মায়ের দেয়া ৩৬শ’ টাকায় স্বপ্নের দেশে হাফিজুর

জি আই তারের নেট মেশিন, ঘাষ কাটা মেশিন ও জুতা বানানোর মেশিন তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের যুবক। পিছিয়ে থাকার সময় অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তাইতো ৩৬শ’ টাকা হাতে নিয়ে এখন সফল উদ্যোক্তা। তবে এই সফলতার পেছনে রয়েছে শ্রম ও আনন্দ-সুখের অনেক কাব্য।

তাদেরই একজন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার হরিণা পেপুলবাড়িয়া বাজারের মেসাস মাহবুব ট্রেডাস এর স্বত্বাধিকারী মো. হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি জানিয়েছেন, শখ নিয়ে সময় কাটানো থেকে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প।

কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা ইউনিয়নের চোরমারা গ্রামের আব্দুল মোত্তালেব ভূঁইয়ার ছেলে মো. হাফিজুল রহমান ভূঁইয়া। তিনি জি আই তারের নেট মেশিন, ঘাষ কাটা মেশিন ও জুতা বানানোর মেশিন তৈরি করার নিজস্ব কারখানা স্থাপন করেছেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার হরিণা পেপুলবাড়িয়া বাজারে। তার কারখানায় কাজ করে বর্তমানে প্রায় ২৫ টি পরিবার স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

হরিণা পেপুলবাড়িয়া বাজারের মেসাস মাহবুব ট্রেডার্সে কাজ করতে আসা আসা মো. রুবেল শেখ বলেন, একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা পারিশ্রমিক পান। ফলে একজন প্রতি মাসে আয় করতে পারেন প্রায় ২০ হাজার টাকা। তারা সংসারে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি এই কাজ করে যে টাকা পায়, সেটা বাড়তি আয়। এ কারখানায় কাজ করে ২০ থেকে ২৫ টি পরিবার এখন সুখের আলো দেখছে বলে জানান তিনি।

জানা যায়, ২০১৭ সালের দিকে কাজিপুর উপজেলার চোরমারা গ্রামের মো. হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া নামের এক যুবক মায়ের দেয়া ৩৬শ’ টাকা নিয়ে জি আই তারের নেট মেশিন বানানো শুরু করে। প্রথম দিকে নিজ বাড়িতে একা কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে লোকবল বাড়িয়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়নের হরিণা পেপুলবাড়ীয়া বাজারে মেসাস মাহবুব ট্রেডার্স নামে লৌহ ও ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলে। সেখানে এলাকার দরিদ্র নারীরা কাজ করার জন্য এগিয়ে আসেন। এ কারখানায় ২০/২৫ জন নারী ও পুরুষ কাজ করছেন।

এ কারখানায় কাজ করতে আসা মোছাঃ জুমারা (৩০) নামের এক নারী জানান, দেড় বছর আগে বিয়ে হয়েছে। বিয়ের এক বছরের মাথায় একটি সন্তান হয়। সন্তানের বাবা একজন দিনমজুর। আট মাসের সন্তান রেখে সে অনত্র চলে যায়। তারপর আমি নিরুপায় হয়ে পড়ি। অবশেষে এই কারখানায় কাজ নেই। বর্তমানে আমি কাজ করে যতটুকু আয় করতে পারি তা দিয়েই সংসার চলছে।

কাজের ব্যস্ততা ছেড়ে দৌড়ে এসে মোছাঃ হাঁসি খাতুন নামের এক নারী বলেন, আমার স্বামী প্রতিবন্ধি ফলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে অতি কষ্টে সংসার চলছিল। এই সময় জি আই তারের নেট তৈরির কাজ শিখে তাকে আর সংসার নিয়ে ভাবতে হয় না। এদের মতো অনেকে এ কাজ করে ভালোভাবে দিন কাটাতে পারছে। দেশের বিভিন্ন মার্কেটে এ সব বিক্রি হচ্ছে।

মাহবুব ট্রেডার্স এর পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সংসারে অভাব থাকায় মাধ্যমিক স্কুল পার হতে পারিনি। ৮ম শ্রেণি পাশ করার পর থেকেই গ্রামের হতদরিদ্র নারীদের ভাগ্যোন্নয়নের স্বপ্ন দেখতাম। তাই ২০১৭ সালে এলাকায় গরিব, দিনমজুর ও হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের কথা ভেবে এ কাজ শুরু করি। এতে গৃহকর্মের পাশাপাশি নারীরা এ কাজে শ্রম দিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। আমার তৈরিকৃত জি আই তার তৈরির মেশিন দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হচ্ছে। খুব সহজেই যে কেউ এ মেশিন কিনে জি আই তারের নেট তৈরি করতে পারবে। মেশিনের ধরন অনুযায়ী প্রত্যেকটি মেশিন ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসার পাশাপাশি সংসারের দেখভাল করতে হয়েছে। ফলে অবসর বলে কিছু ছিল না। তবে ব্যবসা অসচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য খুব কঠিন, এমনটি কখনও মনে হয়নি। চেষ্টা থাকলে যে কেউ ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে সফল হতে পারবেন।

এ প্রসঙ্গে বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এলাকায় এ ধরণের কারখানা গড়ে ওঠায় অনেক দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ওই শিল্পকে প্রসারিত করার উদ্যোগ নেয়া হলে প্রত্যন্ত গ্রামেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এই ধরনের লৌহ ও ইস্পাত শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বার্তাবাজার/এমকে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর