জার্নি বাই বাস

সকাল ৬টা। খুব তরিঘরি করে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে গুছাতে ব্যাস্ত হয়ে পরলাম। সাতক্ষিরা (ভোমরা স্থল বন্দর) থেকে আমাকে পটুয়াখালী যেতে হবে। সরাসরি পটুয়াখালীর বাস ধরার জন্য একটু তারাতারিই উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে রেডি হতে হতে প্রায় ৭টা বেজে গেল। রুম বন্ধ করে চাবি জমা দেওয়ার জন্য ম্যানেজার এর রুমের সামনে গিয়ে দেখি রুম ভিতর থেকে আটকানো। দরজায় করা নারলাম কিন্তু সাড়া পেলাম না। অথচ নোটিশে দেখতে পেলাম সকাল ৬ টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত রুম সার্ভিস।

ডাকাডাকি করার পর প্রায় ১৫ মিনিট পর ম্যানেজার ঘুম ঘুম চোখে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো, তার কাছে চাবি জমা দিয়ে বেরিয়ে পরলাম। প্রথমে আমাকে ভোমরা থেকে সাতক্ষীরা যেতে হবে। এখান থেকে সাতক্ষীরা যাওয়ার একমাত্র বাহন ভ্যান, মাহিন্দ্রা, অথবা লেগুনা। তারাতারি যাওয়ার জন্য মাহিন্দ্রার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম, ১০ মিনিট পর একটা মাহিন্দ্রা পেলাম। সাতক্ষীরা যেতে যেতে ৮টা বেজে গেল। সরাসরি পটুয়াখালী যাওয়ার বাসটা আর পেলামনা।

বি.আর.টি.সি কাউন্টারে গিয়ে বরিশালের টিকিট কাটলাম। করোনা ভাইরাসের সতর্কতার কারণে দু-সিট একজনের কিনতে হলো। যাক তবুও মনে প্রশান্তি নিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ২০ মিনিট পরে বাস এলো। বাসে উঠে নিজের সিটের কাছে গিয়ে দেখলাম আমার সিট অন্যজনের দখলে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনার সিট কোথায়? তিনি আমাকে তার টিকেট দেখালেন, দেখলাম তার সিট আমার সিটের অপর পাশে। তার সিটেও অন্য একজন দখল দিয়ে বসে আছে, অথচ তার টিকেট নেই।

সুপারভাইজারকে ডাকলাম, কয়েকবার বল্লাম কিন্তু তিনি তেমন ভ্রুক্ষেপ করলেন না। কিছুক্ষন পর আমার সমস্যা জিজ্ঞেস করলে বল্লাম আমার সমস্যার কথা। অতঃপর আমার সিটে আমি নিজে বসতে ব্যার্থ হই, সুপারভাইজার ও ব্যার্থ হলেন সিট দখল নিতে। সুপারভাইজার আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললেন ভাই, আপনি ড্রাইভারের পিছনে ভি.আই.পি ৩, ৪(সিট নম্বর) তে বসেন। বাধ্য হয়ে সেখানেই বসলাম, বসে খেয়াল করলাম যেখানে বসলাম সেটা এস্কট্রা ২, ৩ অর্থাৎ এই সিট টিকেটের আওতার বাইরে। ভি.আই.পি ৩, ৪ আমার পিছনে।

চুপচাপ বসে রইলাম, ইঞ্জিনের তাপে পা দুটো স্থির থাকতে চাইলো না। নরে চরে বসে একটু শান্তি খোজার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। প্রায় দেড় ঘন্টা পর খুলনা পৌছালাম। সাতক্ষীরা থেকে খুলনা আসার পথে অনেক খুচরো যাত্রী তুলেছে এই দুরপাল্লার বি.আর.টি.সি বাসটি।

যাইহোক, খুলনা এসে নিজের সিটটা নিজের করে পেলাম। প্রশান্তি নিয়ে বসলাম, হেলান দিয়ে বেশিক্ষন থাকতে পারলাম না। প্রস্রাবের গন্ধে পেটে মোচর দিয়ে উঠল। কি বেপার? আমার মাস্ক থেকে গন্ধ আসতেছে নাকি? তরিঘরি করে মাস্কটা ব্যাগে ভরে রাখলাম। এবার আবার হেলান দিয়ে বুঝতে পারলাম যে এটা আমার নামে বরাদ্ধ করা সিটটা থেকে আসছে। নিজের পোষাকের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। কালো পোশাক সাদা হয়ে গেছে। সিট টা তার গায়ের কিছুটা ময়লা আমার গয়ে দিয়ে কেমন যেন আনন্দে লাফাচ্ছে, লাফাতে লাফাতে সে নিচে পরে গেল।

সুপারভাইজার কে ডেকে সিটটা ঠিক করে দিতে বল্লাম এবং প্রস্রাবের গন্ধের কথা বল্লাম। সুপার ভাইসার বল্লেন (সামান্য মুতের গন্ধে কিচ্ছু হবে না মামা) বসে পরেন। এই সামান্য গন্ধটাকে না আটকাতে পারায় আমার (কেএন-৯৫) মাস্ক এর প্রস্তুতকারক কে কিছুক্ষন মনে মনে অভিশাপ দিলাম।

যাইহোক, নিজের ব্যাগ থেকে একটা তোয়ালে বের করে সিটের উপর বিছিয়ে নিলাম (যারা বাসে ভ্রমন করবেন তারা অবশ্যই মনে করে একটা তোয়ালে অথবা বিছানার চাদর নিয়ে নিবেন সাথে করে, তারপার আপনার আসনে বসার আগে চাদর টা বিছিয়ে নিবেন)। হাতে গোনা ১০ জন যাত্রীই ছিলো শুধু টিকেটের। কিন্তু পুরো বাসটি যাত্রীতে পরিপূর্ন ছিলো। অবশেষে বরিশাল এসে পৌছালাম।

বরিশাল থেকে পটুয়াখালী যাওয়ার জন্য একটা লোকাল বাসে টিকেট কাটলাম। পিছনের সিটের আগের সিট ২টা পেলাম। বসে পরলাম, বাসের সব টিকেট বিক্রি শেষ হলেও সুপারভাইজার কে দেখলাম যাত্রী উঠাতে, আমি কোনো সিট দেখতে না পাওয়ায় সুপারভাইজারকে জিজ্ঞেস করলাম মামা সিট কই? একগাল হেসে বললেন মামা সিট আসে, বের করতেছি। দেখলাম উপরে তাক থেকে একটা সিট বের করে দুই সিটের মাঝখানে এটে দিয়ে সেখানে ৩ জনকে বসিয়ে দিয়ে সুপারভাইসার গম্ভীর সুরে তাদের ৩ জনকে বললেন (কিপ ডিসটেন্স, কমপক্ষে ৩ ফিট)।

এছারাও বাসের ভিতর অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিলো এবং দাঁড়িয়ে থাকা কারোর ভিতরই (কিপ ডিসটেন্স, কমপক্ষে ৩ ফিট) এর কোনো চিহ্ন পেলাম না। পুলিশ চেকপোষ্টে আগে সমস্ত দাড়ানো যাত্রী গুলোকে নামিয়ে দিয়ে টিকিটের যাত্রী গুলোকে নিয়ে স্ট্যান্ড চলে গেল বাসটি। যাত্র শেষ।

লেখক: আফনান তাজ
সংবাদকর্মী, বার্তাবাজার

বার্তাবাজার/এমকে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর