গত ২৯ জুলাই ভোরে রাজধানীর পল্লবী থানার ভিতরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আর এ ঘটনার নেপথ্যে কাজ করে মিরপুর জোনের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা।
পোশাক কারখানার চাঁদাবাজির একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের জন্য পল্লবী থানা যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাকে হত্যা পরিকল্পনার নাটক সাজাতে গিয়েই থানার ভেতরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পল্লবী থানা পুলিশের কাছ থেকে মামলার তদন্তভার ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) কাছে গেছে। সিটিটিসির এসএজির উপকমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, পল্লবী থানায় বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত করা হচ্ছে। এ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু বলা যাবে না।
পল্লবী থানার ভেতরে বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্ত চলাকালেই গত শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মোহা. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহম্মেদ, পল্লবী জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মিজানুর রহমান ও সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. ফিরোজ কাওছারকে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া পল্লবী থানার একাধিক কর্মকর্তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশের তদন্তে বিস্ফোরণের ঘটনাটি সাজানো হওয়ায় জড়িত কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মো. ওয়ালিদ হোসেন বলেন, মিরপুর বিভাগের পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলির সঙ্গে পল্লবী থানার বিস্ফোরণের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি পুলিশের রুটিন বদলি।
তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলার পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। ওই কমিটির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বোঝা যাবে বিস্ফোরণ ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুর বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম বাপ্পী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিরণ একাধিকবার সভা করেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঊর্ধ্বতন ওই পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশনায় পল্লবী থানা ও রূপনগর থানা পুলিশের সহায়তায় জুয়েল রানার তিন অনুসারী রফিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও মোশাররফ হোসেন আলাদা আলাদা জায়গা থেকে আটক করে।
পরবর্তী সময়ে বৃহস্পতিবার রাতে আটক হওয়া এ তিন ব্যক্তিকে পুলিশের গাড়িতে তুলে কালশী কবরস্থানের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই গাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ওয়েট মেশিন নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাইজুল ইসলাম বাপ্পী, তার সহযোগী হিরন ও আলমগীর। এ সময় তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি ও ওয়েট মেশিনের ব্যাগ পুলিশের হাতে আটক হওয়া তিন ব্যক্তির কাছে জোর করে দেওয়া হয়।
তারপর রাতে থানায় নিয়ে অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে মর্মে সিজার লিস্ট তৈরি করতে থাকেন থানার একজন এসআই। এরই মধ্যে সিটিটিসির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে ওই বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার জন্য ডাকা হলে তারা বালু ও মাটি দেখে ফিরে যান। বিস্ফোরকের জায়গায় বালু ও মাটি দেখে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বাপ্পীকে তাজা জিনিস দিতে বলেন।
এরপর বাপ্পীর লোকজন থানায় গিয়ে ওয়েট মেশিনের মধ্যে চারটি ককটেল ঢুকিয়ে দিয়ে আসেন। কিন্তু বিষয়টি ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া থানার অন্য কেউ জানতেন না। সকালের দিকে সিজার লিস্ট তৈরির পর সিজার লিস্ট প্রস্তুতকারী এসআই বালু-মাটিভর্তি ওয়েট মেশিন মনে করে মেশিনটি ফ্লোরে ফেলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে চার পুলিশ কর্মকর্তাসহ পাঁচজন আহত হন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আহত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে একজনের চোখ নষ্ট হওয়ার পথে। আরেকজনের হাত কেটে ফেলতে হবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, থানার ভেতরে বিস্ফোরণের ঘটনার পরপরই জঙ্গি হামলা বলে মনে করেছিলেন অনেকেই। বিস্ফোরণের প্রায় ১২ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের হামলার দায় স্বীকার করলে বিষয়টিতে ভিন্নমাত্রা যুক্ত হয়। ফলে বাধ্য হয়ে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় ডিএমপির সিটিটিসির তদন্তকারী দলকে।
সিটিটিসি তদন্তে নেমে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য পায়নি। সিটিটিসির এসএজির উপকমিশনার আবদুল মান্নান জানিয়েছিলেন, পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে কোনো জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিস্ফোরণের দিন সাংবাদিকদের কাছে একই কথা বলেছিলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বিস্ফোরণ ঘটনার আগে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানার ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তার মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে জুয়েল রানার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও চুরির অভিযোগ তুলে পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. আল ফরহাদ মোল্লা। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ‘যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাকে মাস্ক পরতে বলায় তিনি তার (ট্রাফিক সার্জেন্ট) ওপর হামলা চালান এবং শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা কেড়ে নেন। জুয়েল নিজের পকেট থেকে পিস্তল বের করেও সার্জেন্টের দিকে তেড়ে আসেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জুয়েলকে হত্যার টার্গেটের পেছনে এ ঘটনাটিও সাজিয়েছিল ঊর্ধ্বতন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। বিনিময়ে বাপ্পীর কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকা গ্রহণের চুক্তি হয়েছিল। বাপ্পীর সরবরাহ করা অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক জুয়েল রানার অনুসারীদের কাছ থেকে উদ্ধার দেখিয়ে মামলার পর আসামিদের নিয়ে জুয়েল রানাকে ধরার টার্গেট ছিল। কিন্তু কাকতালীয়ভাব সিজার লিস্ট তৈরিকারী এসআইয়ের অজ্ঞাতবশত থানার ভেতরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে ঊর্ধ্বতন সেই পুলিশ কর্মকর্তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
বিস্ফোরণ ঘটনায় মামলার তদন্তের পাশাপাশি পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও কাজ করছে। ইতিমধ্যে পুলিশের সহযোগিতায় কাউন্সিলর বাপ্পী ও তার সহযোগীদের এমন পরিকল্পনার তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জেনে গেছেন। যার কারণে বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার আগেই মিরপুর বিভাগের পুলিশের পুরো সেটআপ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মিরপুরের একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী জানান, পল্লবী থানা পুলিশ জুয়েল রানার অনুসারী যে তিন ব্যক্তি রফিকুল, শহিদুল ও মোশাররফকে ধরেছে তারা অন্তত এ বিস্ফোরণ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। এমনকি জুয়েল রানাকে ভিকটিম বানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও বিস্ফোরণ ঘটনার পর তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর অন্তত আটজন ক্যাডার এখন পলাতক।
মিরপুর এলাকা ছেড়ে ঢাকার বাইরে আত্মগোপন করে রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই এ বিস্ফোরণ রহস্যের উদঘাটন হবে। বাপ্পীর সঙ্গে হিরন নামে যিনি থাকেন, তিনি মূলত একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বর্তমানে মিরপুরের বাসিন্দা যুবলীগের সাবেক মহানগর ও বর্তমানের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। জুয়েল রানাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা ওই শীর্ষ নেতাও জানেন বলে তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পল্লবী থানা পুলিশের হাতে আটক হওয়া তিনজনকে বিস্ফোরণ ঘটনার অনেক আগেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রথমে কয়েক দিন রূপনগর থানায় রাখা হয়। পরে পল্লবী থানা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর কালশী কবরস্থানে নিয়ে তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরকভর্তি ওয়েট মেশিন জোর করে দেওয়া হয়। কালশী কবরস্থানের আশপাশে তখন লাইট জ¦লছিল, সিসিটিভি ফুটেজেও বিষয়টি ধরা পড়েছে। অস্ত্র ও গুলি ঠিকমতো সরবরাহ করা হলেও ওয়েট মেশিনের ভেতরে বিস্ফোরকের বদলে ছিল বালু ও মাটি।
ফলে বিস্ফোরক পরীক্ষার জন্য সিটিটিসির বম্ব টিমকে ডেকে পাঠানো হলেও তারা বালু ও মাটি দেখে ফিরে যান। পরবর্তীকালে ঊর্ধ্বতন সেই কর্মকর্তার নির্দেশে ‘তাজা জিনিস’ সরবরাহের নির্দেশ পেয়ে বাপ্পীর লোকজন তাজা বিস্ফোরক সরবরাহ করে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তা জানলেও জানতেন না থানার অন্য কোনো কর্মকর্তা।
বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীদের ওপর দায় চাপানোর কৌশল ছিল : বিদেশে পলাতক জামিল ও মামুন এই ঘটনার কিছুই জানে না। জুয়েলকে হত্যার পর তাদের ওপর দায় চাপানোর পরিকল্পনা ছিল পুলিশের। কিন্তু থানার ভেতরে কাকতালীয় বিস্ফোরণের ঘটনায় ডিসির সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেস্তে যায়।
কেন জুয়েল রানাকে মারতে চায় : গত নির্বাচনেও কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন জুয়েল রানা। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় অনেকের সঙ্গে যোগাযোগও ভালো। ভবিষ্যতে যেকোনো সময়ে তিনি প্রার্থিতার জন্য চেষ্টা করলে পেয়ে যেতে পারেন এমন শঙ্কা দূর করতেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকেন বর্তমান কাউন্সিলর বাপ্পী। এছাড়া থানা যুবলীগের রাজনীতিতে জুয়েলের জনপ্রিয়তার কারণে বাপ্পীর আধিপত্যও কমতে শুরু করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নান্নু কমিশনারের সঙ্গে দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জুয়েল রানা। দুবারই হেরে যান। বর্তমানে তিনি পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। কেন্দ্রীয় যুবলীগের সভাপতি হিসেবে ওমর ফারুকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল।
বর্তমানে স্থানীয় এমপির সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এসব নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে পল্লবী থানার অধিকাংশ এলাকার পোশাক কারখানার নিয়ন্ত্রণ, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে চাঁদাবাজি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন।
তিনি একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী লালনপালন করে থাকেন। যার কারণে কাউন্সিলর বাপ্পীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। জুয়েলের কারণই বাপ্পী একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারছেন না। যে কারণে পুলিশকে ব্যবহার করে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমি ষড়যন্ত্রের শিকার, প্রাণনাশের আতঙ্কে আছি। আশা করছি সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সত্য উদঘাটন করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, আমি সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত নই। ।।সূত্র: দেশ রুপান্তর।।
সূত্র: দেশ রুপান্তর।
কেএস/বার্তাবাজার