পঞ্চগড়ে এবার ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে বেড়েছে করতোয়া নদীর ভাঙন। ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বেংহাড়ি বনগ্রাম ইউনিয়নের সোনাচান্দি, সরকারপাড়া, বন্দরমনি, নিচার ঘাট, আরাজি শিকারপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়। ওই এলাকায় প্রধান রাস্তাটির অধিকাংশই এখন করতোয়ায় বিলীন হয়ে গেছে।
এছাড়া বিদ্যালয়, মসজিদ ও ফসলি জমিসহ সহ শতাধিক ঘরবাড়ি রয়েছে ঝুঁকিতে। গত বছর নামমাত্র জিওব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর জন্য চেষ্টা করা হলেও কাজে অনিয়মের হওয়ায় তা কোন কাজেই আসেনি। এবার ভাঙন আরও বেড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পঞ্চগড় থেকে ফুলতলা হয়ে সোনাচান্দি নিচারঘাট রাস্তাটির অধিকাংশই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও হেঁটে যাওয়ার মতো রাস্তা অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র। কাঁচা রাস্তাটির অনেক স্থানেই বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
ভাঙন শুরু হয়েছে আরাজি শিকারপুর সরকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে। করতোয়ার ভাঙন ওই বিদ্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত চলে এসেছে। এছাড়া পূর্বদিকে বন্দরমনি পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে চলছে করতোয়ার তান্ডব।
অনেক ফসলি জমি, কবরস্থান তেজপাতা ও আমের বাগানের অংশ ভেঙে ভেঙে নদীতে বিলীন হচ্ছে। ভাঙন ক্রমাগত গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। দুটি বিদ্যালয়, দুটি মসজিদ, কবরস্থান, ফসলি জমি, বাগানসহ সহ শতাধিক ঘরবাড়ি এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয়রা।
তারা জানান, রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় ভারি যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। কেউ অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের। কৃষি পণ্য বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যেতেও তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। করতোয়ার ভাঙনের শঙ্কায় এখন দিনরাত কাটছে ওই এলাকার বাসিন্দাদের। ভাঙন তীব্র হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোন নজরদারি নেই সেখানে।
এছাড়া পঞ্চগড়ের নদ নদীর ভাঙনের বিষয়টি অন্য এলাকার তুলনায় কম গুরুত্ব পায় বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। গত অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ওই স্থানের ভাঙন ঠেকাতে প্রায় ৩০ লাখ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু জিওব্যাগ দিয়ে কোনমতে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করে দেয় ঠিকাদার। নিচ থেকে উপরের দিকে পর পর চার পাঁচটি জিওব্যাগ ফেলে দিয়েই কাজের ইতি টানা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের পকেট ভরলেও ভাঙন ঠেকাতে তা কোন কাজেই আসেনি।
সরকারপাড়া এলাকার বৃদ্ধ আসর আলী বলেন, রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় সাইকেল নিয়ে যেতেও ভয় লাগে। প্রতিবছরই নদীটি ভেঙে ভেঙে গ্রামের দিকে আসছে। জনপ্রতিনিধিরা সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধ দেয়ার আশ্বাস দেয় কিন্তু বাস্তবায়ন হয়না। এখানে শক্ত বাঁধ না দেয়া গেলে আমাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ ও বিদ্যালয় সব নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
ওই এলাকার আব্দুর রশিদ বলেন, কেউ যদি অসুস্থ্য হয় তাকে যে জরুরিভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাবো এখন সে উপায় নেই। কৃষি পণ্য নিয়ে হাট বাজারে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গ্রামের প্রধান রাস্তাটির অর্ধেকের বেশি ভেঙে গেছে। এখন ফসলি জমি, মসজিদ, বিদ্যালয়, কবরস্থানসহ আমাদের বসতবাড়ি ভাঙন চলে এসেছে। কখন ঘরবাড়িসহ সব ভেঙে যাবে এই নিয়ে সব সময় শঙ্কায় থাকি।
নিচারঘাট এলাকার আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, গত বছর নদীর ভাঙন ঠেকাতে নামমাত্র কিছু জিওব্যাগ ফেলা হয়েছিল। শুনেছি বরাদ্দ ছিলো প্রায় ৩০ লাখ টাকা। ওই জিওব্যাগ কোন কাজেই আসেনি। ওই স্থানগুলোতে ভাঙন আরও বেড়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন নজরদারি নেই। ভাঙন ঠেকাতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, করতোয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা ওই স্থানগুলো চিহ্নিত করে বাঁধের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছি। প্রকল্প পাশ হলেই সেই অনুযায়ী ওই স্থানে বাঁধের কাজ হবে। তারপরও আমরা পরিদর্শন করে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।
বার্তাবাজার/এমকে