অবশেষে র্যাব-১ ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার বাগানবাড়ি এলাকার চাঞ্চল্যকর অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ হনুফা বেগম (২৮) হত্যার রহস্য উদঘাটনসহ মূল আসামী মোঃ খোরশেদ আলম ওরফে মামুন ওরফে ইমরান হোসেন ওরফে আরমান হোসেন (২৭) কে গ্রেফতার করেছে। রবিবার (২৮ জুন) আনুমানিক সাড়ে ৫টায় র্যাব-১ এর একটি আভিযানিক দল লক্ষীপুর জেলার রামগতী থানাধীন চর আফজাল এলাকা থেকে আসামী খোরশেদ আলমকে গ্রেফতার করে। এসময় নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা উদ্ধার করে র্যাব।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, ধৃত আসামী মোঃ দেলোয়ার হোসেন এবং মোসাঃ বুলু আক্তার এর পুত্র এবং তার বাড়ি চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানার পশ্চিম খিলাবাজার এর পাথর কলওয়ালা বাড়ি। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানাধীন পটিয়া ডাকবাংলা মোড়ে বসবাস করে আসছিলো। সম্প্রতি সে ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানাধীন জিরাবো বাগানবাড়ি এলাকার রুহুল আমীন মীরার বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে বাস করছিলো।
এ ব্যাপারে, র্যাব-১ এর কমান্ডার লেঃ কর্ণেল শাফীউল্লাহ বুলবুল স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, ভিকটিম হনুফা বেগম ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানাধীন জিরাবো বাগানবাড়ী এলাকায় তার ছোট ভাই জনৈক রুহুল আমিনের বাড়ি দেখাশুনা করছিলো। ভিকটিমের ছোট ভাই রুহুল আমিন বিদেশে থাকে। ভিকটিম হনুফা বেগম ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গত ১৩ জুন ২০২০ ইং তারিখ ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়ি হতে তার ছাট ভাই রুহুল আমিনের বাসায় আসে। পরে গত ২০ জুন ২০২০ ইং তারিখ সকাল আনুমানিক ১০টার সময় ভিকটিমের বড় বোন ভিকটিমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পায়। পরে বর্ণিত বাসার ভাড়াটিয়া জনৈক ছাকিয়াকে ভিকটিমের বড় বোন ভিকটিমের সাথে কথা বলিয়ে দিতে অনুরোধ করলে উক্ত ভাড়াটিয়া ওই বাসার ৪নং কক্ষে ভিকটিম হনুফা বেগম এর মৃতদেহ দেখতে পায়।
পরবর্তীতে ভিকটিমের বড় ভাইসহ তার আত্মীয়স্বজনরা উক্ত বাসায় এসে জানতে পারে যে অজ্ঞাতনামা আসামী ভিকটিমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পরে এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মোঃ রনি (৩৬) বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু করে (মামলা নম্বর- ৫২, তারিখ ২১/০৬/২০২০ ইং, ধারা- ১৮৬০ সালে দন্ডবিধি আইনের ৩০২)।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, উক্ত হত্যাকান্ডের ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়। এই নির্মম ক্লু-লেস হত্যাকান্ডের প্রেক্ষিতে র্যাব-১ তাৎক্ষনিকভাবে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে দ্রুততার সাথে ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব-১, উত্তরা, ঢাকা এর একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদ ও তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে জানতে পারে যে, বর্ণিত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত একমাত্র আসামী লক্ষীপুর জেলার রামগতি থানাধীন চর আফজাল এলাকায় অবস্থান করছে। পরবর্তীতে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আজ (২৮ জুন) আসামীকে গ্রেফতার করে র্যাবের একটি আভিযানিক দল। এসময় ধৃত আসামীর নিকট হতে ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল উদ্ধার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামী বর্ণিত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ধৃত আসামী মোঃ খোরশেদ আলম জানায়, সে পেশায় একজন গার্মেন্টসকর্মী। সে গত আনুমানিক ৫ জুন ২০২০ ইং তারিখ ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানাধীন জিরাবো বাগানবাড়ী এলাকার রুহুল আমিন মীরার বাসায় গার্মেন্টসকর্মী পরিচয় দিয় বাসা ভাড়া নেয়। গার্মেন্টসকর্মীর আড়ালে মূলত সে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। ভিকটিম হুনুফা বেগম বর্ণিত তার ভাইয়ের বাসাটি দেখাশুনা করার সময় ধৃত আসামীর সাথে তার পরিচয় হয়। ভিকটিমের কাছে বিল্ডিং মেরামত ও রং করার জন্য নগদ কিছু টাকা আছে বলে জানতে পারে আসামী। এছাড়াও ধৃত আসামী ভিকটিমের কাছে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল ফোন দেখতে পায়। নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সে ভিকটিমকে টার্গেট করে। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০ জুন ২০২০ ইং তারিখ সকাল আনুমানিক ৯টার সময় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ধৃত আসামী ভিকটিমকে কৌশলে ফাঁকা একটি রুমে নিয়ে যায় এবং ভিকটিমকে তার নিজের পায়জামার ফিতা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং তার কাছে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে আসামী মোঃ খোরশেদ আলম ওরফে মামুন ওরফে আরমান হোসেন (২৭) আশুলিয়া এলাকায় নিজেকে আরমান বলে পরিচয় দেয় এবং তার বাড়ি রাঙ্গামাটি বলে জানায়। সে আশুলিয়া এলাকায় এই মিথ্যা পরিচয় দিয়ে একটি গার্মেন্টসে চাকুরী নেয়। বর্ণিত হত্যাকান্ডের পর তার ব্যবহৃত সিমকার্ডটি সে ফেলে দেয় এবং একই দিন লক্ষীপুর জেলার রামগতি থানাধীন তার ২য় স্ত্রীর বাবার বাড়িতে অবস্থান নেয়। ভিকটিমের নিকট হতে ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণালঙ্কার একটি স্বর্ণের দোকানে সে বিক্রি করে বলেও র্যাবকে জানায়।
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায়, আসামী ইতিপূর্বেও বিভিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদা নাম ঠিকানা ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকুরি নেয়। কিছুদিন চাকুরী করার পর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সে মালিকের বিশ্বস্ততার সুযোগ নিয়ে তার অগোচরে কৌশল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হতে নগদ অর্থসহ মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে পালিয়ে যায়। সে ইতিপূর্বে চট্টগ্রাম, ভোলা, কুমিল্লা, গাজীপুর সহ রাজধানী ঢাকার বিভিন্নস্থানে বিভিন্ন নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে একই ঘটনা ঘটিয়েছে বলেও জানায়। মূলত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট হতে গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে সে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় দিয়ে আসছিলো।
উক্ত হত্যাকান্ডটি সে নিজে ঘটিয়েছে এবং এই হত্যাকান্ডের সাথ অন্য কেউ জড়িত নয় মর্মেও স্বীকারোক্তি প্রদান করে সে।
গ্রেফতারকৃত আসামীর বিরদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানানো হয় র্যাবের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে।
বার্তা বাজার / ডি.এস