স্যার আলেক জ্যান্ডার কানিংহাম ও স্যার বুকানন হ্যামিলটনের পরিদর্শন করা নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার ঐতিহাসিক দিবর দীঘি সঠিক উদ্যোগ নিলে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
ঐতিহাসিক দিবর দীঘিতে স্থাপিত প্রচীন স্থাপত্য পুরা কির্তীর অনুপম নিদর্শন এবং হাজার বছরের বাংলা ও বাঙ্গালীর শৌর্য-বীর্জের প্রতীক হিসাবে কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে আজো দন্ডায়মান দীঘির বিজয় স্তম্ভটি আর সেটি দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী দিবর দীঘিতে ভীড় জমাচ্ছে।
ইতিহাস সমৃদ্ধ দিবর দীঘি বরেন্দ্র ভূমি নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নের দিবর বা ধীবর নামক গ্রামে অবস্থিত। দীঘিটিকে ঘিরে লোক মুখে অনেক কল্পকাহিনী বা কাল্পনিক গল্প-কথা প্রচলিত আছে। এলাকার প্রবীন ব্যক্তিদের মতে জৈনক বিষু কর্মা নামক এক বির কর্তৃক এক রাতে এবং অন্যান্যদের মতে জীনের বাদশাহর হুকুমে এক রাতে বিশাল আকৃতির এই দীঘিটিকে খনন করা হয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায় দিবর বা ধীবর নামে পরিচিত এই বৃহত জলাশয় ও জলাশয়ের মাঝখানে অবস্থিত স্তম্ভটি একাদশ শতাব্দীর কৈবত্য রাজা দিব্যক তার ভ্রাতা রুদ্যোকের পুত্র প্রখ্যাত নৃপতি ভীমের কির্তী হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাস থেকে আরোও জানা যায়, পাল রাজা দ্বীতিয় মহিপালের (১০৭০ খ্রীঃ-১০৭১ খ্রীঃ) অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বরেন্দ্র ভূমির অধিকাংশ অমত্য পদচ্যুত সেনাপতি বরেন্দ্র ভূমির ধীবর বংশদ্ভুত কৃতি সন্তান দিব্যকের নেতৃত্বে পাল শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করেন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় মহিপালকে হত্যা করেন।
পরে সর্বসম্মতিক্রমে দিব্যককে বরেন্দ্রভূমির অধীপতি নির্বাচন করা হয়। অল্প কাল পরে দিব্যক মৃত্যু বরণ করলে প্রথমে রুদ্যোক পুত্র ভীম সিংহাসনে আহরোণ করেন। তিনিই এক মাত্র কৈবত্য বংশীয় রাজা যিনি প্রায় ২৫/৩০বছর বরেন্দ্র ভূমি শাসন করেন। এর পরে দ্বিতীয় মহিপালের ভ্রাতা রামপাল ভীমকে পরাজিত ও নিহত করে রাজ্যা পুনঃউদ্ধার করেন।
তবে কোন কৃতি কৈবত্য রাজা বিজয় স্তম্ভটি নির্মান করেছিলেন তা আজ অবধি সঠিকভাবে জানা যায়নি।
প্রায় ৩০ফুট লম্বা একটি অখন্ড পাথর কেটে তৈরী এই স্তম্ভের ৯টি কোণ আছে। এর এক কোণ থেকে অপর কোণের দুরত্ব ১২ইি। এই বিজয় স্তম্ভের উপরিভাগে পর পর তিনটি বলয়াকারে স্মৃীত রেখা আছে যা স্তম্ভের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এর শীর্ষদেশ নান্দনিক কারুকার্য খচিত মুকুটাকারে নির্মিত।
বর্ণনা মতে পানির উপরিভাগে স্তম্ভের উচ্চতা ১০ফুট, পানির ভিতর ১০ফুট এবং মাটির নিচে সম্ভবত আরো ১০ফুট গথিত আছে। স্যার বুকানন হ্যামিলটনের মতে স্তম্ভের দৈর্ঘ ৩০.৩৪ফুট। অপর দিকে স্যার আলেক জ্যান্ডার কানিংহামের মতে দৈর্ঘ ৩০ফুট। স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯সালে যখন এই দীঘি পরিদর্শনে আসেন তখন এর গভিরতা ছিল ১২ফুট এবং এর প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ ছিল ১২শ ফুট। বিজয় স্তম্ভটির শীর্ষদেশে মূল্যবান বস্তু আছে ভেবে কয়েক যুগ পূর্বে এর শীর্ষদেশের ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। কথিত আছে তারা প্রত্যেকে দিঘীতে ডুবে মারা গেছেন।
যুগ যুগ ধরে দখলবাজদের কারনে দিবর দিঘীর অনেক সরকারী সম্পত্তি বেদখল হয়েছে। বর্তমানে দিবর দীঘির জলাশয়ের পরিমান প্রায় ২০একর। এ জলাশয় টুকুই সরকারী সম্পত্তি হিসেবে বজায় আছে। মাছ চাষের জন্য লিজ দিয়ে সরকার প্রতি বছর দীঘি থেকে প্রয়ি ১০ লক্ষ টাকা রাজস্ব আয় করছে। ঈদের দিন ও তার পরবর্তী ৭দিন সেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম ঘটে।
তবে এখানে সংস্কারের কোন কাজ চোখে পরার মতো না। ছোটদের জন্য দোলনা, বাঘ ভালুকের মুর্তি ভাসকার্য মিনি চিড়িয়াখানা ইত্যাদি সংযুক্ত করলে বাচ্চা যেমন আনন্দ পাবে তেমনে দিবর দীঘির সুন্দরয্ আরও বৃদ্ধি পাবে।
বার্তাবাজার/এমকে