বাংলাদেশে সংখ্যালঘুর মানবাধিকার

ইমতিয়াজ মোর্শেদ : সহজ ভাষায় মানবাধিকার হচ্ছে মানুষের সহজাত অধিকার যা যে কোন মানব সন্তান জন্মলাভের সাথে সাথে অর্জন করে। মূলত যে অধিকার মানুষের জীবন ধারনের জন্য,মানুষের যাবতীয় বিকাশের জন্য ও সর্বপরি মানুষের অন্তরনিহিত প্রতিভা বিকাশের জন্য আবশ্যক তাকে সাধারনভাবে মানবাধিকার বলা হয়। জীবনধারণ ও বেঁচে থাকার অধিকার এবং মতামত প্রকাশের অধিকার,অন্ন বস্ত্র ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার,ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অংশগ্রহণের অধিকার প্রভৃতি সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে মানবাধিকার বলতে পারি।

বিখ্যাত আইনবিদ Louts Henkin তাঁর ”The International Bill of rights” গ্রন্থের ভূমিকাতে মন্তব্য করেছেন যে, ”Human Rights is the idea of our time” অর্থাৎ মানবাধিকার হলো বর্তমান কালের ধারণা। মানবাধিকার সম্পর্কে পশ্চিমা প্রায় সকল আইনবিদের বিশ্বাস এ রকমই।

১৯৪৫ সালে প্রণীত জাতিসংঘ সনদ হলো প্রথম দলিল যেটা নাকি মানবাধিকারের ধারণাকে আন্তর্জাতিককরণ (Internationalised) করেছে যদিও এই সনদের কোথাও মানবাধিকারসমূহের উল্লেখ মাত্র করা হয়নি। তারপর আসে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর যে দিনটি বিশ্বমানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালের এ দিনে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র তৈরি করা
অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন যে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর , সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের বিষয়ে একটি কমিশন হয়েছিল কিন্তু তারা যে সুপারিশ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন ও যে সুপারিশ করেছে , তার কোনটিই সরকার বাস্তবায়িত করেনি। সে জন্যে তিনি সরকারি ব্যর্থতার কথা ও বলেন। ড রহমান জোর দিয়েই বলেন যে এ ধরণের নির্যাতন নিপীড়ন বন্ধ করতে হলে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের আওতায় সরকারকে ব্যবস্থা নিতেই হবে।

২০০১ ও ২০১১ সালের আদম শুমারীর জেলা ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী , ১৫টি জেলায় হিন্দু সংখ্যালঘুরা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব জেলার হিন্দুরা অন্য জেলায় চলে গেছে, সেজন্য এমনটি ঘটেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলে অন্য কথা । কর্মকর্তাদের ভাষায়, এরা হলেন মিসিং পপুলেশন বা হারিয়ে যাওয়া মানুষ। এ মন্তব্যের অর্থ হলো দেশ ত্যাগ করা।

এছাড়া শত্র সম্পত্তির কারনে সংখ্যালঘুরা আরেক ধরনের নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে প্রায় ৫০ বছর ধরে। বর্তমান সরকার এ আইনের সংশোধন এনে নির্দিষ্ট কোর্টকে দায়িত্ব দিয়েছেন, যারফলে সুফল পেতে অনেক কাঠখর পোড়াতে হবে হিন্দুদের। একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না যদি বলা হয়, ধারাবাহিকভাবে একটি চক্রের হীন চক্রান্তের জন্যেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর এধরনের নির্যাতন এবং আক্রমণ চলছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন হলো তাদের অস্তিত্বকে বিলোপ করার চেষ্টা,তাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করা,ধর্ষন করা,সংখ্যালঘু নির্যাতন হলো আওয়ামীলীগকে ভোট দেওয়ার অজুহাতে ভিটেবাড়ী থেকে এক কাপড়ে নামিয়ে দেয়া,এমনকি বাড়ীঘর সম্পত্তি বিক্রী করার সময়টুকু পর্যন্ত না দেওয়া বা বিক্রী করতে পারলেও অনেকের কাছ থেকে সেই টাকা ছিনিয়ে নেয়া।

বাংলাদেশে গত দুই বছরে হিন্দুদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন একটি প্রতিবেদনসর্বোচ্চ শেয়ার করুন সারাদেশেঃ ১] ৭০৬ জন হিন্দু মেয়েকে জোরপূর্বক ইসলামধর্মে ধরমান্তারিত করা হয় | ২] ১৬৯৯ টি হিন্দু মন্দির ভাঙ্গা ও আগুন লাগানো হয় | ৩] ৩০২ জনকে হত্যা করা হয় | ৪] ২৯২ জন হিন্দু মহিলা ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয় | ৫] ৫০৫০ জন হিন্দুকে বাড়ি ছাড়া করা হয় | ৬] ৩১২৮ টি হিন্দু ব্যাবসা প্রতিস্তানে হামলা করা হয় | ৭] ২৯০০ জন হিন্দুকে শারীরিকভাবে আহত করা হয় | এরকম হাজার ঘটণা প্রতিনিয়ত হচ্ছে ,বাংলাদেশের কোনও মানুষের এগুলো চোখে পাড়ে ণা | হিন্দু নিধনে সবাই ভাই ভাই ! আর ১০ বছরে এই দেশে হিন্দু থাকবে না; এটা নিশ্চিত তবে এদেশের সংখ্যাগুরুরা এর দ্বায় এড়াতে পারবে না !
বাংলাদেশে পাঁচই জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর , সংখ্যালঘুদের উপর এবং সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা যায় হিন্দুদের উপর আক্রমণ হয়েছ দেশের বিভিন্ন স্থানে। যশোরে , দিনাজপুরে এবং অন্যান্য জায়গায় হিন্দুদের সম্পত্তি , উপার্জনের উপায় এবং বাসস্থান ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। নারী/পুরুষ লাঞ্ছিত হয়েছেন , হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু লোক গৃহচ্যূত হতে হয়েছে এমনকি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে অনেক জায়গায় । তাদের উপর এই হামলার কারণ এবং এ ধরণের আক্রমণ রোধ করার উপায় সম্পর্কে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্য্লয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক, ড মিজানুর রহমান ভয়েস অফ আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে এটি কেবল রাজনৈতিক সংঘাতের জন্যে ঘটেনি । রাজনীতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কট্টর উগ্রপন্থিরা হিন্দু তথা সংখ্যালঘুদের উপর এই হামলা চালিয়েছে। এটি বস্তুত সন্ত্রাসবাদেরই অংশ এবং একটি দেশের জন্য বিপদজনক।

বাংলাদেশে মানবাধিকারের প্রশ্নটি আসলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক গুলো বিষয়ের উপর দৃষ্টি দিতে হয়। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বা সমালোচিত বিষয় হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতন । বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে এক প্রকার বেআইনী হত্যাকাণ্ড, যা সাধারণত রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক ব্যক্তিত্ব বা অপরাধীকে রাষ্ট্রপ্রদত্ত আইনত বিচারের পূর্বেই হত্যাকরা । অর্থাৎ অভিযুক্তকে কোনোপ্রকার আইনি সাহায্য নিতে দেয়া হয়না।
বাংলাদেশে মানবাধিকার শব্দটি শুধুমাত্র আলঙ্কারিক অর্থেই ব্যবহার করা যায়, বাস্তবিক অর্থে আমরা কতোটা মানবাধিকারহীন একটি জাতি হিসেবে তা বলাই বাহুল্য। যেখানে জীবনের নিরাপত্তাহীনতা অবশ্যম্ভাবী, সেখানে মানবাধিকার বিলাসিতাই বৈকি! রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাওয়া। গত দুই দশকের কথা ধরলে প্রত্যেকটি সরকারই এই পরিস্থিতির উন্নয়নে সমানভাবে ব্যর্থ। এ দায়ভার এককভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকারকেই নিতে হবে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন এর আরেকটি প্রকৃষ্ট উদাহরন। যেভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছেন তাতে নিকৃষ্টভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবতা আর মানবাধিকার। যা সংবিধানের অনুচ্ছেদ- ২৭, ২৮, ৩১, ৩২, ৪১ এবং সার্বজনীন মানবাধিকারের অনুচ্ছেদ- ১, ২, ৩, ৫, ৭ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক বৈষম্যহীন সমাধিকার লাভ করবে এবং আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হবে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ- ২৭ এ বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।“ অনুচ্ছেদ-২৮ এ বলা হয়েছে, ধর্ম কিংবা প্রভৃতি কারনে কোন নাগরিকের সাথে বৈষম্য করা যাবে না। এসব অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রত্যেক নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় লাভ করবে। অথচ সরকার এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুরা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। শুধু এ দুটি বিষয়ই নয়, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরন করছে। যা একটি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিচায়ক হিসেবে কাজ করে। প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারকেই রাখতে হবে অগ্রণী ভূমিকা।

বাংলাদেশের প্রতিটি হিন্দু পরিবার এক ধরণের হুমকির মুখে থাকে। আর এই তিনদিন আগে যশোরে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটল। পরিবারটি ভিটে-মাটি ছেড়ে চলে গেল। থানা, পুলিশ, কোর্ট সেখানে যেন অসহায়। ওপরে যতই সমন্বয়ের কথা বলা হোক না কেন, কার্যক্ষেত্রে এসে কেউই আসলে সাহায্য করতে পারেন না। অর্পিত সম্পত্তি কেউ কি যথাযথ ভাবে ফেরত পেয়েছেন? কোর্ট ন্যায্য অধিকারীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন দখলদারকে কেন যেন ওঠাতে পারেন না।
ভবিষ্যতের এই অবক্ষয় ধারাকে কি সামলানো যাবে? গতি জড়ত্বে যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে তার কি আর শেষ আছে? উচ্চ হারে মাদ্রাসা শিক্ষা বোধহয় জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিভাজনকে আরো প্রকট করে তুলছে। বাংলায় ধর্ম সমন্বয়ের একটা syncretist ধারা বজায় ছিল, এর একটা প্রমাণ হল আমাদের বাউল ফকিরদের গানের মধ্যে দিয়ে। এই বাংলার বেশীরভাগ হিন্দু, মুসলমানের পূর্ব পুরুষ একই ছিল। হতে পারে ২০৫১ সনের উন্নত সমাজে যেমন সবার নাগরিক ও সম্পত্তি আধিকার বজায় হবে তেমনই একটা syncretist ধারা সবাইকে এক করবে। তবে ইতিহাসের পরিসংখ্যানের চাকা এই সব ভাল চিন্তার ধার ধারে না। মনে হয় আজ থেকে ৪০ বছর পরে এই ধরনের আলোচনার কোন অর্থ থাকবে না।

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।