এই মানচিত্রগুলো দেখেন।

প্রথমটা হচ্ছে বর্তমানে আমরা সিরিয়া এবং লেবানন বলতে যে দেশগুলোকে চিনি, অটোমান আমলে সেগুলোর প্রশাসনিক সীমারেখা। শতশত বছর ধরে চলে আসা এই সীমারেখা অধিকাংশক্ষেত্রেই ছিল ন্যাচারাল।

এবার দ্বিতীয় মানচিত্রটা দেখেন। এটা হচ্ছে সাইক্স-পিকো অ্যাগ্রিমেন্টের ফলে উদ্ভূত মানচিত্র, যখন ব্রিটেন এবং ফ্রান্স কোনো ধরনের বাস্তবতা বিবেচনা না করে, অফিসের টেবিলে বসে এই এলাকাগুলোর মানচিত্রের উপর স্কেল এবং পেন্সিল দিয়ে দাগ টেনে এলাকাগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে।
সাইক্স-পিকো চুক্তি করার সময় এলাকাগুলোর প্রাকৃতিক বা ঐতিহাসিক বিভাজন কিংবা ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত বা গোত্রগত বৈশিষ্ট্যের কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণই ছিল এ চুক্তির একমাত্র লক্ষ্য।
চুক্তি অনুযায়ী মূল দাগের উত্তরে অবস্থিত আধুনিক সিরিয়া এবং লেবাননের নিয়ন্ত্রণ পায় ফ্রান্স, যেখানে আগে থেকেই তাদের বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। অন্যদিকে মূল দাগের দক্ষিণে বর্তমান ইরাক, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল ও জর্ডানের নিয়ন্ত্রণ পায় ব্রিটেন, যা ইরাকের তেলক্ষেত্রগুলোর জন্য তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এবার তৃতীয় মানচিত্রটা দেখেন। এটা হচ্ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স তাদের “ম্যান্ডেটে” থাকা সিরিয়া এবং লেবাননকে কীভাবে আরো পাঁচটা ভাগে ভাগ করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাঁচটা রাষ্ট্র তৈরি করার পরিকল্পনা করেছিল, তার মানচিত্র।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে লীগ অব নেশন্স তথা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বিজিত জার্মান এবং অটোমান এলাকাগুলোর জন্য ম্যান্ডেট শাসন পদ্ধতি অনুমোদন করে। দীর্ঘকাল জার্মান এবং অটোমান শাসনে থাকা অঞ্চলগুলোর জনগণ নিজেদেরকে শাসন করার জন্য প্রস্তুত না, এরকম অজুহাতে ম্যান্ডেট পদ্ধতির অধীনে তাদেরকে শাসনের এবং ধীরে ধীরে তাদেরকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় বিজয়ী রাষ্ট্রগুলোর হাতে।
আধুনিক সিরিয়া, লেবানন এবং তুরস্কের কিছু অংশের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় ফ্রান্সের উপর, যার নাম হয় ম্যান্ডেট ফর সিরিয়া অ্যান্ড দ্য লেবানন। তবে নামে ম্যান্ডেট হলেও বাস্তবে সিরিয়াতে ফ্রান্সের শাসন ছিল ঔপনিবেশিক শাসন। সিরিয়ানদেরকে স্বাধীনতা দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ফ্রান্সের ছিল না।
ম্যান্ডেটের শুরু থেকে পরবর্তী দুই যুগ পর্যন্ত তারা সিরিয়ার মানচিত্রকে ইচ্ছেমতো কাঁটাছেঁড়া করে, সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকার ডেমোগ্রাফি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে, সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে দমন করার জন্য বিভিন্ন সংখ্যালঘুদেরকে অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং প্রতি কয়েক বছর পরপর বোমা বর্ষণের মাধ্যমে নির্মমভাবে সিরিয়ান স্বাধীনতাকামীদের বিদ্রোহ দমন করে।
প্রথমেই ফরাসিরা লেবানন পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত বৈরুত ভিলায়েতের খ্রিস্টান প্রধান সানজাকগুলো (প্রশাসনিক এলাকা) নিয়ে বৃহত্তর লেবানন নামে একটি অনুগত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বৈরুত ভিলায়েত ছিল আয়তনে খুবই ছোট। ফলে ফরাসিরা দামেস্ক ভিলায়েতের অংশবিশেষকে পৃথক করে বৈরুতের সাথে জুড়ে দিয়ে প্রস্তাবিত লেবানন রাষ্ট্রটির আয়তন প্রায় দ্বিগুণ করে দেয়। কিন্তু এতে লেবাননের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। কারণ নতুন সংযুক্ত এলাকার জনসংখ্যার অধিকাংশই ছিল মুসলমান, যারা ভৌগলিক, ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে দামেস্কের সাথেই বেশি সংযুক্ত ছিল।
১৯২১ সালে ফরাসিরা উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সুন্নিপ্রধান আলেক্সান্দ্রেত্তাকে তুরস্কের হাতে তুলে দেয়। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী লাতাকিয়া বন্দরের আশেপাশের আলাউই সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ১৯২২ সালে তারা একটি আলাউই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
একই সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত দ্রুজ পর্বতের আশেপাশের এলাকা নিয়ে তারা একটি দ্রুজ প্রধান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এমনকি অবশিষ্ট সিরিয়াকেও তারা দামেস্ক এবং আলেপ্পোর মাঝামাঝি বরাবর ভাগ করার চেষ্টা করে এবং সেগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত নাম দিয়ে সেখানে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
বলাই বাহুল্য, এর কোনোটাই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল না। ফলে তাদের সবগুলো উদ্যোগই ব্যর্থ হয়। তারা পুনরায় সমগ্র সিরিয়াকে একত্রিত করে, কিন্তু সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিকভাবে সিরিয়াকে বিভাজিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। তাদের প্রস্তাবিত পাঁচটি রাষ্ট্রের মধ্যে শেষপর্যন্ত কেবল লেবাননই টিকে যায়। অথবা বলা যায় তারা জোর করে সেটাকেই টিকিয়ে রাখে, যেহেতু সেখানে খ্রিস্টানদের সংখ্যা ছিল অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। সেই লেবাননের আজ যখন এই শোচনীয় অবস্থা, তখন তার রাজনীতিবিদদেরকে তাদের অযোগ্যতা-ব্যর্থতার জন্য যত খুশি দোষারোপ করা হোক, সমস্যা নাই, কিন্তু সব সময়ই মনে রাখতে হবে, এই সমস্যার উৎস হচ্ছে ফ্রান্স।
সুতরাং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট যখন লেবাননে গিয়ে কিংবদন্তী শিল্পী ফাইরুজের গানের কলি “বাহেব্বাক ইয়া লুবনান” (তোমাকে ভালোবাসি হে লেবানন) উচ্চারণ করে, তখন ইতিহাস না জানলে সেটাকে অত্যন্ত চমৎকার লাগতে পারে, কিন্তু খুব গভীরে না গিয়ে হালকা একটু ইতিহাস উল্টে গেলেও এই অতিভক্তিকে চোরের লক্ষণ বলে সন্দেহ করতে ইচ্ছা করে।
লেখকঃ মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা