কিছুদিন আগে শান্ত থাকলেও এখন ক্রমশ বেড়েই চলেছে ভূমধ্যসাগরীয় উত্তেজনা। লিবিয়া ইস্যুতে মার্কিন ও রাশিয়ার সাথে তুরস্কের দৌড়ঝাঁপের কারণে লিবিয়ার বিতর্কিত সির্তা-জুফরা সমুদ্রাঞ্চলে উত্তেজনা কিছুটা কমেছিল। সম্প্রতি লেবাননে বিস্ফোরণ ও গ্রিসের উপকূলীয় অঞ্চলে তুরস্ক খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করার উপর ফ্রান্স নতুন করে পদক্ষেপ নেয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে চলমান রাজনৈতিক সংকটের আগুনে যেন তেল ঢেলে দেয়া হলো।
গত বছর লিবিয়ার সাথে তুরস্ক যে চুক্তি করেছিল সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়ে গত ৬ আগস্ট গ্রিস ও মিশর এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জুন (ইইজেড) নামে একটি নতুন চুক্তি সাক্ষর করে। চুক্তিমত লিবিয়ার সিরতে-জুফরার সমুদ্র উপকূলে খনিজ সম্পদের উপর আধিপত্য বিস্টার করবে গ্রিস ও মিশর। তবে মিশরের জলসীমায় এই চুক্তি অকার্যকর, কারণ এটি মিশরের জলসীমার বাইরের অঞ্চল।
চলমান অবস্থায় ওই অঞ্চলে একটি অনুসন্ধানী জাহাজ পাঠিয়ে খনিজ সম্পদ খোঁজাও শুরু করে দিয়েছে তুরস্ক। তবে তাদেরকে রুখে দিতে পূর্ণ শক্তি নিয়ে অপেক্ষা করছে গ্রিস, মিশর ও অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স। জাতিসংঘ সমর্থিত লিবিয়া সরকার সাথে তুরস্কের করা এই চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিয়েছে দেশটির সৌদি-মার্কিন সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হাফতার বাহিনী। এমতাবস্থায় পরিস্থিতির জল ক্রমশ ঘোলা হচ্ছে। অনিশ্চিত এক সংকটের সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
সম্পাদিত চুক্তির বিষয়ে গ্রিসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোস ডেনডিয়াস তার বক্তব্যে বলেন, আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, ইইজেড চুক্তি শুধুমাত্র তুরস্ককে রুখে দিতেই সাক্ষর করা হয়েছে।
আবার, লিবিয়া ও তুরস্কের অধিকার ক্ষুণ্ন করার জন্য গ্রিস ও মিশর এই চুক্তি করেছে। কারণ তারা খুব ভাল করে জানে, মিশর ও গ্রিসের মাঝে কোনো জলসীমা নেই। যার ফলে তাদের করা ইইজেড চুক্তি কোনোও কার্যকরিতা পাবে না। একইসাথে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এই চুক্তি পুরোপুরিই মাটির পুতুলের মত অকার্যকর থাকবে। তুরস্ক তাদের সুবিধাজনক এলাকায় কাউকে কখনও কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিবে না। তাদের উপকূলে সংখ্যালঘু সাইপ্রিটসদের নিয়েও কাজ করা শুরু করবে। তুরস্কের এমন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিতায় ফেলে রাখবে গ্রিসকে।
এদিকে মিশর ও গ্রিসের মধ্যে এমন চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট দাবী করেন, ‘আলোচনা ছাড়া এই সংকট নিরসণের কোনো উপায় নেই।’ এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ বোরেল ও জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান অ্যাঙ্গেলা মর্কেল তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যকার উত্তাপ কমাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেইসাথে চেষ্টা করতে কার্পণ্য করছেনা তুরস্ক ও ইইউ’র সম্পর্ক ঠিক রাখতে।
উল্লেখ্য যে, এঙ্গেলা মর্কেলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লিবিয়ার সাথে সাক্ষরিত চুক্তিমত কাজ বন্ধ করতেও রাজি হয়েছিল তুরস্ক। একইসাথে প্রেসিডেন্ট এরদোগান দু’পক্ষের আলোচনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজও করেছিলেন। কিন্তু মাঝখানে এসে ফ্যাকড়া বাঁধায় ফ্রান্স। গ্রিসের সাথে বর্তমান সহঅবস্থান নিয়ে তাদের একাত্মতার কারণে বোরেল ও মর্কেলকে থামতে হয় এই পর্যন্ত এসেই।
