কখনো কি আমরা ভেবে ছিলাম যে আমাদের সারাক্ষন ঘরে বসেই দিন কাটাতে হবে। বাসা থেকে বের হতে গেলে নানা নিয়ম-কানুন মানতে হবে। এক পা আগে বাড়ানোর সময়ও আতঙ্কে থাকতে হবে এ বুঝি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গেলাম এ ভয়ে। কাছের মানুষদের সাথে দেখা করতে গেলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। আমরা কখনো ভেবেছি যে একসাথে কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারাবে, হয়ে যাবে কর্মহীন।
কয়েকমাস আগেও তো এতকিছু ভাবতে হয়নি আমাদের। হেসে-খেলে, আনন্দে চলে যাচ্ছিল আমাদের জীবন।
এই কয়েকমাসে হারিয়ে গেল আমাদের সেই আনন্দ, স্বাধীনতাগুলো।
এখন আমাদের বাইরে বের হওয়ার আগে মানতে হচ্ছে নানা নিয়ম-কানুন। করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে পড়তে হচ্ছে মাস্ক, কিছু ধরার আগে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হচ্ছে। কারো সাথে দেখা করতে গেলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে। বাইরে থেকে কিছু খাওয়ার আগে হাজার বার ভাবতে হচ্ছে।
সেই সাথে লকডাউনের ফলে স্বাভাবিক জীবন যাপন থমকে গেছে। বিশ্বে প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। দোকানপাট-বার-রেস্টুরেন্ট-শপিংমল আগের মতো জমজমাট চলছেনা। প্রতিবছরের সূচি অনুযায়ী হচ্ছেনা কোন খেলাধুলা।
এখন দিনের বেলাতেও অধিকাংশ রাস্তা-ঘাট থাকছে জনশূন্য। বন্ধ হয়ে আছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। মানব ইতিহাসে এই প্রথমবার এমন চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে শিক্ষা ক্ষেত্রে।
যেকোনো দুর্ভিক্ষ বলে দিতে পারে আমি–আপনিসহ পুরো পৃথিবী কত অসহায়। যেখানে খাদ্য নেই, সেখানে অর্থ–সম্পদও কাজে আসে না। যেমন আমরা ভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখেছি যে ভ্যাকসিন কিংবা কার্যকরী ওষুধ ব্যতীত চিকিৎসাসেবাও অসহায় জীবন বাঁচাতে। অতএব অর্থসম্পদ কোনো কাজেরই না যদি প্রকৃতি আশীর্বাদ না করে।
এখন শুধু আমরা অনুভব করতে পারি করোনাভাইরাসের আগের পৃথিবী কতইনা সুন্দর ছিল।
এখন কথা হচ্ছে করোনাভাইরাসের পরে আমরা আগের সেই পৃথিবীটা পাব কি? নাকি করোনার সঙ্গেই আমাদের বসবাস করতে হবে?
কেমন হবে করোনার পরবর্তী পৃথিবী:
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বিশ্বের প্রায় ২১০টি দেশ এখনও এই অদৃশ্য ঘাতকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আজও তাদের হাতে এসে পৌঁছেনি এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষেধক। এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বর্তমান বিশ্বকে যেমন ভাবাচ্ছে, ভবিষ্যতে এর ভাবনা আরও বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। এই ভাবনাগুলো তেমনি সমাজের অনেক পরিবর্তনও বয়ে নিয়ে আসবে।
করোনা–পরবর্তী বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে যেমন স্পষ্ট, তেমনি কর্মহীন হয়ে পড়বে লাখ লাখ মানুষ, যা এখন থেকেই দৃশ্যমান। কৃষক অর্থের অভাবে জমিতে ফসল উৎপাদন করতে পারবে না, দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষ।
লকডাউন থাকুক বা উঠে যাক, আমরা যেভাবে চলি, শপিং করি, খেতে যাই, বেড়াতে যাই, কাজ করি, পড়াশোনা করি- এই সমস্ত কিছুই আমূল বদলে দিতে যাচ্ছে করোনাভাইরাস। কিছু পরিবর্তন এরই মধ্যে ঘটে গেছে। বিশ্বের বহু মানুষ এখন ঘরে বসেই কাজ করছেন। প্রযুক্তি খুব সহজ করে দিয়েছে ব্যাপারটি। অনেক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পাঠদান করছে অনলাইনে।
সেভ দ্যা চিলড্রেন নিয়ে একটি আলোচনায় উঠে এল একটি ভয়ঙ্কর তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, আর কোনও দিন হয়তো স্কুলেই যাওয়া হবে না প্রায় এক কোটি শিশুর।
ইউনেস্কোর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জানা যাচ্ছে গত এপ্রিল মাস থেকে ১.৬ বিলিয়ন তরুণ তরুণী স্কুল ও পাঠ চুকিয়ে দিয়েছে। যা বিশ্বের পুরো ছাত্র সংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারিবারিক আর্থিক সংকট কাটাতে তরুণ তরুণীরা রোজগারের চেষ্টা করা শুরু করবেন। আর দায় মুক্ত করতে অধিকাংশ মেয়েরই খুব অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে পরিবার। যার ফলশ্রুতি ৯.৭ মিলিয়ন শিশু স্থায়ীভাবে স্কুল ছাড়বে।
চ্যাথাম হাউসের নির্বাহী পরিচালক রবিন নিবলেট বলেছেন,“বিশ্বায়ন বলতে আমরা এখন যা বুঝি, তার পরিসমাপ্তি এখানেই। করোনাভাইরাস হচ্ছে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের কফিনে শেষ পেরেক। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যে ধরণের বিশ্বায়ন দেখা গেছে, যাতে উভয়পক্ষই সুবিধা পেয়েছে, বিশ্ব আবার সেই অবস্থায় ফিরে যাবে তেমন সম্ভাবনা কম।”
“সংক্ষেপে বলতে গেলে কোভিড-নাইনটিন পরবর্তী বিশ্ব হবে আগের চেয়ে কম খোলামেলা, কম সমৃদ্ধ এবং কম স্বাধীন।”
কুরসিয়া জামান প্রিতম
শিক্ষার্থী, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া কমিউনিকেশন, গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