পর্যটন এলাকা ও চা শিল্পাঞ্চল শ্রীমঙ্গল উপজেলা থেকে সব ধরনের মাদকমুক্ত করতে এবার নির্দিষ্ট সময়সূচী ঘোষণা করেছে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ।
এরইমধ্যে ‘জিরো টলারেন্স লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া মাদক বিরোধী অভিযানে বেশ কয়েকজন অধরা মাদক বিক্রেতা ধরা পড়ার ফলে মানুষের মধ্যে পুলিশকে নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। তবে ধরা পড়া অপরাধীরা কি আবারও জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে মাদকের ব্যবসায় জড়িয়ে যাবে তা নিয়েও রয়েছে জনমনে সংশয়।
বৃহস্পতিবার (২২ জুলাই) শ্রীমঙ্গল থানার অফিসিয়াল ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে অফিসার ইনচার্জ আব্দুস ছালেক আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শ্রীমঙ্গলকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দেন। সর্বসাকুল্যে দেড় মাসেরও কম সময়ে মাদক নির্মূলের এই চ্যালেঞ্জটুকু নিয়েছে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ।
এতে লেখা রয়েছে ‘একটি গ্রাম একটি দেশ মাদক মুক্ত বাংলাদেশ, এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শ্রীমঙ্গল থানা এলাকা আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাদক মুক্ত করার ঘোষণা করছি। শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশকে মাদক মুক্ত করণে সহায়তার জন্য আপনার গ্রাম বা এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দিন।
আপনার নাম ঠিকানা গোপন রাখা হবে। আপনার নিকটে মাদক আনা নেওয়া করতে দেখলে তাৎক্ষণিক নিম্নোক্ত নাম্বারে গোপনে সংবাদ দিয়ে ধরিয়ে দিন যোগাযোগঃ- ০১৭১৩-৩৭৪৪৪০, অফিসার ইনচার্জ শ্রীমঙ্গল থানা ।’
এ সম্পর্কে অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুছ ছালেক বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা হালনাগাদ, নজরদারি, জামিনপ্রাপ্ত দাগীদের পুনঃ গ্রেপ্তার, মাদক রোধে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি ও প্রচারাভিযান, সমাজের নাগরিক প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোন পুলিশ সদস্য যাতে কোন গাফিলতি বা দুর্নীতির সাথে না জড়ায় সে ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান বলেন, পুলিশ সম্পূর্ণ পেশাদারী মনোভাব নিয়ে মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করবে। ব্যক্তির পরিচয় বা অবস্থান যা হোক না, যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টতা পেলে তাকে আইনের আওতায় অবশ্যই নিয়ে আসা হবে। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কোন মাদকসেবী, ব্যবসায়ী, দালাল এমনকি মাদক সংক্রান্ত জড়িত কারো বিষয়ে কোন তদবীরকারীকেও ছাড় দেওয়া হবে না।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ধরা পড়া, জেলে যাওয়া, ফিরে এসে আবার জড়িয়ে যাওয়া প্রচলিত এই অবস্থা থাকলে মাদকমুক্ত করা গেলেও তা ধরে রাখা কঠিন। কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
মাদকসেবী–ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ, অঙ্গীকার, পুনর্বাসন এবং কতিপয় ক্ষেত্রে আইনের কঠিন প্রয়োগের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত হলে থেমে যাবে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে বেঁচে যাবে তারুণ্য, যুবসমাজ। ফলশ্রুতিতে নতুন প্রজন্ম পাবে করোনা পরবর্তীতে নতুন পৃথিবীতে নেশামুক্ত সমাজ।
তারা বলছেন, স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের দেশের অন্য এলাকার ব্যবসায়ীদের সাথে থাকা নেটওয়ার্ককে ভেঙ্গে দিয়ে স্থল পথে, রেলপথে এবং প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত পথে আসা মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু থানা পুলিশই নয়, পর্যটন পুলিশ, রেল পুলিশকেও জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। এছাড়া, পুলিশেরই এলিট ফোর্স র্যাবের মাদক দমনে ব্যাপক সাফল্য রয়েছে।
র্যাবও কঠোরভাবে মাদক কারবারিদেরকে পাকড়াও করতে পারলে টাইমফ্রেম মধ্যেই মাদকমুক্ত করে ফেলা সম্ভব। অপরদিকে সীমান্তের অতন্দ্রপ্রহরী বিজিবির তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে সত্যিই মাদকমুক্ত হতে খুব একটা সময় লাগবে না বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন অনেকেই।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী আগামী ১৬ ডিসেম্বর দেশকে মাদকমুক্ত ঘোষণা করার প্রত্যয় নিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে পুলিশের মহা পরিদর্শক ড. মো. বেনজির আহমেদ সার্বিক নির্দেশনায় এবং মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শ্রীমঙ্গল থানাকে মাদকমুক্ত দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
ইতিমধ্যে মাদক বিরোধী অভিযানে পুলিশের ভাষ্যমতে একাধিক ডিলার ধরা পড়ার খবরে স্বস্তি ফেলছেন নাগরিকরা এবং পুলিশের এমন যুগান্তকারী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে সর্বশেষ মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধী ধরা না পড়া পর্যন্ত অভিযান চলমান রাখার অনুরোধ সাধারণ জনগণের। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মানুষ শ্রীমঙ্গল থানার এমন সাহসী ঘোষণাকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে পুলিশের বিশেষ মাদক বিরোধী অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে মাদক কারবারিরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ইয়াবা ডিলারদের সাথে যোগসূত্র রয়েছে মধ্যম শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের আর ছিচকে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা প্রথমে ইয়াবাসেবী পরবর্তীতে কারবারী হিসেবে গ্রামে–গঞ্জে–পাড়া–মহল্লায় আত্মপ্রকাশ করে এবং অর্থবিত্তের মালিক এমন পরিবারের সন্তানকে টার্গেট করে ইয়াবায় অভ্যস্ত করে তোলে।
তবে সমাজের গরীব অংশের মধ্যে ইয়াবার প্রকোপ খুব একটা না থাকলেও, মদ ও গাঁজার ব্যবহারকারী রয়েছে অসংখ্য। মাদক ব্যবহারে ভদ্রবেশী অপরাধীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়, যারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং সমাজের উপর তলার লোক হিসেবেই বিবেচিত হয়।
কেএস/বার্তাবাজার