পানিতে ডুবে মরছে শিশু খালি হচ্ছে মায়ের কোল

বর্ষা এলেই পঞ্চগড়ের গ্রামাঞ্চলে বেড়ে যায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার। একটু সচেতনতার অভাবে একের পর এক শিশুর মৃত্যুতে শুন্য হচ্ছে অনেক মায়ের কোল। ছোট একটি ভুলের কারণে ঘটছে অনেক বড় ধরনের দূর্ঘটনা। তবুও সচেতন হচ্ছেনা গ্রামাঞ্চলের মায়েরা। ফলে মায়ের কোল থেকে একের পর এক আদরের ধন মানিক-রতন চির বিদায় নিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। যেসব এলাকায় নদী-নালা, খাল-বিলের সংখ্যা বেশি সেসব এলাকায় পানিতে ডুবে মরার সংখ্যা বেশি। এহেন অবস্থায় পঞ্চগড়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেইনা। জেলায় পানিতে ডুবে প্রাণ হারানো শিশুদের বয়স ৯ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে। গ্রামে নদী,নালা,পুকুরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এমনটি হচ্ছে বলে ধারনা করছেন সচেতন মহলের নাগরিকেরা। তবে শহরে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা নেই বললেই চলে।

দেখা যায়, পঞ্চগড় জেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনার একটাই কারণ অভিভাবকদের অসচেতনতা। বাড়ির অভিভাবক পুরুষ জীবন জীবিকার তাগিদে বেরিয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে আর গ্রামের সরল-সহজ মায়েরা প্রায়ঃশ তারা শিশুদের খেলতে দিয়ে কিংবা কারো সাথে খেলায় পাঠিয়ে দিয়ে বাসার বিভিন্ন কাজে মনযোগ দিচ্ছেন।

আর এই ফাঁকে শিশুরা বাসা থেকে বাইরে বের হয়ে খেলার ছলে কখনো নদীর পানিতে,কখনো পুকুরের পানিতে,কখনো নালার পানিতে আবার কখনো বালতির পানিতে পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। ফলে পানিতে ডুবে দুনিয়ার বুক থেকে চির বিদায় নিচ্ছে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ শিশু সন্তানেরা।

গত একমাসে পঞ্চগড়ে পুকুর,নদী,নালা ও বালতির পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে ৯ শিশু সহ মোট ১০ জন। জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায় ৪ শিশু ও ৪৭ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী সহ ৫ জন,সদর উপজেলায় ৪ শিশু ও আটোয়ারী উপজেলায় ১ শিশুর প্রাণহানি ঘটে।

পানিতে ডুবে প্রানহানির শিকার হওয়া শিশু ও ব্যাক্তিরা হলোঃ-

১.গত ২৯শে মে তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের মাঝগ্রাম এলাকার ফরহাদ হোসেনের ছেলে মুছাব্বির হোসেনের (৩) বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়।

২.গত ৮ই জুনে শালবাহান ইউনিয়নের বালাবাড়ি এলাকার এমাজ উদ্দীনের ছেলে রাজিউল ইসলাম বাঙালী (৪৭) নামে এক শারিরীক প্রতিবন্ধীর মৃত্যু হয়। সে গরু নিয়ে নদীতে গিয়েছিল গরুকে গোসল করাতো। সেখানে নদীর পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়।

৩.গত ১০ই জুনে শালবাহান ইউনিয়নের শহিদুল ইসলামের ছেলে আরিফ হোসেনের মৃত্যু হয় । সে খেলার সময় পুকুরের পানিতে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
একই দিনে আটোয়ারী উপজেলার তোড়িয়া ইউনিয়নের দুলাল হোসেনের ৩ বছরের ছেলে সিয়াম হোসেনের নালার পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। হাঁসের বাচ্চাদের নিয়ে খেলার সময় এ দূর্ঘটনার শিকার হয় শিশুটি।

৪.গত ১৩ই জুনে সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের ভান্ডারুগ্রাম এলাকার মো. মকছেদ আলীর প্রতিবন্ধী মেয়ে তাবাসসুম জাহান মিম (৭) নালার পানিতে ডুবে মৃত্যু বরণ করে।

৫.গত ১৫ই জুনে সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের নুনিয়া পাড়া গ্রামে সুবল চন্দ্র রায়ের ৫ বছরের ছেলে তুষার চন্দ্র রায়ের নালার পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। খেলার সময় সে বাড়ির পাশের নালার পানিতে পড়ে যায়।

৬.গত ১৭ই জুনে সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের মিঠাপুকুর এলাকার নবীর হোসেনের ৯ মাসের কন্যা নুরী আক্তারের বালতির পানিতে পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। মা শিশু নুরীকে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বাড়ির বাইরে গেলে চেয়ারের পাশে থাকা বালতির পানিতে পড়ে যায় নুরী।

৭.গত ১৮ই জুনে সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের মাহান পাড়া এলাকার সাহিরুল ইসলামের আড়াই বছরের ছেলে আরাফাত ইসলাম রাফি খেলার সময় পুকুরের পানিতে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

৮.গত ১৯শে জুনে তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের বিড়ালজোত এলাকার দুলাল হোসেনের আড়াই বছরের মেয়ে লামিয়া আক্তারের পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়।

৯.গত ২৪শে জুনে তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের সালাফী গছ এলাকার মোক্তরুল ইসলামের ৩ বছরের কন্যা রাজিয়া খাতুনের পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের নাগরিকেরা বলছেন,গ্রামের পুরুষেরা কাজের সন্ধানে বাড়ির বাইরে বের হচ্ছে আর নারীরা গৃহস্থালির কাজ,গরু-ছাগলের খাবার জোগাড় সহ নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে প্রিয় শিশু সন্তানের কথা ভূলেই যাচ্ছেন। আর এই ফাঁকে ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ধরনের একটি দূর্ঘটনা। তাই বর্ষাকালে প্রত্যেক মাকে সচেতন হতে হবে।সন্তানদের চোখে চোখে রাখতে হবে। শিশু সন্তান কোথায় গেল একটু পরপর খোঁজ নিতে হবে সন্তানের মা’কে। পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সচেতন হতে হবে। সবাই একটু সচেতন হলে প্রিয় সন্তানদের আর হারাতে হবেনা কোন মাকে।

কে.এ.স/বার্তাবাজার

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর