জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির জাবিসাস আলাপনের ৩য় পর্বে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থী বান্ধব বাজেটের চিত্র ফুঠে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের ৬৭% বেতন ভাতা ও প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হয়। বাকী ৩৩% কে কীভাবে শিক্ষার্থীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে ফুঠে উঠেছে সুনিদিষ্ট রূপরেখা।
সিনেটরদের ভাবনায় ফুটে উঠেছে আসন্ন বাজেটে কোন কোন ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমান বাড়ানো দরকার এবং কোন কোন ক্ষেত্র থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য আয় বাড়ানো যায় ।
জাবিসাসের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলমের সঞ্চালনায় (১৫ জুন) রাত নয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন সিনেটর বাজেট নিয়ে তাদের ভাবনা তুলে ধরেন।
পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমগীর কবির মনে করেন,বর্তমান দুর্যোগকালীন সময়কে বিবেচনা করে বাজেট প্রনয়ণ করতে হবে। গতবছর বাজেটের পরিমান ছিল ২৫৯ কোটি টাকা । এবার তা বেড়ে ২৭৮ কোটি টাকা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে মোট বাজেটের ৬৭% চলে যায় । বাকী থাকে ৩৩% । আমাদের এই ৩৩% বাজেটকে শিক্ষার্থীবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।
প্রথমে নজর দিতে হবে লাইব্রেরীর দিকে। গতবছর লাইব্রেরীতে বাজেট ছিল ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা ।যেখানে বই কেনা, বই বাধাই করা এবং ছাত্র সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে ব্যয় হয় ৩৫ লক্ষ টাকা। বর্তমান বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ বেশি রাখতে হবে।
তারপর নজর দিতে হবে পাঠ্য বহির্ভূত বিষয় যেমন ( খেলাধূলা , টিএসসি কেন্দ্রীক সামাজিক সংগঠন, ব্যায়ামাগার, শারীরিক শিক্ষা বিভাগ ) এই বিষয়গুলোর উপর। কেননা এই বিভাগগুলো পরিপূর্ণ হলে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা অন্যান্য সেক্টরে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পাবে। তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। যা বর্তমানে সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে। গতবছর এই বিভাগে বাজেট ছিল ৩০ লক্ষ টাকা । বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সকল বিভাগে বাজেটের পরিমান বহুগুন বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
গতবছর স্কলারশীপের বাজেট ছিল মাত্র ২ কোটি ৮৮ লক্ষ । যা প্রত্যেক শিক্ষার্থী দিয়ে ভাগ করলে অতি নগন্ন পরিমান অর্থ দাড়ায়। এই বাজেটে এই দিকটার কথা ভাবতে হবে।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে চিকিৎসা খাত । এই খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখতে হবে। মেডিকেলে গতবছর বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ২৬লক্ষ টাকা । যার মধ্যে ৩১ লক্ষ টাকা ঔষুধ ও ষন্ত্রপাতি মেরামত ও ক্রয় বাবদ ব্যয় হয়। এই ৩১ লক্ষকে অনেকগুন বাড়াতে হবে। সকল শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্য বিমান আওতায় আনতে হবে।
অপরদিকে শিক্ষক সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষনা খাত । এই খাতে গতবছর বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১.১৫%। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০০ জন শিক্ষকদের দিয়ে ভাগ দিলে যে পরিমান অর্থ দাড়ায় তা দিয়ে গবেষনা সম্ভব নয়।এর জন্য আমাদের এই খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেইসাথে ব্যাক্তিগত এবং প্রতিষ্ঠানিক ভাবে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে গবেষনার কাজকে সামনে দিকে নিয়ে যেতে হবে।
গতবছর ওয়াজেদ মিঞা গবেষনা কেন্দ্রের বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা । বেতনসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক ব্যয় করে সামান্য পরিমান অর্থ থাকে যা দিয়ে গবেষনা সম্ভব নয় । তাই এই কেন্দ্রে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
পরিবহন সেক্টরে আমাদের ব্যয় অনেক বেশি প্রায় ৮ কোটি ৪৯লক্ষ টাকা । বর্তমানে পরিস্থিতির বিবেচনায় এই সেক্টরে বাজেট কমিয়ে আনতে হবে।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। যেন টিউশন ফির মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থী বিষয়ক খাতসমূহ সমৃদ্ধ করতে পারি।
বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের মাধ্যমে আমাদের ফান্ড তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে। যারা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে প্রথম দ্বিতীয় বছরে চাকরী পায় নি । তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য এর মাধ্যমে সহায়তা করতে হবে।
সর্বশেষ অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প যেন স্বচ্ছভাবে হয় আমাদের সকলকে এই দিকে নজর দিতে হবে। কারণ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান হবে যাবে।
দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন,দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০১৭ সালে সিনেট নির্বাচন হয়েছে। এই সিনেট নিয়ে অনেকেরই অনেক আশা ছিল । কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতায় আশানুরূপ ফলাফল পাই নি। প্রথম সিনেট অধিবেশন বাতিল হয় প্রশাসনের কারণেই। বর্তমান বাজেটে সিনেটরদের সাথে বৈঠক হবে কীনা সেই বিষয়ও অনিশ্চিত। তারপরও বর্তমান বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার আমাদের শিক্ষার্থীদের উপর ।
বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় সবার আগের আমাদের শিক্ষার্থীদের টিকিয়ে রাখতে হবে। অন্তত ৪ -৫ মাস তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।যেন তারা ড্রাপ আউট হয়ে না যায়। শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।শিক্ষার্থীদের শিক্ষার নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার উপর জোর দিতে হবে । তাদেরকে বর্তমান সঙ্কটময় সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের তথ্য কালেক্ট করতে হবে। সবাইকে এক প্লাটফর্মে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের নেট খরচ দিয়ে অনলাইন ক্লাসে সংযুক্ত করতে হবে।
যদি সঠিক সময়ে শিক্ষার সাথে সংযুক্ত না করতে পারি তাহলে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী ঝড়ে যাবে।
অন্যদিকে ইন্টারনেট ভাতার বরাদ্দ কমাতে হবে।স্কুল এন্ড কলেজে প্রতি বছর ৯ কোটি টাকা ব্যয় হয় । আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটিকে এমপিও ভুক্তি করার উপর নজর দিতে হবে। তাহলে এখানকার বরাদ্দকৃত অর্থ শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করতে পারবো। এছাড়া ইভিনিং কোর্স, সান্ধকালীন কোর্সের টাকা যথাযথ ভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করতে হবে।
এছাড়া সিনেটরদের মেয়াদ শেষ,ছাত্রদের সহবস্থান নিশ্চিত,লাইব্রেরী, গবেষণা,চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়ার প্রস্তাব পেশ করেন।
জনতা ব্যাংকের মহাব্যাবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গতবছরের সিনেট নির্বাচনের বেশিভাগ ইশতিহারই বাস্তবায়ন হয়নি।৭৩ এর অধ্যাদেশে দেশের ৪ টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণ গনতন্ত্র চর্চা করা সুযোগ দেওয়া হয়েছে ।
অগনতন্ত্রের চর্চা যেন না হয় এজন্য সিনেট,সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, হায়ার স্টাডিস বিভাগ সহ বিভিন্ন বিভাগকে তাদের কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল । প্রত্যেকের কাজ হবে আলাদা। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো দেখার কথা ট্রাজারারের। কিন্তু আমরা শুনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসায় ছাত্রলীগের টাকা ভাগাভাগির করা।টাকা ভাগাভাগি হলে তো ট্রাজারারের বাসায় হওয়ার কথা ছিল ! এর অর্থ কেউ তার কাজ করছে না বা করতে পারছে না । সবাই একজনের উপর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। সিনেটরদের ভোটে ভিসি নির্বাচন হওয়ার কথা কিন্তু তা হয়নি ।
সিনেটরদের বিশ্ববিদ্যালয়কে সেশনজোট মুক্ত, র্যাগিং মুক্ত , আবাসন সমস্যা দুর করার প্রতি যে ভূমিকা তাও প্রশ্নবিদ্ধ। এজন্যই প্রতিবছর গতানুগতিক বাজেট প্রনয়ণ হচ্ছে।
