শরণখোলায় মিলন বাহিনীর অত্যাচারে গ্রাম ছেড়েছে অনেক পরিবার

সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার পশ্চিম রাজাপুর এলাকায় পাঁচ ভাইয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মিলন বাহিনী চাঁদাবাজী ও অত্যাচারে গ্রামবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। নিরিহ গ্রামবাসীর উপর অত্যাচার, চাঁদাবাজি, জমিদখল, দস্যুতা ও চুরিসহ নানা অপরাধমুলক কর্মকান্ডই তাদের পেশা। ওই বাহিনীর অত্যাচারে এলাকার অনেক পরিবার এখন গ্রাম ছাড়া হয়েছেন। কেউ কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছে জীবন বাঁচাতে।

শুক্রবার বিকালে সরেজমিনে ওই ওলাকায় গেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর পেয়ে গ্রামবাসী এসে এলাকার সোমেদ চৌকিদারের ছেলে মিলন চৌকিদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মিলন বাহিনীর চাঁদাবাজী ও জমি দখল, বিভিন্ন অপরাধমূলক নানা কর্মকান্ডের অভিযোগ করেন। তাদের কথায় উঠে আসে ওই বাহিনীর দীর্ঘদিনের নিপিড়ন আর অত্যাচারের কাহিনী।

প্রবাসী সাখাওয়াত হোসেনের স্ত্রী ফাতিমা বেগম জানান, স্বামী প্রবাসে থাকায় তার ১২ বিঘা জমি জবর দখল করে নেয় মিলন বাহিনী। তাদের হুমকিতে তার ছেলে মুসার (৮) দুই বছর ধরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। অবশেষে ছেলেকে বাঁচাতে ১০ কিমি. দুরে উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় বোনের বাড়িতে রাখতে হচ্ছে। এছাড়া গত ১২ মে তার এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, একটি মোবাইল সেট, স্বর্ণের চেইন নিয়ে যায় বাহীনির সদস্যরা।

এ বিষয়ে তিনি মামলা করলে তা প্রত্যাহারের জন্য নিয়মিত হুমকি দেয়া হচ্ছে। প্রায়শঃ রাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে দরজা ধাক্কাধাক্কি করে ভয় দেখানোর কারণে তিনি টেনশনে রাতে ঘুমাতে পারেন না।

দেলোয়ার হাওলাদারের স্ত্রী সেতারা বেগম (৫৮) বলেন, মিলন বাহিনী তাকে মারধর করে তার ৪টি দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে। এ সময় তারা দুটি গরু ও হাঁস মুরগী লুট করে নিয়ে যায়। তাদের ভয়ে এখন রাতে তিনি বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে থকেন। তালাবদ্ধ একটি বসত ঘর দেখিয়ে তিনি বলেন, ভাই হাফেজ হাওলাদারের ছেলে সহিদুলরে স্ত্রী সুখীর উপর কুনজর পড়ে। পরে মানসম্মান ও প্রানের ভয়ে এলাকা ছেড়ে তারা চলে যায়।

বৃদ্ধ আইউব আলী আকন বলেন, তার একটি গরু মিলনের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এ অপরাধে তাকে টেনে হিচড়ে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে তারা। ওই সময় মিলনের হাতে পায়ে ধরে প্রাণে রক্ষা পান তিনি। গ্রাম ছাড়া ইউনুচের স্ত্রী হাসিনা বেগম মুঠোফোনে জানান, রাতে ঘরের বাহিরে বের হলে মিলন তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় শরণখোলা থানায় মামলা দিলে তার স্বামী ইউনুচকে মারপিট করে তারা।

স্থানীয় যুবক জাহিদ, বেল্লাল ও জাহাঙ্গীরসহ অনেকে বলেন, সাবেক গ্রাম পুলিশ সামাদ হাওলাদারের আট ছেলের মধ্যে মিলন, নেহরুল, মনির, ছগির ও নজরুল মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ, জমি দখল, ছিনতাই, নিরিহ মানুষদের মারধরসহ নানা অপরাধ করে চলছে।

এলাকার কোন নতুন বউ নিয়ে এলেই তাদের কু-নজর পড়ে। তাদের বাঁধা দিলে মারপিট করে এলাকা ছাড়া করা হয়। মিলনের প্রতিবেশী বৃদ্ধ মালেক হাওলাদার ও তার স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন, মেঝ ছেলে বিয়ে করলে তার স্ত্রীর উপর মিলনের কু-নজর পরে। এ কারণে বউকে চট্টগ্রামে ছেলের কাছে পাঠাতে বাধ্য হই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে নেয় তারা।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ধানসাগর ইউপি চেয়ারম্যান মোঈনুল ইসলাম টিপু, ইউপি সদস্য হুমাউন করিম সুমন তালুকদার ও সাবেক ইউপি সদস্য ছিদ্দিকুর রহমান জানান, ওদের আট ভাইয়ের মধ্যে মিলন (৩৮), নেহরুল (৪২), মনির (৪০), ছগির (৪৭) ও নজরুল (৪৫) সংগঠিত হয়ে গড়ে তুলেছে মিলন বাহিনী।

এলাকায় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতার ছত্র ছায়ায় থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, নিরীহ মানুষকে মারধর, ধর্ষণ, চাঁদাবাজী, জমি দখল করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মারধর করে এলাকা ছাড়া করে তারা। বিষয়টি একাধিকবার থানা পুলিশকে জানানো হলেও কোন এক অদৃশ্য শক্তির জোরে তারা পার পেয়ে যায় বলে তারা জানান।

এসকল অভিযেগের বিষয়ে মিলনের কাছে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের সাথে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। মিলনের ভাই নেহারুল তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিবেশীদের সাথে বিরোধ থাকায় তারা বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।

শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ এসকে আব্দুল্লাহ আল সাইদ বলেন, ওই এলাকায় গ্রুপিং এবং দীর্ঘদিন ধরে জমি বিরোধ ও মামলা চলে আসছে। তাই বড় কোন দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান ও মেম্বরকে নিয়ে একটি বৈঠক করে সমোঝতার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কে.এ.স/বার্তাবাজার

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর