জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ২৩ টি সংগঠন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল ও গ্রেফতারকৃত সকলের মুক্তি দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে। রবিবার ২১ জুন এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়- চলমান মহামারীর কালে যখন বাংলাদেশের নাগরিকদের হাসপাতালের সামনে চিকিৎসা সেবা না পেয়েই মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে, ঠিক তখনই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক কিংবা শিল্পী সবাইকেই বাঁধা পড়তে হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শিকলে।
‘কটূক্তি’, ‘গুজব’, ‘মিথ্যা রটানো’ ইত্যাদি নানা অজুহাতে নিজেকেই সত্যের একমাত্র বাহক মনে করা সরকার তার নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র যন্ত্রকে নিয়োজিত করছে ভিন্ন ভিন্ন সত্য উচ্চারণের কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের তাঁবেদারিতে এখন পিছিয়ে নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। মাঝে মধ্যে বরং তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সিরাজুম মুনিরা, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহিরের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদেরকে নিয়ে কটূক্তি করার ‘অপরাধে’ মামলা দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সিরাজুম মনিরাকে ইতোমধ্যেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী জাহিদুর রহমানকেও এই আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জি কে সাদিকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ভুলে যাইনি, এমনি এক কণ্ঠরোধকারী ‘ছাত্র শৃক্সখলা বিধি’ আমাদের ঘাড়েও ঝুলে আছে, যা দিয়ে যখন তখন স্বাধীন মত প্রকাশকারীকে হয়রানী করা যায়।
তার নজিরও আমরা দেখেছি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার নাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত ব্যবস্থাপক মাত্র। তাই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন এবং সমালোচনা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। এক্ষেত্রে কটূক্তি বনাম সুউক্তির বিভেদ তৈরি করে কটূক্তি দমন করতে চাওয়ার বাসনা গণতান্ত্রিক অধিকার বিরোধী।
‘জনপ্রতিনিধি’ কিংবা ‘মন্ত্রীর’ সমালোচনা করার অধিকার প্রজার কাছ থেকে হরণ করার মানে হল জনগণের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকে হরণ করা, যা গণপ্রজাতন্ত্রের নীতিবহির্ভূত। আমরা, নিম্নসাক্ষরকারীগণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার ও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নাগরিক তথা জনগণের মতামতকে ‘রাষ্ট্র-বিরোধী’, ‘জননিরাপত্তার হুমকি’, ‘অশান্তি তৈরির চেষ্টা’ ইত্যাদি হিসেবে আখ্যায়িত করে সচেতন জনগণকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এই কূটচক্রকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা প্রত্যাখ্যান করছি অন্যায় আইন ও বিচারবহির্ভূত পুলিশি ও সরকারি কর্মকাণ্ড।
বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে গ্রেফতার দেখিয়ে ‘গুম’ করে ফেলার ঘটনারও আমরা নিন্দা জানাচ্ছি। স্বাধীন গবেষণা ও চিন্তার সূতিকাগার বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তা ও মতপ্রকাশ করায় যেসব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে,আমরা অবিলম্বে তাদের সকলের শাস্তি প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।
একইসাথে আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারকৃত সকল শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী ও লেখকের মুক্তি দাবি করছি। জনগণের মতামত ও বিবেককে কারারুদ্ধ করতে চাওয়া, মুক্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণকারী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আমরা বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।
কে.এ.স/বার্তাবাজার