হাসপাতালের কারখানা মোহাম্মাদপুর: ফ্ল্যাট বাসায় চলছে ডায়াগনস্টিক ব্যবসা

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে লাভজনক ব্যাবসা হিসেবে সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকের ব্যবসা। রাজধানী সহ সারাদেশ জুড়ে ছোট বড় আকারে গড়ে উঠেছে এই সব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। রাজধানীতে মোহাম্মাদপুরের আওতায় বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলো হওয়ায় ব্যবসায় সফল পাচ্ছেন ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গলিতে গলিতে বাসায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠা এই হাসপাতাল ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিকরা।

বিশেষ করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার পাশে আগারগাঁও। ঐ এলাকায় অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ,হৃদরোগ হাসপাতাল,পঙ্গু হাসপাতাল,শিশু হাসপাতাল এবং কিডনি হাসপাতাল এলাকাগুলোর আশেপাশে কোন আবাসিক এলাকা না থাকায় বেসরকারি হাসপাতাল দেখা যায়না। কিন্তু ঐ হাসপাতালগুলোর কোল ঘেঁষে মোহাম্মদপুর বাবর রোড,হুমায়ন রোড, খিলজী রোড এবং শ্যামলী এই এলাকাগুলো আবাসিক এলাকা হওয়ায় হাসপাতালের ব্যবসায় দৌরাত্ব বেড়েছে ব্যাবসায়ীদের।

ছবি- বার্তা বাজার

সাধারণত দেখা যায় এই হাসপাতালগুলো একটি আবাসিক ভবনের বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে অথবা বাসার একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে শুরু করে হাসপাতাল ও ডায়গনষ্টিকের ব্যবসা। এদের অনেকে আবার পেয়েছেন হাসপাতাল চালাতে বৈধ সকল কাগজপত্র। যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের সকল ধরনের কাগজপত্রের বৈধতা দিয়েছেন। কিন্তু এভাবে বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া করে আবাসিক এলাকাগুলোতে হাসপাতাল চালানোর কোন দিকনির্দেশনা আছে কিনা তা তাদের অজানাই থেকে যায়।

এসব নামে মাত্র ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল কিভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা নামে বেনামে এই সব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে খুব শীঘ্রই ব্যবস্থা নিবো। কিভাবে বাসাভাড়া করে ডায়াগনস্টিক সেন্টার করেছেন এমন এক প্রশ্নে নাম প্রকাশ্য অনিচ্ছুক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক মালিক বলেন, সবকিছু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জানা। তারা অনুমতি না দিলে কখনো কি করতে পারতাম? আরো এক অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তারা মাসোহারা পায়।

ছবি- বার্তা বাজার

এইসব ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল থেকে তার জন্যই তাদের দৌরাত্ব চলছে গতি ছাড়া। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, চাঁদ উদ্যান এলাকার ১ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় ল্যাবটেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের সাইনবোর্ড ঝুলছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ডায়াগনস্টিকে বিভিন্ন টেস্ট করার জন্য যে নির্ধারিত মূল্য ঝুলিয়ে রাখার কথা তা চোখের আঁড়ালেই রয়ে গেছে। বৈধ কোন কাগজপত্র আছে কিনা তাও অজানা।

মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী এলাকায় মেইন রাস্তা ঘেঁষে শিয়া মসজিদ র‌্যাব ক্যাম্পের একটু সামনেই একটি ফ্ল্যাট বাসার দ্বিতীয় তলায় দি হরমুন ল্যাব এন্ড ইনফারটিলিটি সেন্টারে গিয়ে কাউকে খুজেই পাওয়া যায়নি। বাহির থেকে তালা ঝুলে থাকতে দেখা যায়। আবার দেখা যায় মোহাম্মদপুর বাস ষ্ট্যান্ড থেকে বসিলা রোডে সেইফ হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, আমরা এই ল্যাব থেকে টেষ্ট করানোর পর সঠিক কোন রোগ নির্ণয় করতে পারেনি।

আবার এমন হয় যে, এই ল্যাবগুলো থেকে টেস্ট করিয়ে যেই রেজাল্ট পাওয়া যায়। ঠিক অন্য ল্যাবে টেস্ট করিয়ে তার বিপরীত ঘটে। তাদের যন্ত্রাংশ দেখলে মনে হয়। আমাদের সাধারণ জনগনকে বুঝ দিতেই নিন্ম মানের যন্ত্রাংশ দিয়ে সাজানো এইসব হাসপাতাল। যারা বিশ্বাসের জায়গা চিকিৎসা সেবা নিয়ে ব্যাবসা নামক মজার খেলায় মেতে আমাদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ফেলছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির জোর দাবি জানাই।

এ ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, যারা ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া নিয়ে ছোট ছোট হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টার খুলে বসেছে। তাদের কোন স্বাস্থ্যসম্মত চিকিৎসা সেবা নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তারা চিকিৎসার নামে মানুষকে আরো অসুস্থ করে তুলছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভ্রুক্ষেপ না থাকায় দিন দিন এর সংখ্যা বেড়েই চলছে। অন্যদিকে রাজউক এই সব আবাসিক এলাকায় কিভাবে তাদের অনুমোদন দেয় তা আমাদের দৃষ্টিগোচর। এইসব ক্লিনিক ও হাসপতাল বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হলো, তারা সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে রোগীদের ফুসলিয়ে এই ক্লিনিকগুলোতে নিয়ে রোগীদের গলা কাটে। যা আমরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কয়েকদিন পর পর অভিযান করে দালালদের আটক করতে দেখি। যদি এই সব ক্লিনিক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। তাহলে দিন দিন এদের দৌরাত্ব বেড়েই চলবে। চিকিৎসা সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই তাদের একেবারে সিলগালা সহ দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ করবো।

মোহাম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আব্দুল লতিফ জানান, যারা বাসা বাড়িতে লাইসেন্সবিহীন এই সব হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টার খুলে বসেছে। এদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আমরা দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিব।

বার্তা বাজার/পি.বি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর