মুক্তিবুদ্ধি চর্চা, সংখ্যালঘু এবং বাংলাদেশ

ইমতিয়াজ মোর্শেদ: মৃত্যুর এক হিমপুরী এখন বাংলাদেশ নামের ব-দ্বীপ ভূখণ্ডটি। সবুজ এবং কোমল একটা দেশ আজ পরিণত হয়েছে এক নৃশংস বধ্যভূমিতে। বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষই আজ বিপন্ন এবং অসহায়। প্রতিদিন রক্তের লাল স্রোত বয়ে চলেছে এর গা বেয়ে। খুনের নেশায় পাওয়ায় উন্মত্ত একদল লোক অপরিমেয় ঘৃণা বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এর অলিতে-গলিতে। তাদের সেই ঘৃণার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে কোমল সব দেহ, অসাধারণ সব মেধা, অনন্য সব মানুষগুলো।
একদল নরপিশাচ পৈশাচিক উল্লাসে ধারালো চাপাতির হিংস্রতা দিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে সবকিছুকে। দুর্বিষহ এবং পচা দুর্গন্ধময় এক সময় এসে পড়েছে হঠাৎ করেই আমাদের সামনে। একে মোকাবেলা করার জন্য যে প্রস্তুতি, যে শক্তিমত্তা আমাদের থাকা উচিত, তা নেই। ফলে, গভীর হতাশা এবং হাহাকারে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া আর কিছু করারও কোনও বিকল্প কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। হিংস্র চাপাতিওয়ালাদের হাত ধরে গোটা দেশ এবং সমাজ দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে অন্তহীন এক আঁধার রাজ্যের কেন্দ্র অভিমুখে।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ব্লগার হত্যা ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় আটকের ঘটনায়,লেখালেখি এবং মতপ্রকাশের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে অজানা আতঙ্ক। আর তাই তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার অবারিত যে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এর প্রভাব এখনই বোঝা না গেলেও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে এ ধরণের শৃঙ্খলিত বোধ দেশকে ক্রমাগত পিছিয়ে দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তা চর্চাকারীদের জন্য তৈরি হয়েছে এক উভয় সংকটময় পরিস্থিতি। এর ফলে তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতির মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বাধীন চিন্তার যে চারণভূমি তৈরি হচ্ছিল তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অনেকখানি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলমান থাকলে তা বাংলাদেশের চলমান যে অগ্রগতির ধারা তা তাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে অনেকইভাবেই।বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধির চর্চার উপর বারবার আঘাত এলেও এই অপশক্তিকে গ্রেপ্তারে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেই।“ফ্রান্সে হামলার পর আমরা দেখলাম, সে দেশের সরকার খুব দ্রুতই সন্দেহভাজন হিসেবে কয়েকজনকে ধরে ফেলল। অথচ বাংলাদেশে মুক্তমনাদের হত্যায় সরকার কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

আই.এস. নামের সংগঠন থেকে এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ। বাংলাদেশের সরকার ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ লেখক, প্রকাশক, আস্তিক, নাস্তিক, ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, বিদেশী, শিয়া, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান, বিধর্মী বা যে কোন প্রগতিশীল মানুষকে পরিকল্পিত উপর্যুপরি খুনের সাথে আই.এস. এর সংশ্লিষ্টতা বা অস্তিত্ব স্বীকার করতে রাজী না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী বলে দাবীদার সরকার পক্ষের লোকেরা সমস্বরে এসমস্ত সহিংস ঘটনা সমূহকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে রটনা চালিয়ে তাঁরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। তবে, কাকে ভয় বা খুশি করার জন্য এই অস্বীকার, তা আমার বোধগম্য নয়। আমেরিকার মদদপুষ্ট সৌদি রাজতন্ত্রের সামরিক জোটের সাথে বাংলাদেশ সরকারের গাঁটছড়া বাধার ফলশ্রুতিতে আই.এস. এর সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করার পেছনের কারণ কিনা কে জানে?

বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। কিন্তু দেশের জনসংখ্যার সিংহভাগ মুসলিম। সমকামী সম্পর্ক এখানে অবৈধ। অনেক সমকামী কর্মীকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।বাংলাদেশে জঙ্গিরা এ প্রথম এলজিবিটি কর্মীদের টার্গেট করলো। এ ডাবল-মার্ডারের ঘটনা সেই ইঙ্গিতই দেয়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে, আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলো ৬ নাস্তিক ব্লগার ও ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে।

গত ২৫ এপ্রিল মার্কিন সহায়তা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট-ইউএসএআইডির কর্মী জুলহাজ মান্নান ঢাকায় তার নিজ বাসায় খুন হন। হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ওই সময়ে জুলহাজার বাসায় থাকা তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয় (২৬)। গত ২৩ এপ্রিল রাজশাহীতে দুর্বৃত্তের চাপাতির আঘাতে খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন নাজিমুদ্দিন সামাদ নামের আইনের এক শিক্ষার্থী। নিজের ফেসবুকে তিনি ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনামূলক লেখালেখি করতেন।

২০১৫ সালে বাংলাদেশে পাঁচজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও প্রকাশক খুন হন। খুনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগ মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়ও রয়েছেন।

