গাড়ির চাকা পাংচার হলো, মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে এলো পুলিশ। চলে গেল পুলিশ, এলো ডাকাত। ডাকাতির পর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে আবার ফিরে এলো ঢাকামুখি মাওয়া রোডে সেই পুলিশের টহল গাড়িটি। দুধর্ষ ডাকাতির ঘটনা দেখেশুনে অত্যন্ত স্বাভাবিক পুলিশ। যেন ডাকাতি হওয়াটা এই রোডে নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার।
রাতের পুলিশের টহল দলটিও অকপটে প্রতিদিনের ডাকাতির সেই বয়ান দিয়ে চলেছেন। যেন এ এক নির্মম ডাকাতির উৎসব। সেই রাতেই নাকি আরও দুটি ডাকাতি চলেছে একই সময়ে। আর পুলিশের সেই টহল দলটি কাউকেই ডাকাতদের কবল থেকে রক্ষা না করে ডাকাত-পুলিশ খেলা খেলে চলেছেন সড়কে। আর ডাকাতি শেষে ভুক্তভোগীদের স্থানীয় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা বা জিডি না করে ঢাকায় ফিরে ডিএমপির কোন থানায় জিডি করার উল্টো পরামর্শ দিচ্ছেন।
এ যেন মগের মুল্লুক। আরও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, দক্ষিন কেরানীগঞ্জের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আবুল কালাম মুরাদ বুধবার সকালে কিংবা সারাদিনেও থানায় এই তিনটি ডাকাতির বিষয়ে থানায় কিংবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ জামানের কাছে কোনরুপ মৌখিক বা লিখিত অভিযোগও করেননি। গাড়ির চাকা থেকে উদ্ধারকৃত সেই আলামতও তিনি গোপন করেছেন।
এভাবেই সেই দুঃসহ রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী নগরবাউলখ্যাত জেমসের বিজনেস ডেভলপমেন্ট ম্যানেজার রুবাইয়াত ঠাকুর রবিন। ঢাকার বাইরে ব্যক্তিগত কাজ শেষে বুধবার গভীর রাতে প্রাইভেটকার চালিয়ে মাওয়া-ঢাকা সড়ক ধরে বনানীর বাসায় ফিরছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তার এক বন্ধু।
বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে পৌঁছান মাওয়া সড়কের তেঘড়িয়া এলাকায় (র্যাব-১০ নির্মিতব্য ক্যাম্পের বিপরীত পাশে)। তাঁর প্রাইভেটকারটি দ্রুত গতিকে চলছিল। এ সময় (ঘটনাস্থলে) ডাকাতরা সড়কের মাঝে একটি লোহার রড দাঁড় করিয়ে রাখে। ফলে প্রাইভেটকারের সামনের বাম পাশের চাকা পাংচার হয়ে যায়। আর পাংচার হবার ২০/৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হয় দক্ষিন কেরানীগঞ্জের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আবুল কালাম মুরাদের টহল গাড়ি।
এসময় এসআই মুরাদ রবিনের গাড়ির চাকায় গেঁথে যাওয়া লোহার রড টেনে বের করেন। এরপরই তিনি রহস্যজনকভাবে আনুমানিক ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। এসময় এসআই মুরাদকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার জন্য বিনীত অনুরোধ জানানো হয়। নির্জন সড়ক হওয়ায় রুবাইয়াত ঠাকুর রবিন (এসআই) তাঁকে অনুরোধ করেন কিছু সময় অপেক্ষা করার। কিন্তু তিনি কর্নপাত করেননি। এসব কথা জানিয়েছেন রুবাইয়াত ঠাকুর।
তিনি (রুবাইয়াত ঠাকুর) বলেন, পুলিশের গাড়িটি ঘটনাস্থলে থেকে চলে যাওয়ার আনুমানিক ৩০/৪০ সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটনাস্থলে রামদা, ছুরি আর লোহার রডসহ হাজির হয় ২০/২৫ জনের ডাকাতদল। আমাকে ও বন্ধুকে মারধর করে তারা ৪টি দামি আই ফোন, স্যামসং নোট-৮ ও সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা, ক্রেডিট কার্ড কেড়ে নেয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ডাকাতি পরপরই হাজির সেই টহল পুলিশের গাড়িটি। বিষয়টি অবহিত করলে এসআই মুরাদ এবারও কোন ধরনের গুরুত্ব দেননি। তিনি ঘটনাস্থল থেকে আলামত লোহার রডটি নিয়ে চলে যান।
রবিন বলেন, পরে ট্রাক চালকদের সহায়তায় গাড়ির চাকা পরিবর্তন করে ঢাকায় ফিরি।
পরদিন দুপুরে দক্ষিন কেরানীগঞ্জ থানায় স্বশরীরে হাজির হয়ে রবিন ডিউটি অফিসারকে বিস্তারিত ঘটনা অবহিত করেন। কিন্তু থানার ডিউটি অফিসার ডাকাতি বা ছিনতাই মামলা না নিয়ে একটি সাধারণ ডাইরীর পরামর্শ দেন। ডিউটি অফিসারের কথা মতই জিডিতে (জিডি নম্বর ৯৮৫) শুধুমাত্র লেখা হয়, ‘আমার ও আমার বন্ধুর ৪টি মোবাইল অসাবধানতা বশত হারিয়ে গেছে।’
ঘটনা সম্পর্কে দক্ষিন কেরানীগঞ্জ থানার এসআই আবুল কালাম মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের জবাবে অত্যন্ত সাধারণ ভাষায় বলেন, আমি সড়কে গাড়ি নিয়ে ডিউটিতে ছিলাম, তখন দেখি ওনাদের গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে গেছে। পরবর্তীতে আবার ফিরে এলে আমাকে জানানো হয়, তাঁদের মোবাইলগুলো ছিনতাই হয়েছে। জিডির ব্যাপারে তিনি কিছু জানেনা বলে জানান।
ডাকাতির আগে উপস্থিত হয়েও আপনি ভুক্তভোগীদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ না করে চলে গেলেন কেন প্রশ্ন করলে তিনি কোন সুদুত্তর দিতে পারেন নি বলে স্বয়ং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ জামান এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে দক্ষিন কেরানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ জামান বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ডাকাতির আগে টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হবার পরও ডাকাতির ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। এটি দঃখজনক। আরও বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। যে কোন মূল্যে এই সড়কে ডাকাতি নির্মুল করতে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। অবশ্যই ঢাকা-মাওয়া সড়কের সুনাম অক্ষুন্ন রাখা হবে।’
সম্প্রতি ঢাকা-মাওয়া সড়কে পুলিশ উপস্থিত হবার পরও পরবর্তীতে ডাকাতির ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে গত শনিবার চাপে পড়ে (এসআই) আবুল কালাম মুরাদ নিজেই বাদী হয়ে একটি ডাকাতির মামলা করেছেন বলে তদন্তককারী কর্মকর্তা এএসআই রিপন মিয়া এই প্রতিবেদককে জানান।
তিনি মামলার নম্বরটি দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেও আলামত হিসেবে সেই লোহার রডটি আবুল কালাম মুরাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
বার্তাবাজার/এমকে