পার্শবর্তী ছোট দেশ নেপালের ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা করোনা শুরু হওয়ার পরপর সীমান্তে গিয়ে দেশে প্রবেশকারীদের চেকআপ করেছে ,গ্রামে গ্রামে মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করেছে। অথচ আমাদের এশিয়ার বৃহত্তর বিজ্ঞান গবেষনাগার রয়েছে । যেখানকার পিসিআর নষ্ট। যা ভাল করার কোন উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। বর্তমান বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয় দেশ ও শিক্ষার্থীদের জন্য কী করতে পারে তা নিয়ে ভাবতে হবে।
বর্তমান বাজেটে ২৭৮ কোটি টাকার মধ্যে ২৮ কোটি টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আয় করা হয়েছে।এই ২৮ কোটি টাকা শিক্ষার্থীদের জন্যই ব্যয় করতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য বিমার আওতায় আনতে হবে। গবেষনায় যে ৩ কোটি টাকা দেওয়া হয় তা শিক্ষকদের মুখ চেয়ে দেওয়া হয় কিনা এই বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যলয়ের পিএইচডি ,শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের পদন্নতি নিয়ে যে দূর্নীতি হয় তা বন্ধ করতে হবে। এই বিষয়গুলোতে ভোটের রাজনীতি ,স্বজনপ্রীতি দেখালে কখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি সম্ভব নয়।
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান মনে করেন, বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, গাছাড়াভাব, ব্যর্থতাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।সালাম বরকত হলে ছাগল চড়ানোর পরিবেশ তৈরি করেছে। আন্দোলনকারী ও প্রশাসনের মুখোমুখি বৈঠকে যে হল নির্মানের কাজ স্থগিত করা হয়েছিল সেখানে প্রশাসন নিজের স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিয়ে এই দূর্যোগ পরিস্থিতিতে কাজ শুরু করেছে। এই বিষগুলোকে কঠোর হাতে দমন না করার ফলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একচোখা নীতি- সবসময় সিনেটদের এড়িয়ে বাজেট পেশ করতে চেয়েছে। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতিতে যদি সিনেটরদের কাছে জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি না করে একা একা বাজেট পাশ করে তাহলে উপাচার্যের উপর আনীত দূর্নীতির অভিযোগকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় আগষ্টের পর খুললে বর্তমান বাজেটে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বাবদ্দ রাখতে হবে। অধিকতর উন্নয়নের অপেক্ষায় না থেকে লাইব্রেরীকে অবশ্যই পড়ালেখার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। লাইব্রেরীর বিকল্প অলটারনেটিভ জায়গা ( ক্লাসের পর বিভাগের রুমে) ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শিক্ষকদের পদন্নতিতে স্বচ্ছতা দেখাতে হবে। প্রফেসর থেকে এ্যাসিসটেন্ট প্রফেসরে উন্নতি হওয়ার যে মাধ্যম- এই মাধ্যমকে উন্নত করতে হবে। তাহলে সর্বশেষে আমরা একজন মানসম্পন্ন প্রফেসর পাবো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনায় ব্যয় মাত্র সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা । এই খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নিজেদের আনুগত্য বাহিনী তৈরি জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
আবাসিক হলগুলোতে ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয় ।তার সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। এবং বর্তমানে সেই টাকা শিক্ষার্থীদের প্রণোদনা হিসেবে দিতে হবে। হল ডাইনিং সচল করতে হবে।
জাবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাসান জামিল অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের উপর জোর দেয় । তিনি বলেন, এই প্রকল্প যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়েল সকল সমস্য দূরীভূত হবে।
তারপর মেডিকেল সেন্টারকে ২৫ শয্যা বিশিষ্ট মিনি হসপিতালে পরিনত করতে হবে। বস্তায় বস্তায় পিএইচডি পিএইচডি খেলা বন্ধ করে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর উপর জোর দেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ রক্ষার জন্য ব্যাঙের ছাতার মত হলের সামনে দোকান বসিয়ে প্রভোস্টদের ভাড়া আদায়ের মানসিকতা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।
ভর্তি পরিক্ষার সময় অর্জিত টাকা শিক্ষকরা ভাগবাটয়ারা করে নেয় । এখান থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে।এছাড়াও তিনি আধুনিক লাইব্রেরী, আবাসন সমস্যা নিরসনের প্রতি জোর দেয়।
বার্তা বাজার/পি.বি