হাওরাঞ্চলে করোনা ও বন্যায় ফিকে ঈদ আনন্দ

দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে এবার বৈশ্বিক মহামারী ও দীর্ঘ মেয়াদি বন্যার প্রভাব পড়েছে জনজীবনে।

অনেকেই দীর্ঘ দিনের পরিচিত পেশায় পরিবর্তন এনেছেন নিজেকে টিকিয়ে রাখার আসায়। সুনামগঞ্জ সদর সহ ১১ টি উপজেলায় প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের বসবাস, কয়েক দফা বন্যার পানিতে বীজতলা, গরু,হাঁস, মুরগী, মাছ , ভেসে যাওয়ায় এসবের চরম লোকসানে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষেরা।

আসন্ন ঈদে গো -খাদ্য সংকট থাকায় রিতীমতো পানির দামে বিক্রি করছেন গবাদি পশু। সব সম্বল হারিয়ে বেছে থাকার জন্য অবলম্বন খুজছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা, একেতো করোনা তার উপর বন্যা এ যেন ‘মরার উপর খাড়ার ঘা।

গত জুন মাসের ২৭ তারিখে জেলায় প্রথম দফায় বন্যা হয়। প্রথম দিকে বন্যার পানি নামতে না নামতেই ২য় দফা বন্যার কবলে পরে মানুষ এবং সর্বশেষ জুলাই মাসের ২০ তারিখে আবার ৩য় দফা বন্যা হয়। জেলার মোট ৩৬৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো প্রায় হাজার খানেক বানভাসি রয়েছেন, যাদের অনেকের কাঁচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় ফিরতে পারছেন না নিজেদের বাড়িতে।

জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার এক পোল্ট্রি খামারি মজনু মিয়া জানান, দীর্ঘ মেয়াদি করোনার থাবায় ব্যবসায় ধস নেমেছে এসব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বানের পানি খামারে প্রবেশ করায় ২০০ পোল্ট্রি মুরগী মারা যায়, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৫০ হাজার টাকা।

শহরের ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে চাকুরী করতেন। করোনার অজুহাত দেখিয়ে চাকরিচ্যুত করেছে তাকে, বাধ্য হয়েই এখন ফল বিক্রির পেশায় নেমেছেন। এতো এক ইকবাল এমন হাজার হাজার ইকবাল চাকুরী হারিয়ে পথে পথে ঘুরছেন।

৫ লক্ষ টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে দিরাইয়ের রাজানগর ইউনিয়নে শহীদুল দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্নের মৎস্য চাষ করেছিলেন নিজদের পুকুরে সবি ভেসে গেল বন্যার পানিতে।

জেলায় প্রায় ২২ কোটি টাকার মাছ ও মাছের পোনা বন্যার পানিতে ভেসে গেছে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ মৎস্য বিভাগ।

সবকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানাযায় হাট-বাজার গুলোতে ঈদের কেনাকাটার জন্য মানুষের ভীড় অন্যান্য বছরের ঈদের তুলনায় নাই বললেই চলে। জেলার তাহিরপুর লামাগাও থেকে সুনামগঞ্জে বালুর মাঠে গরু নিয়ে আসা শাহাবুদ্দিন বলেন, গরুর খাবার না থাকায় এবং ভাল দাম পাবার আসায় হালের গরু নিয়ে আসি শহরে, তবে আশানুরূপ তেমন দাম হাকছেন না ক্রেতারা।

সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম জানান, পর পর ৩ বার বন্যায় অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে জানান, এলজিইডির মোট ৪ হাজার ৬৯০ কিলোমিটার গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়ক আছে। তার মধ্যে গত দুই দফা বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছ। সব মিলিয়ে ৯০০ কিলোমিটার রাস্তার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

‘এখনো বেশিরভাগ সড়কে বন্যার পানি থাকায় সম্পূর্ণ ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। পানি নেমে গেলে সঠিকভাবে বলা যাবে আরও কি পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত যে ক্ষতি হয়েছে তা সংস্কারে ৪০০ কোটি টাকার মতো লাগবে। আমরা কৃর্তপক্ষকে সার্বক্ষণিক অবগত করছি। বরাদ্দ পেলে দ্রুত কাজ শুরু করবো।

জেলা প্রশাসক জনাব আব্দুল আহাদ বলেন, এবার পর পর তিন বার বন্যা হওয়ায় গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ আশ্রয় কেন্দ্র খুলা হয়েছিল তাতে ৩৬৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রতি আশ্রয় কেন্দ্রে স্বাস্থ্য বিধি মেনে ১৫ জন করে রাখা হয়েছিল, এবং প্রত্যেক আশ্রয় কেন্দ্রে খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পৌঁছে দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং পবিত্র ঈদুল -আযহা উপলক্ষ ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ৩৩১টি পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর