যমুনা নদীর তীরবর্তী কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা এলাকার বাসিন্দা মোছাঃ মুক্তি বেগম। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে নিরব চাহুনীতে বসে আছেন ঘরে। একটু নিচে তাকালেই দেখা যায় তার পায়ের সামনে ঘরের ভেতর শুয়ে আছে একটি গরু। আর সেখানেই খাদ্যের অভাবে দাড়িয়ে হাম্বা হাম্বা করছে আরও দুটি গরু।
এমন অগ্রিম বন্যার পানিতে সুখ নেই ঘরের বাসিন্দা ও গোয়ালের গরু কিংবা মুরগিসহ অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর। যমুনা নদী ঘেঁষা বন্যা কবলিত সিরাজগঞ্জের এলাকা ঘুরে শুধু এমন দৃশ্য নয়, হঠাৎ চোখে পড়লো কিছু ঘর বন্যার পানিতে ডুবু ডুবু করছে। দূর থেকে দেখে মনে হলো পানি সম্ভবত ঘরের চাল স্পর্শ করছে!
ইঞ্জিনের গতি বাড়িয়ে ৫/৭ মিনিটের মধ্যেই নৌকা পৌঁছে যায় সেখানে। বাইরে নৌকা থেকে হাঁক দেওয়ার পর বেরিয়ে এলেন ইউপি সদস্য নয়ন সরকার। নৌকা থামিয়ে পানিতে নেমে ছুটলাম নয়ন সরকারের পেছনে পেছনে। আলাপে জানা গেলো, এ বাড়ির প্রায় সবাই অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করেন। দিনমজুর হিসেবেও কাজ করেন অনেকেই।
কিন্তু বন্যায় নিদারুণ কষ্ট পোহাতে হচ্ছে তাদের। বাড়ির ভেতরে একটু উঁকি দিতেই চোখে পড়লো বাড়ির উঠোনে ঘরের দরজার সঙ্গে বাঁধা একটা নৌকা। আরেক ঘরের দরজায় হাসেঁর বাচ্চারা জলকেলিতে মত্ত। অন্য দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখা গেলো, পানিতে সবকিছু তলিয়ে গেছে। বিছানাও ছুঁই ছুঁই করছে। ঘরে চলছে পানির স্রোত।
বন্যায় পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকদফা উঁচু করা হয়েছে চৌকি, চেয়ার ও আসবাবপত্র। চৌকি উচু করতে করতে অনেকটা মাচার মতো করা হয়েছে। রান্না ঘরগুলো ডুবে গেছে অনেক আগেই। এরপরও অনেক কষ্টে চলে রান্নার চেষ্টা, শুকনো জ্বালানির অভাবের পাশাপাশি চুলা সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
রান্না ঘরগুলোর পানির নিচে থাকায় মাচার ওপরে মাটি দিয়ে তৈরি চুলায় চলে রান্না-বান্না। বানভাসি মানুষের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি গবাদি পশুকে নিয়ে। গরু গুলোকে গোয়াল ঘর থেকে থাকার ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে। কলাগাছ, পাটকাঠি, বাঁশ, কাঠ দিয়ে বিছানার পাশে তৈরি করা হয়েছে মাচা। গরুর থাকার ঘর এখন মাচার উপরে।
হাঁস-মুরগির ঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় সেগুলোর জন্যও আলাদা মাচা তৈরি করা হয়েছে। পানি থেকে রক্ষায় মানুষ, গরু, হাস-মুরগি সব কিছু আস্তে আস্তে মাচায় উঠছে। ওই বাড়ির বাসিন্দা রেজাউল বলেন, আংগোর বিপদ, হাস-মুরগি, গরু -ছাগল ওগোরও বিপদ। এহন আর কী করমু, হগলে এক সঙ্গে থাকমু। সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, অনেকে গরু সহ অন্যান্য গৃহপালিত পশু নিয়ে বাধে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকেই আশপাশে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে চলে গেছেন। আর পশু-পাখি সড়কে রাখছেন।
এদিকে বানভাসি মানুষের আশ্রয়ের জন্যে আশেপাশে কোন আশ্রয় কেন্দ্র নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। স্থানীয় অছিমুদ্দিন শেখ বলেন, আমাগোর খাওনের পানি সংকট চরমে। আধা ডোবা কল (টিউবওয়েল) থাইক্যা পানি আইন্যা খাই, আর কি করমু। কাজ-কর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকটও রয়েছে বলে জানান তিনি। সিরাজগঞ্জে বন্যায় এ দৃশ্য এখন নদী তীরবর্তী সদর,কাজিপুর,বেলকুচি,শাহজাদপুর ও চৌহালীর বিভিন্ন এলাকার। পানিতে তলিয়ে গেছে ঘর-বাড়ি কিংবা উৎপাদিত শস্যও টুকুও। খাদ্য, আবাসন সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এ জনপদের মানুষের অনেকেই এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
এ বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ৪’শ মেট্রিক টন চাল এবং চার লাখ নগদ অর্থ এ মুহূর্তে রয়েছে। জেলার বন্যা কবলিত ও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তা পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ করা হবে। বন্যায় জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের বাঁধ, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সেতু, কালভার্ডসহ প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও এখন পর্যন্ত সেখানে কেউ অবস্থান করেনি।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম রফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘন্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩২ সেন্টিমিটার । এদিকে আগামী ৭২ ঘন্টা পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম জানান, দ্বিতীয় দফায় যমুনার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নদীবেষ্টিত সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলায় ২৫২০ হেক্টর জমির পাট ও তিল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না কমলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
কেএস/বার্তাবাজার