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকস মিটসোটাকিস ধরেই নিয়েছিলেন, ফ্রান্সের মাধ্যমে তিনি আলোচিত অঞ্চলে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে পারবেন। দেশের ভেতরেও সামরিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে নিজেদেরকেও আরও সুগঠিত করতে পারবেন। সেই পরিকল্পনা নিয়েই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন ‘বাকযুদ্ধ’। তবে তার এই হেয়ালিপানায় তার জন্য সামনের দিনগুলোতে কত বড় জটিলতা অপেক্ষমান তা কারো ভাবনায় নেই। গ্রিসের সমর্থনে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছে ফ্রান্স। তবে তাদের রুখে দিতে তুরস্ক যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তাতে অবস্থা আরও কঠিন থেকে কঠিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে তৃতীয় পক্ষ হিসাবে ফ্রান্স এসে জড়িয়ে পড়ছে তুরস্কের সাথে অনাকাঙ্খিত এই দ্বন্ধে। ফ্রান্সের এমন আচরণে মর্কেলও তাদেরকে নিবৃত করতে গিয়ে সুবিধা করে উঠতে পারছে না।
আবার দেখা যায়, রাশিয়া ও তুরস্ককে নিয়েও পরিকল্পনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। লেবাননের বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর তিনি সেখানে গিয়ে হস্তক্ষপের জন্য তুরস্ককে উস্কানি দেওয়ার কাজও সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মূলত সিরিয়া ও কুর্দিদের নিয়ে ফ্যাসাদে থাকা তুরস্ককে সবদিক থেকে বিপদে ফেলার একটা পরিকল্পনা। অথচ লেবাননে গিয়ে তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘ফ্রান্স লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। তবে আমাদের এখানে কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যদি আমাদের দায়িত্ব পালন না করি তবে অন্যরা সুযোগ নিতে পারে।’ এখানে ‘অন্যরা’ বলতে তিনি পাশের দেশ ইরান, সৌদি ও তুরস্ককেই বুঝিয়েছেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ফ্রান্স গাঁয়ে পড়ে লেবানন ও আরব বিশ্বে ধ্বংসের রাজনীতি করে যাচ্ছে। লেবাননকে নিজেদের দলে ভিড়াতে ও সারা বিশ্বে নিজেদেরকে দৃষ্টিগোচর করতেই প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এমন কাজ করে বেড়াচ্ছেন। এখানে আসলে ম্যাক্রোঁ বৈরুতে লেবাননের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো কোনো বিষয় না। গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে তুরস্কের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের অবনতি হতে যাওয়া। সে নিজে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে এমন ঘটনা দুশ্চিন্তার জন্ম দিবে বৈকি!
এদিকে জার্মানির মর্কেল বুঝতে পেরেছেন এরদোগানও এই খেলা বুঝার মত দক্ষ খেলোয়ার। তাই তিনি জেনেশুনে এই গর্তে পাঁ দিবেন না। তিনি মর্কেলকে ভরসা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, বিশ্বাস রাখলে আগামী এক মাসের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক ঠিক করার সব আলোচনা বন্ধ করে দেয়া হবে। তবুও মর্কেল সাড়া দেননি এরদোগানের আহ্বানে।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, তুরস্ক ও গ্রিস উপকূলীয় অঞ্চলে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য যে যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছে তা কখনই লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত ইঞ্জিন ঘুরাবে না। কারণ ফ্রান্স ও গ্রিসের হুমকিতে এরদোগানের ভড়কে যাওয়ারও বিশেষ কোনো কারণ নেই। ইউ বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে। কারণ, মার্কিনি ও রাশিয়ানদের এইখানে কোনো বিশেষ স্বার্থ না থাকায় তারা তুরস্কের বিপক্ষে লড়াই করতে রাজি না হতেও পারে।
আবার উত্তেজনার পারদ যতই উপরের দিকে উঠছে ততই আলোচনা করে সমঝোতায় আসার সম্ভাবণা কমে আসছে। আলোচনায় যদি আবারও কোনো ঢিঁলেমি করা হয় তবে সবাই বড় ধরণের বিপদের মুখোমুখি হবে। ওসমানী খেলাফতের অনুসারী তুরস্ক সামরিক ও কূটনৈতিক দিক দিয়ে সমানভাবে দক্ষ খেলোয়ার। তাদেরকে দমন করাটা একেবারে সহজ হবে না। সূত্র- ডেইলী সাবাহ।
লেখক- বুরহাতেশান দুরান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, তুরস্ক।