এসব বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড একটা ভয়ানক বার্তা প্রদান করে। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের জন্য নীরবতা, ভয় ও চরম বিপদের আবহ বিরাজমান। মুক্তমনা, ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্মীয় ও লৈঙ্গিক সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে ইসলামী মৌলবাদীদের সাম্প্রতিক প্রবণতা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছেছে। একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ; যাদের একটি সমন্বিত জাতীয় পরিচয় রয়েছে এবং সহনশীলতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তাদের জন্য এটা অপ্রত্যাশিত।

ভিন্নমতের মানুষের ওপর হামলার সর্বশেষ শিকার জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব রাব্বী তনয়। তাদেরকে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে খুন করা হয়। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল অ্যাসিসটেন্ট জুলহাজ মান্নান। হত্যার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলামের নামে খোলা টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে এই দায় স্বীকারের বার্তা প্রচার করা হয়। বাংলা ও ইংরেজিতে দেয়া টুইট বার্তায় আনসার আল ইসলামের ‘দুঃসাহসী মুজাহিদীনরা’ সমকামীদের গুপ্ত সংগঠন ‘রূপবান’-এর পরিচালক জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু সামির মাহবুব তনয়কে হত্যা করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশে যে কোনো ধরনের নির্বাচন ও রাজনৈতিক টানাপোড়নের প্রথম শিকার হন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এর কারণ কি? সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অন্যতম হাতিয়ার। এটি সবচেয়ে বড় কারণ। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো হীনস্বার্থ উদ্ধারের জন্য, সংখ্যালঘুদের সহায় সম্পত্তি লুটপাট ও ভোগ-দখল করার জন্য, সংখ্যালঘুদের দেশ ছাড়া করার জন্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক অযুহাতে সংখ্যালঘুদের উপর বিভিন্ন সময়ে নির্মম নির্যাতন, অত্যাচার, খুন, ধর্ষন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ সহ অনেক মানবতা বিরোধী কাজ করে থাকে। এটা এতোটাই নির্মম, পাশবিক, হৃদয় বিদারক ও মর্মস্পর্শী যে, তখন আর কিছুতেই মানুষ হিসেবে দাবী করা যায় না যে, বাংলাদেশ একটি ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। বরং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বাংলাদেশ একটি বর্বর, অসভ্য, সাম্প্রদায়িক, অশিক্ষিত মুসলিম রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক টানাপোড়নে বিশেষ করে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব সময়ই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা একটি অভ্যাসের মত ঘটনা। এই ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সরাসরি ইন্ধন থাকে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার বদলে এক ধরেনর রহস্যময় শীতলতাও একটি বড় কারণ। মানুষের জন্য মানুষ সৃষ্ট এমন দুর্যোগ, মানুষের জন্য মানুষ সৃষ্ট এমন দুর্ভোগ, মানুষের জন্য মানুষ সৃষ্ট এমন রাজনৈতিক নির্যাতন, মানুষ সৃষ্ট এমন মানবতা বিরোধী অপরাধ, এটা কেবল পৃথিবীর অসভ্য, বর্বর, অশিক্ষিত, সাম্প্রদায়িক দেশেই শোভা পায়। আর এই একই ঘটনা যখন বারবার বাংলাদেশে ঘটছে, সবার চোখের সামনে ঘটছে, প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতি ও উপস্থিতিতে ঘটছে, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সরাসরি ইসারায় ঘটছে, সম্পত্তি, বাড়িঘর, বাগান ও জমি দখলের চক্রান্তে ঘটছে, তখন একথাই গভীরভাবে সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশকে কোনোভাবেই একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্ম নিরপেক্ষ, শিক্ষিত, সভ্য রাষ্ট্র বলার বা দাবী করার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ নেই।
২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, তখন বাংলাদেশে অন্তত ১ কোটি ১৩ লাখ ৭৯ হাজারের মত সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। আর ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় শতকরা ৮ ভাগে নেমে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের উপর বারবার হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় এই সংখ্যা এখন প্রকৃত হিসেবে কত, সেটি বলা কষ্টকর হলেও, ধারণা করা যায়, এটি শতকরা ৫ ভাগের বেশি হবার কোনো যুক্তি নেই। কারণ, ২০১১ সালের আদমশুমারির পরেও দেশে নিরবে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেশত্যাগের অনেক ঘটনাই ঘটেছে। তাই বর্তমানে দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা শতকরা ৫ ভাগের বেশি হবে না।

এমন তো হওয়ার কথা ছিলনা। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মত মাথা উঁচু করে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার আকাংখা নিয়ে আমরা সবাই সেদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। সেদিনের গানের কলি ছিল, “আমার এ দেশ সব মানুষের, সব মানুষের, কুলি আর কামারের, চাষা আর মজুরের…হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃস্টান এক দেশ সকলের। অথবা, বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে এই জনতা…।” কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের সেই অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের প্রতিশ্রুতি? দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের পরিবর্তে আজ ব্যভিচার, সামাজিক বৈষম্য এবং সবল কর্তৃক দুর্বলের উপর অত্যাচার, বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফলে জীবন ধারণের অধিকার বঞ্চিত হয়ে কত মানুষের স্বপ্ন সাধ আহ্লাদ যে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে, তার খবর কে রাখে? আজও কি, বিচারের বানি নিরবে নিভৃতে কাঁদবে?

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।