করোনা জয়ের ভিন্ন অভিজ্ঞতা জানালেন ব্যাংকার

আমি একজন ব্যাংকার। আমি একজন কোভিড-১৯ পজিটিভ সার্ভাইভার। বাসায় আমরা ৫ জন। আমার দুই ছেলে, এক মেয়ে আর আমার স্ত্রী। ছোট দুটো বাচ্চা থাকার কারণে আমারা শুরু থেকেই প্রচন্ড সাবধান ছিলাম করোনার ব্যাপারে।

ফুল প্রটেকশন নিয়ে আমি ব্যাংকে অফিস করেছি। মাঝে মধ্যে বাহিরে বের হয়েছিলাম বাসার জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য। সেই আমার যখন গা গরম ও শরীর ব্যাথা তখন প্রাথমিকভাবে মাথাতেই আসেনি এটা কোভিডের উপসর্গ হতে পারে।

মে মাসের ২৮ তারিখে টেস্ট করাতে যাই চট্রগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। সকাল ৯টা থেকে সিরিয়াল নাম্বার নিয়ে দুপুর ১টায় সেম্পল দিয়ে বাসায় ফিরি।

গত ০১ জুন কোতোয়ালি থানার একজন এসআই দুপুর ১টার দিকে ফোন করে আমাকে বলেন আপনি কি তানভীর সাহেব বলছেন। আপনি কি কোভিড টেস্ট করিয়েছেন। আমি বললাম জ্বি করিয়েছি। উনি বললেন আপনার করোনা রেজাল্ট পজিটিভ।

সেইদিন থেকে আমি ১৫ দিন হোম কোয়রেনটাইন এ ছিলাম।

আমি বাসার পাশে আলাদা এক রুমে ঔষধ, চশমা, ২/৩ সেট কাপড়, ব্রাশ আর ফোনের চার্জার নিয়ে শিফট হই। সবই প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিল আমাকে নিয়ে, কিন্ত আমি ভয় না পেয়ে মহান আল্লাহ উপর অগাধ আস্থা রেখে সাহস নিয়ে চলতে লাগলাম।

আমার পজিটিভ হবার সাথে সাথে অক্সিমিটার কিনে বাসায় রেখেছিলাম। এন্টিবায়োটিক খেয়ে আমার জ্বর কমে গেছে আমি আশাবাদী হয়ে উঠছিলাম। কিন্ত তার কিছুই হলো না।

আমি ৫ দিন এন্টিবায়োটিক খেয়ে বহু কষ্টে জ্বরকে নিজের নাগালে নিয়ে এসেছি। খেতে পারতাম না, সবকিছু তিতকুটে আর লবনাক্ত লাগতো। আমি গরম পানি দিয়ে কুলি করতে গেলে বমি করে ফেলতাম, তাই গরম পানি খেয়ে নেয়া বেশি প্রেফার করেছি।

মশলা চা (আদা তেজপাতা লং ফোটানো পানিতে চা দিয়ে খেতাম বেশি করে)। ভিটামিন সি (লেবু, মাল্টা- রেগুলার খেয়ে গেছি)।

এখন পর্যন্ত আমি যা যা লিখেছি তার সবকিছুই আমরা জানি মোটামুটি।

কোভিড ভাইরাস একেকজনের উপর এক এক রকম ইম্প্যাক্ট ফেলবে। অনেকে এই সময়টায় পেটের পীড়ায় ভুগেছেন বলে শুনেছি, আমার পেটের ট্রাবল হয়নি আলহামদুলিল্লাহ।

আপনার লক্ষণ নেই মানেই যে আপনি স্বাধীন এবং গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবেন- এটা একটা মারাত্মক ভুল ধারণা। আপনি নিজেও জানবেন না কখন আপনি আরেকজনকে ভাইরাস দিয়ে বসছেন। নিজের শরীরকে বুঝুন, ফিল করুন।

কোন রকম অস্বস্তি বা পরিবর্তন অনুভব করার সাথে সাথে আলাদা করে নিন নিজেকে। কোভিডকে হেলাফেলা করার মত ভুল করবেন না। ব্রিদিং প্র‍্যাক্টিস চালিয়ে গেছি নিয়মিত।

সুগার যদি আগে থেকে কমিয়ে না রাখতাম আর ওজন যদি কমিয়ে নিয়ে না আসতাম কোভিড জার্নিটা জিতে যাওয়া ডিফিকাল্ট হত আমার জন্য, হয়তো ধুঁকে ধুঁকে কষ্ট পেতাম আরো বেশি, মরে যাওয়াও অস্বাভাবিক হতো না।

এই ক্ষেত্রে আমার ছোট্ট একটা সাজেশন হলো- মাথা কিছুটা উঁচু রেখে ঘুমানো বা রেস্ট করবেন। দম আটকে আসার অনুভূতি হবে না, হাতের কাছে পানি/জুস/স্যুপ যা পাবেন তাই রাখবেন, গলা কোন অবস্থায় ড্রাই হতে দেয়া যাবে না।

আলহামদুলিল্লাহ ১৫ জুন আমার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। পরবর্তীতে আবার ১৮ জুন টেস্ট করাই। তাও রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। ব্যাংকে জয়েন করার জন্য ২বার নেগেটিভ আসতে হয়।

কোভিড পজেটিভ এর স্ট্রেস যতটা না শারীরিক, তার চাইতে অনেক বেশি মানসিক। আমি আমার লেখার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে চাই এই বলে, খুব সাবধানে থাকুন,কিভাবে ইনফেক্টেড হলেন এইটা নিয়ে কূল-কিনারা খুঁজে সময় নষ্টের দরকার নেই, লুক ফরোয়ার্ড।

নিজেকে সেভ করুন, ফ্যামিলির বাকি সবার টেক কেয়ার করুন, হাত ধোয়া, স্যানিটাইজ করা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কোন বিকল্প নেই। গরম পানি খান সারাদিনে গোটা দশেকবার, এটা একটা রেগুলার ফ্যামিলি ইভেন্ট ক্রিয়েট করুন, সবাই একসাথে বসে গরম পানি খান। আমি এই জীবনে আর কখনো ঠান্ডা পানি ছুঁয়ে দেখব না বলে শপথ করেছি। গরম পানি ভালো না লাগলে মধু অ্যাড করেন, আদা কুচি অ্যাড করেন।

আমি সর্বোপরি শোকরগুজার করি আল্লাহতালার, কারন আমি এরকম একটা অসুখে ভুগব, এটা নিশ্চয়ই তার প্ল্যানের অংশ ছিল। এবং আমি সব অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলার সাহস রাখি৷ শুধু বলব, করোনারোগীর সাথে এমন কোন ব্যবহার আপনারা করবেন না, যেন মনুষ্যত্বের ওপর থেকেই তার ভরসা উঠে যায়।

আমার এত বড় পোস্ট পড়ে যদি আপনার এতটুকু উপকার হয় তাহলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব। সবার কাছে অনুরোধ, যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলেন দেরি না করে, ভয়-লজ্জা, কি করব, কি হবে- এসব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন। আপনার প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের পাশে দাড়ান, হেল্প করেন, খাবার রান্না করে পাঠান, জিজ্ঞেস করেন কোনভাবে তাদের কোন সাহায্য করতে পারেন কিনা। আমরা এমন অনেকেরই সাহায্য পেয়েছি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সবার প্রতি।

আমার জন্য আপনারা দোয়া করবেন, যেন হাই পাওয়ার এন্টিবায়োটিক এর ধকল আমি কাটিয়ে উঠতে পারি, আগের মত সুস্থ সবল হয়ে চলা ফেরা করতে পারি।

লাস্ট একটা মেসেজ। আমিসহ আমার পুরা ফ্যামিলির জন্য আপনারা যারা দোয়া করেছেন, মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছেন, আত্মীয়-স্বজন, অফিস কলিগ, স্কুল বন্ধুরা আপনাদের সবার এই ভরসাটুকু অনেক দরকারী ছিল। এগুলো আমাদের জন্য মনোবল বাড়ানোর কাজ করেছে। করোনা রোগীর জন্য মানসিক শক্তিটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটার জোগান দিয়েছেন আপনারা। টাকা পয়সা দিয়ে আপনি সবকিছু কিনে নিতে পারবেন, কিন্ত মানুষ এর মমতা আর ভালোবাসা তো টাকা দিয়ে কেনা যায় না।

লেখকঃ তানভীর রশীদ আবীর,
সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট,
এবি ব্যাংক লিঃ, আন্দরকিল্লা শাখা, চট্রগ্রাম।

বার্তা বাজার / ডি.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর