নান্দাইলে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন চেয়ারম্যানের নিজের গ্রামে স্থানান্তর কার স্বার্থে?

ময়মনসিংহের নান্দাইলে ৬০ বছরের পুরাতন ইউনিয়ন পরিষদ ভবনকে কৌশলে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে প্রত্যন্ত এলাকায় নতুন কমপ্লেক্স ভবন নির্মানের তোরজোর করার অভিযোগ উঠেছে গাংগাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ আশরাফুজ্জাম খোকনের নামে।

তবে ইউনিয়নের বিয়ারা গ্রামেই পরিষদ ভবন কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন একই গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের জমিদাতা মরহুম আব্দুল গণি আহমেদ ওরফে জজের বাপের ছেলে ও এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, বর্তমান চেয়ারম্যান নিজের ইচ্ছায় তার নিজের গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা করছে।

জানা যায়, ১৯৬১ সালে সাবেক চেয়ারম্যান জজের বাপ বিয়ারা গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মানের জন্য জমি দান করেছিলেন। সেই জমির উপর এলাকাবাসীর শ্রম ও সরকারি সহায়তায় গড়ে উঠেছিল ইউনিয়ন পরিষদ ভবন। দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছরে অনেক চেয়ারম্যান এই ভবনেই সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

ধানী জমিতে নতুন ভবন স্থাপনের জন্য বরাদ্দকৃত স্থান। ছবি: বার্তা বাজার।

একইসাথে বর্তমান চেয়ারম্যান, যিনি এর আগে একাধারে ২ বার এই ভবনে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে এসেছেন তিনি তৃতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর মত পাল্টে তার গ্রামে (সুরাশ্রম) ইউনিয়ন পরিষদ ভবন স্থাপন করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন বিয়ারা ও ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষ আগের জায়গাতেই পরিষদ ভবন রাখার দাবী জানান। এই দাবীতে শত শত মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে মানববন্ধনও করেছেন।

কারণ হিসাবে তারা জানান, বর্তমান ভবনের সাথে অত্র অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক ভাল। পাশের নান্দাইল রোড বাজারেই ব্যাংক, রেলওয়ে স্টেশন, হাইস্কুল রয়েছে ও সড়কপথে দুরের পথে ভ্রমণ করা সহজ। আশেপাশে অনেকগুলো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। একইসাথে উপজেলা সদরের সাথেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমান চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান খোকনের গ্রাম সুরাশ্রম ইউনিয়নের এক পাশে অবস্থিত। তার খুব কাছেই নেত্রকোনো জেলার সীমানা। যোগাযোগ ব্যবস্থাও খুব নাজুক। একবার প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছিল, বিয়ারা গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের জন্য যে জায়গা রয়েছে তার পর্যাপ্ত না৷

এমন মন্তব্যের পরে মরহুম জজের বাপের সন্তানেরা আরও জমি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের জন্য দান করে। যার ফলে মোট জমির পরিমাণ দাড়ায় .৪১ শতাংশ। এরইমধ্যে আশরাফুজ্জামান খোকন কাউকে না জানিয়ে তার বাড়ির কাছে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ইউনিয়ন পরিষদের নামে লিখে দিয়েছেন সেইখানেই নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে বলে জানা যায়।

নান্দাইলের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহিম সুজন এ ব্যপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কছে সুপারিশও করেছেন, যেন সুরাশ্রম গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স হয়।

তবে ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য বজলুর রহমান দাবী করেন, ইউএ্নও সুজন কারো সাথে কোনো কথা বলেননি। উনি চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান খোকনের সম্পর্কে আত্মীয় হয়। স্বজনপ্রীতি করে মনগড়া প্রতিবেদন জানিয়েছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক উপরিচালক হারুন অর রশিদ বিয়ারা গ্রামে অবস্থিত জায়গা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি আরও জানান, বিয়ারা গ্রামে গাংগাইল ইউনিয়ন পরিষদ এটা সবাই জানে। ৬০ বছর ধরে এখানেই ইউনিয়নের সকল কাজ চলে আসছে। বিয়ারা গ্রামে পরিষদ ভবন থাকলে সমগ্র ইউনিয়নের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ সহজেই যেকোনো কাজে যাতায়াত করতে পারবে। সংখ্যা লঘিষ্ঠ লোকের জন্য সুরাশ্রম গ্রামে চেয়ারম্যানের নিজের জমিতে ইউনিয়নের ভবন নির্মান জনগনের নাকি উনার নিজের স্বার্থে তা আমার বোধগম্য নয়।

সাবেক চেয়ারম্যান ও জমিদাতা জজের বাপের ছেলে মুখলেছুর রহমান জানান, আমার বাবাসহ এলাকার অনেক মানুষ মাথায় করে ইট এনে এই ভবন নির্মান করেছিলেন। এখানে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন রাখার জন্য বর্তমান চেয়ারম্যানের কাছে আমি ইউনিয়নের ২৬ হাজারেও বেশি মানুষের স্বার্থে দাবিও জানিয়েছিলাম ব্যক্তিগতভাবে৷ কিন্তু তিনি আমার কথা রাখেননি। প্রায় প্রতিদিন এলাকার অনেক মানুষ বিয়ারা গ্রামের এই ভবনের সামনে জড়ো হয়ে ফেলফেল করে তাকিয়ে থাকে পরিত্যাক্ত ঘোষিত ভবনের দিকে।

তিনি আরও জানান, আমাদের এলাকার এমপি আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিনের কাছে বিষয়টা জানানোর পর উনি বলেছিলনে বিয়ারা গ্রামে পর্যাপ্ত জমির ব্যবস্থা করা হলে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এখানেই রাখা হবে। কিন্তু তিনিও এখন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

এ বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহ-৯ আসনের সাংসদ আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিনের নাম্বারে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।

বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আশরাফুজ্জামান খোকনের সাথে বার্তাবাজারের প্রতিনিধি মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে চাইলে তিনি ‘উল্টাপাল্টা লেখালেখি হতে পারে’ এমন অযুহাত দিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলতে রাজি হননি।

বার্তাবাজার/এমকে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর