকার স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসাগুলোকে জাতীয়করণের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এরই সূত্র ধরে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় একটি জালিয়াতচক্র পঞ্চগড় জেলায় একই নামে তিনটি মাদরাসা স্থাপন করেছে। জালিয়াতচক্রটি তিনটি মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন ভুয়া জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে মাদরাসাগুলো এমপিওভুক্তিসহ জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা করছে। জাতীয়করণের নামেও ওই চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের আরাজী মাড়েয়া খালপাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার সহকারী শিক্ষক জয়নুল ইসলাম (৩৯) তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন বিরাট একটি জালিয়াতচক্র। তার বাড়ি পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের মন্নাপাড়া গ্রামে। সে ওই গ্রামের নছিম উদ্দিনের ছেলে। পঞ্চগড় জেলা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক সমিতির কথিত সভাপতি জয়নুল দেশের ৮টি বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিক দাবি করে নিবিঘেœ এই জালিয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। মেইনষ্ট্রিমের পত্রিকা, অনলাইন ও টেলিভিশনের সাংবাদিক না থাকলেও নিজে নিজেই সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতিও হয়েছেন। পেশাগত কাজে না থাকলেও পেশার নাম ভাঙ্গিয়ে জালিয়াতি করে আসছেন।

সম্প্রতি তার নানা জালিয়াতির অপকর্ম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে মূল মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে পঞ্চগড় সদর ও বোদা উপজেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

অভিযোগ ও সরেজমিন গিয়ে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। এরমধ্যে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার পামুলী ইউনিয়নের নগরডাঙ্গা এলাকায় ১৯৮৫ সালে পামুলী নগরডাঙ্গা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৪ সালে এমপিওভুক্ত এই মাদরাসাটির নাম হুবহু নকল করে এবং মাদরাসার মঞ্জুরী, অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতিসহ কাগজপত্র জাল ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে জয়নুল ইসলাম বোদা উপজেলার কাজলদিঘি কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের মন্নাপাড়া এলাকায় একই নামে স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা গড়ে তোলে। সে জাল ও ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে মাদরাসাটি জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জন্য বেনব্যাইজে পাঠায়। দেবীগঞ্জ উপজেলার এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান পামুলী নগরডাঙ্গা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার নামে আসা সরকারি প্রণোদনার টাকা ২৫ হাজার টাকা হুবহু নামের নকল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল কৌশলে তুলে নেন।

জয়নুল তার স্থাপনকৃত মাদরাসার কাগজপত্রে মাদরাসাটি ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৬৬ সালে মাদরাসার নামে জমি রেজিস্ট্রির দলিল দেখানো হয়। পাকিস্তান আমলে দেখানো ওই জমির দলিলের উপরে লেখা রয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া ওই ভুয়া মাদরাসার অনুকুলে যে সকল কাগজপত্র জমা দিয়েছেন তার সবগুলোই জাল। এমনকি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের উপপরিদর্শক মো. হোসেনের স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। ১৯৯০-৯১ সালে কম্পিউটার কম্পোজ ছিল না ছিল টাইপরাইটার। ভুয়া ওই মাদরাসার মঞ্জুরির জাল কাগজটি কম্পিউটার কম্পোজ করা।

এছাড়া ১৯৯০ সালের মঞ্জুরি দেখালেও ব্যাংক একাউন্ট দেখানো হয়েছে ২০১৯ সালে। এমনকি ওই মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক জয়নুল নিজেই। আবার ওই মাদরাসার সহকারী ক্বারী শিক্ষক পদে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে জয়নুল। শুধু এই মাদরাসাই নয় পঞ্চগড় সদর উপজেলায় আরও দুটি এমপিওভুক্ত মাদরাসার নাম ও কাগজপত্র জালিয়াতি করে একই কায়দায় সদর উপজেলার কামাতকাজলদিঘী ইউনিয়নের খারুয়াগ্রাম ও বন্দেরপাড়া দুটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী গড়ে তোলেন সে।

স্থানীয়দের অভিযোগ জানা গেছে, জয়নুল এই তিন মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। জাল ও ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থানে তিনি দৌড়ঝাপ করছেন। অখ্যাত পত্রিকায় ব্যাক ডেটে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাপাসহ বিভিন্ন জমির দলিল ও বিভিন্ন দপ্তরের বড় বড় কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জালের ব্যবসা রয়েছে তার। ভুয়া সদ্য প্রতিষ্ঠিত এসব মাদরাসার ছবি নিতে গেলে জয়নুলের লোকজনের বাঁধার স্বীকার হয় গণমাধ্যমকর্মীরা।

দেবীগঞ্জ উপজেলার পামুলী নগরডাঙ্গা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়ারেছ জানান, জয়নুল কাগজপত্র জাল ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে আমাদের মাদরাসার নাম হুবহু নকল করে তার বাড়ির কাছে একই নামে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। কায়দা করে আমাদের প্রণোদনার টাকাও তুলে নিয়েছে। ৩৫ বছর ধরে শিক্ষা দান করে আসলেও আমাদের শিক্ষকরা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ বিষয়ে বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছি। আমরা চাই এই জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলাল জানান, ২০১৯ সালে জয়নুল ওই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। এর আগে সেখানে কোন মাদরাসা ছিলো না। তবে সে কাগজপত্র ও অন্য মাদরাসার নাম জালিয়াতি করেছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে পামুলী নগরডাঙ্গা নামে আমাদের এলাকায় কোন স্থান বা জায়গার নাম নেই।

বোদা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, ওই মাদরাসার কাগজ নিয়ে জয়নুলই বেশি দৌড়ঝাপ করছেন। শুনেছি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অনেক টাকাও নিয়েছেন। ওই মাদরাসার অনুকুলে যে সকল কাগজপত্র দিয়েছে তারা তার মধ্যে অনেক গড়মিল পেয়েছি আমরা। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রামানিক জানান, শুরুতে পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাতকাজলদিঘী ইউনিয়নে গড়ে তোলা ডুবানুচি বরকতিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা ও শুরিভিটা হাসনায়নীয়া নজিরিয়া দাখিল মাদরাসা নামে দুটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার কাগজপত্র নিয়ে আসে জয়নুল নিজেই। নিজেকে সাংবাদিক বলেও পরিচয় দেন। অভিযোগ উঠার পর আমি নিজে সরেজমিনে মাদরাসাগুলো পরিদর্শন করি এবং কাগজপত্র যাচাই করি। সে ১৯৬৬ সালের যে দলিল দিয়েছে সেই নাম্বারে কোন বালাম খুঁজে পাইনি। সম্ভবত দলিলটি জাল। এছাড়া তার প্রতিটি কাগজেই স্বাক্ষরগুলো নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিষয়টি মাদরাসা বোর্ড তদন্ত করে দেখলেই সত্যটা বেরিয়ে আসবে। এছাড়া আমরা ওই দুটি প্রসিদ্ধ মাদরাসার নাম নকল করে গড়ে তুলেছে বলে প্রমাণ পেয়েছি। আগে কেন জয়নুলের মাদরাসার পক্ষে মিথ্যা বা ভুল রিপোর্ট দিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান ভুলে এমনটি হয়েছে।

পঞ্চগড় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আকতার জানান, জয়নুল নামে এক সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরেই ওই মাদরাসাগুলো নিয়ে অফিসে আসা যাওয়া করতো। প্রণোদনার টাকা দেয়ার জন্য বার বার অফিসে এসেছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে তালিকা ছাড়া কাউকে প্রণোদনা দিতে পারবো না বলে জানিয়ে দেই। পরে কিভাবে যেন সে প্রণোদনার টাকাও তুলে নিয়েছেন।

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোলেমান আলী জানান, নাম ও কাগজপত্র জালিয়াতি করে নতুন করে মাদরাসা গড়ে তোলার একটি অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে বোদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদ আল হাসানকে প্রধান তিন সদস্য বিশিষ্ট্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আজাদ জাহান জানান, ওই তিন মাদরাসার বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। আমরা অভিযোগের কিছু প্রমাণও পেয়েছি। এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে নতুন করে তালিকা পাঠানো হবে।

জালিয়াতির মূল হোতা জয়নুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অর্ধকোটি টাকা আদায়ের বিষয়টি সঠিক নয়। শিক্ষকরা আমাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে যা টাকা লাগে তারা বহন করে। আমি কাজে সহযোগিতা করি। তিনি আরও জানান, শুধু আমার তিনটি মাদরাসার কাজ নয়, আমি জেলার সকল মাদরাসার কাজ আমিই করি। শিক্ষকরা আমার কাছ থেকে সব করিয়ে নেয়। দলিল, কাগজপত্র ও স্বাক্ষর জালের বিষয়ে জয়নুল জানান, আমি দলিল, কাগজপত্র ও স্বাক্ষর যাই জাল করি না কেন, আপনাদের তাতে কি, কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তো তা প্রমাণ করতে পারেনি।

বার্তা বাজার / ডি.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর