গল্প- সময় ১৯৫২

★পুতুল গড়া,ভাঙা

নদীর কাছে নির্জন জায়গায় কটকটে রোদে বসে পুতুল বানাচ্ছে ঝিনুক।খুব যত্ন করে রোদে পুতুলগুলোকে শুকায়।শুকানো শেষে ঝিনুক খুব আয়োজন করে পুতুলগুলোকে ভেঙে ফেলে।কোন দুঃখবোধ কাজ করে না।ঝিনুকের মুখ দেখে বুঝা য়ায় এতে সে বেশ আনন্দ পাচ্ছে!

-হ্যাঁ রে ঝিনুক আজও রোদে বসে আছিস।বলেছি না শরীরের রং মরে যাবে।কথা তো একটাও শুনিস না।

-দিদা! আমি তো এমনিতেই কালো।অতো ভেবে কি হবে বলো?তার চেয়ে নিজের ভালো লাগাকে লাই দিয়ে বেপরোয়া বানাই।

ভালো লাগাকে আসকারা দেওয়ন নাই ঝিনুক।বড় হচ্ছিস না তুই!এখনো পুতুল বানানো,নদীতে কাগজের নৌকা ডুবানো,কটকটে রোদে হাঁটা এগুলো তোকে মানায়?
উদাস মনে দিদাকে রেখেই ঝিনুক বাড়ি ফিরে।দিপ্ত পায়ে দৃঢ়,তেজি হেঁটে যাওয়ার দিকে চেয়ে দিদা দেখতে পাচ্ছে-নদীর তীরে একটা শিশু পা ঝাপটিয়ে কাঁদছে।তা দেখে কটকটে রোদ নিষ্ঠুর হাসি হাসছে।দিদা কোন কিছু না ভেবেই নাম দিয়ে দিলো ঝিনুক।কোলে তোলে নিয়ে বললো, কোন আভাগার বেটি মেয়েটাকে ফেলে গেল।স্বাদ মিটানোর সময় মনে ছিল না?

ঝিনুকের বয়স এখন তের।প্রখর বুদ্ধি মেয়েটার।সে সব বুঝে নিয়েছে।উন্মত্ত দুই যুবক-যুবতীর ব্যাভিচারের ফসল সে।এতে তার কোন রাগ -অভিমান আছে কি-না দিদা বুঝে উঠে না।খুব চুপচাপ ভাবুক মেয়ে ঝিনুক।
দিদা ঠিক করে রেখেছে,এই মেয়ের স্কুল শেষ হলে ইডেন কলেজে ভর্তি করাবে।

★আষাঢ়ে বৃষ্টিতে দিদা ভিজছে….

ঝিনুক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিদার দিকে।ঝিনুক দিদার দিকে চেয়ে দেখতে পাচ্ছে সদ্য কৈশরে পা ফেলা এক মেয়ে আষাঢ়ে বৃষ্টিতে ভিজছে।বুনিয়াদি পরিবারের মেয়ে দিদা।পুরান ঢাকার আলিশান বাড়িতে বেড়ে উঠা দিদার বিয়ে হলো অজপাড়া এক গায়ে।জায়গাটা ময়মনসিংহের নান্দাইল থানার মশুলীতে।নরসুন্দা নদীর গা ঘেষে বাড়িটা।বেশ সাজানো, গোছানো বড়সড় বাড়ি।দুরন্ত দিদা বেশ মানিয়ে নিয়েছিল।সাজিয়ে গোছিয়ে সংসার করার মুর্হূতে দিদার কপালে শনির দশা লাগে।দিদা বিধবা খেতাব পেয়ে যায়।বৈধব্য দিয়ে কাটিয়ে দিলো ওনার যৌবন।

দিদার বাড়ির সামনে নরসুন্দা নদীর তীর ঘেষে জামগাছটার নিচেই ঝিনুককে পেয়েছিল দিদা।যক্ষের ধনের মতো ঝিনুককে দিদা আগলে রাখল।একটা সময় ঝিনুকের পড়ার জন্য দিদা ঢাকায় ফিরে যায়।ঝিনুক কামরুন্নেসায় পড়ে।ছুটি পেলেই নরসুন্দা নদীর তীর ঘেষে বাড়িটায় ফিরে আসে দিদা, সঙ্গী ঝিনুক।ঝিনুকের প্রাইমারী জীবনটা নরসুন্দার তীরেই কেটেছে।পুতুল গড়ে,ভেঙে,কাট ফাঁটা রোদে হেঁটে,বিভিন্ন দস্যিপনা করে।সেই রেশটা এখনো বয়ে বেড়ায় ঝিনুক।তাই মাধ্যমিকে এসেও ছুটিতে নরসুন্দার পাড়ে বাড়িটায় আসলে পুতুল গড়া,ভাঙার কাজটা ঠিক চালিয়ে যায়।মা -বাবা যেমন তাকে জন্ম দিয়ে ফেলে গেছে নিশ্চিত ভাবে সেও যত্ন নিয়ে পুতুল বানায়,সযত্নে বানানো পুতুলগুলো ভেঙে তার সকল ক্ষোভ মেটায়।

-এতসব ভাবনায় ভাটা পরল ঝিনুকের। দিদা বরষার প্রথম কদম ঝিনুকের হাতে তুলে দিয়ে বললো,চল ভিজি,দিদা?
-ইচ্ছে করছে না দিদা।
-কি যে আবেগহীন কটকটে হলি তুই।চল, বৃষ্টির জল ছুতে হয়।সুন্নাত। বৃষ্টির সময় দোয়া কবুল হয়।চল ভিজি আর দোয়া করি।

ঝিনুক অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠুনটায় নামল।বেশির ভাগ সময় ভিজার তোরজোড় করলে বৃষ্টি থেমে যায়।কিন্তু আজ হলো উল্টোটা।উঠুনে ঝিনুক নামতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হল।ঝিনুক আনমনে চলে গেল জামগাছতলায়।আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে,
মা-বাবা তোমাদের প্রতি আমার কোন রাগ নেই।তোমাদের প্রতি কোন দাবি নেই।এই পৃথিবীতে আসার জন্য তোমাদের দরকার ছিল,সেই কাজ শেষ।বেড়ে উঠার জন্য দিদা আছে।তোমাদের আর দরকার নেই।
প্রয়োজন ছাড়া আমি কিছু করি না।প্রকৃতির খেলায় আমি গাছ তলায়।প্রকৃতিই আমার মা-বাপ।আমি প্রকৃতির সন্তান!

★দেশ ভাগের পর

ঝিনুকের যাওয়া হয়ে উঠে না নরসুন্দার তীরে বাড়িটায়। দিদার মনের তারুণ্য জেগে থাকলেও শরীরটা বয়সের ভারে বুড়িয়ে গেছে।অত্যাশ্চয় ঘটনা যা হল-ইডেন কলেজে ভর্তির হওয়ার প্রথম দিনেই দিদা আকাশের খসে যাওয়া তারার জায়গা পূরণ করতে যাত্রা করল।

‘৫২ সালের পড়ন্ত বিকাল।চারদিকে ফাগুনবন্যা।ঝিনুক বসে ভাবছে,’৪৮ সালের কথা।ভাষা নিয়ে যুদ্ধ বাঁধার সূচনালগ্নের কথা।মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সেই বাক্যগুলি মনে পড়ছে।মনে পড়ছে, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।ছাত্রদের ক্ষোভ বিষ্ফারিত হওয়ার মুর্হূতগুলো মনে পড়ছে।মধুর রেস্তোরাঁয় বসে ঝিনুকের মনে পড়ছে ইডেন কলেজের কথা,সমাজতান্ত্রিক ভাবনার কথা,নিজের ভাবনার কথা!ভাবছে এই ভাষা আন্দোলনে মেয়েরা কেন যোগ দিচ্ছে না!সেদিন ছেলেরা ক্লাস করবে না স্ট্রাইক করলো,মেয়েরা ছেলেদের পক্ষে না থেকে বরং ছেলেরা যখন ক্লাসরুমের সামনে শুয়ে পড়ল তখন ছেলেদের ডিঙিয়ে ক্লাস করতে গেলো মেয়েরা।সেদিন ঝিনুক ক্লাস করেনি।সে ঠিক করে রেখেছে,কেউ না দিক সে একাই যোগ দিবো এই আন্দোলনে।ঝিনুকের বিশ্বাস একটা সময় মেয়েরাও এগিয়ে আসবে দেশের এই সংকটকালে।নেতৃত্ব দিবে দেশের।ছেলে মেয়ে এক হয়ে কাজ করবে।

দেশের ভাবনা রেখে ঝিনুক এবার রাতের দেখা স্বপ্নের কথা ভাবছে।”স্বপ্নটা ছিল দিদা তাকে হাত ভর্তি কদম দিয়ে বলছে,আমাকে ছেড়ে থাকতে তোর ভালো লাগে ঝিনুক? আমার কাছে চলে আয় না?” সেই যে ঘুম ভাঙ্গল আর ঘুম হলো না।তখন থেকে দিদার নদী ঘেষা বাড়িটার কথা,দিদার কথা,জামগাছটার কথা মনে পড়ছে!হঠাৎ ঝিনুক ঠিক করলো শেকড়ের টানে ছুটে যাবে দিদার নদী ঘেষা বাড়িটায়।জামগাছ তলটায়।অন্তত কিছু ঘন্টার জন্যেও হলে যাবে জামগাছতলায়।

কিছু কিছু জায়গায় ছড়িয়ে থাকে স্মৃতি।সেই সব জায়গার মুখামুখি হলে স্মৃতিগুলো বুকের অতলে, বুক ফাটা আর্তনাদ তারস্বরে চিৎকার করতে না পেরে, নিঃশব্দে বুকের নিজস্ব জমিনে এলোপাতাড়ি ছুটাছুটি শেষে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বাহিরে আত্মপ্রকাশ করে।ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ঝিনুক।

★১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার চিন্তা করছিল ওরা

বিছিন্নভাবে বিভিন্ন স্কুল থেকে, কলেজ থেকে ছাত্ররা এসে জড়ো হতে লাগল বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে।১৪৪ ধারা জারি হয়েছে।রাস্তার মোড়ে মোড়ে টহল দিচ্ছে পুলিশ।
বেলা এগারটা।পুলিশকে উপেক্ষা করে আমগাছতলায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর সভা।সবার চিন্তার বিষয় এক।একশ ‘চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গ।
দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর একজন ঝিনুক।যার চোখে ভাসছে পরবর্তী প্রজন্ম বাংলায় কথা বলছে,কবিতা লিখছে,গাইছে।মরে গেলে যাবো।

আমাদের মরণ পরের প্রজন্মকে এনে দিবে স্বাধীন দেশ,দেশ প্রেম টিকরে বের হচ্ছে ঝিনুকের চোখ -মুখ উপচে।তার কোন পিছুটান নেই।মা নেই,বাবা নেই,জন্ম পরিচয় নেই।একমাত্র আপনজন দিদাও ছেড়ে গেছে।তার বেঁচে থাকার চেয়ে দেশের কাজে মরা উত্তম।
বাক -বিতান্ডের পর ঠিক হলো,দশ জন করে ওরা এক সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে।সবাই একে একে জেলে যাবে,মরবে তবুও তারা মায়ের ভাষাকে কেড়ে নিতে দিবে না।

ঘড়িতে বাজে বারটা।শীত কাল।তবুও শীত নেই।তারুণ্যের রক্তের টগবগে ছোঁয়া লেগেছে শীতের বাতাসে।উষ্ণ হয়েছে শীত কাল।প্রথম দলটা দশটা হাত এক করে বেরিয়ে পরল।স্লোগানে মুখরিত হল “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”।পুলিশ এসে ঘীরে ধরল ওদের। গ্রেপ্তার হলো সকলেই।খানিক পর বেরিয়ে এলো দ্বিতীয় দল,তারপর তৃতীয় দল।অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ল।চারপাশ ধুঁয়ায় ভরে গেল।সবাই ছুটাছুটি শুরু করল।সকলের চোখ জ্বালা শুরু করলো।ঝাপসা হয়ে আসছে চারদিক।কেউ কেউ দু’হাতে মুখ ঢাকলো।পুলিশ অকৃপণ ভাবে ছুড়ছে কাঁদুনে গ্যাস।
মেডিকেল কলেজের ছেলেরা মাইক হাতে বক্তৃতা করছে।বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পুলিশ মেডিকেল গেইটের দিকে আসছে।গেইটের দিকে যেখানে ছেলেরা জটলা বেঁধে স্লোগান দিচ্ছিলো,সেদিকে এগিয়ে গেলো ঝিনুক।ছেলেদের জ্বালাময়ী স্লোগানে যেন তুফান উঠেছে জনসমুদ্রে।
হঠাৎ গুলির শব্দ।এতোপাতাড়ি ভাবে মানুষ দৌঁড়াচ্ছে। গুলি এপোর-ওপোর হচ্ছে অনেকের বুক!একটা গুলি এসে লাগল ঝিনুকের বুকে।গুলির শব্দটা কেমন বুঝে উঠার আগেই ঝিনুক লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।চোখে ভাসছে দিদার মুখটা।এই বিশ্ব ব্রাহ্মন্ডে একমাত্র আপনজন।ফাল্গুনী বাতাসের ঝাপটা লাগল ঝিনুকের মুখে।চিরদিনের জন্য চোখ বুজল ঝিনুক।কেউ জানল না পুতুল গড়ে,ভেঙে ফেলা মেয়েটার কথা!

বি.দ্র:’৫২ র পর মাত্র তিন চার বছরের ব্যবধান মেয়েরাও আন্দোলনে যোগ দেয়।জেলে যেতেও তাদের ভয় নেই।ছেলেদের সাথে তাল মিলিয়ে তারাও মিছিল, স্লোগানে…….

লেখক- শিক্ষার্থী ও নবীন সাহিত্যিক

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর