বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় মার্চের ৮ তারিখে। সারাবিশ্বে সংক্রমণের সংখ্যা এবং আক্রান্ত দেশগুলির ভয়াবহতা চিন্তা করে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করে। বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাচ কোটি শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত। বাংলাদেশে সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম ধাপে ছুটি শুরু হয় ১৭ মার্চ থেকে পরবর্তী ১৫ দিন। কিন্তু ধীরে ধীরে সংক্রমণ বাড়লে ছুটি বাড়ানো হয়। এক পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশ গড়ার কারিগর শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করেন। দেশে ১৭ই মার্চ থেকে নিয়ে চলতি জুন মাস পর্যন্ত টানা তিনমাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি থাকায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই হাফসে উঠেছে।
বাইরে লকডাউন চলাকালীন কেউ বাইরে বের হতে পারছেনা। ঘোরাঘুরি-খেলাধুলা সব কিছু বন্ধ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার নিমিত্তে সবাইকে ঘরের মধ্যেই সময় কাটাতে হচ্ছে। তিনমাস গত হয়ে গেল, কবে-কখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পারে সেটার নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে একজন শিক্ষার্থী বিরক্ত হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। কথায় আছে “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা”। এই সময়টাকে শিক্ষার্থীরা যেন অলস না কাটিয়ে লাভজনক করতে পারে এজন্য একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কিছু পরামর্শ।
এই সময়টাকে একজন শিক্ষার্থী সমষ্টিগত কার্যক্রম এবং ব্যাক্তিগত কার্যক্রম এই দুই ভাগে ভাগ করতে পারে। সমষ্টিগত কার্যক্রমের মধ্যে যারা নিজ এলাকায় অবস্থান করছি, আমরা এলাকায় পূর্বের কোন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থাকলে সেখানে যুক্ত হয়ে সবাই এক সাথে করোনাকালীন এই মহামারীতে এলাকার মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সচেতন করতে পারি। দুস্থ-অসহায়দের মাঝে সাধ্যমতো ত্রাণ কার্য পরিচালনাসহ অন্যান্য সেবামূলক কাজ করতে পারি। সামাজিক সেবামূলক কাজের বাইরেও এই সময়টাকে গ্রুপ স্টাডির মধ্যেও ব্যায় করতে পারি।
বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই বর্তমানে স্মার্টফোন ব্যবহার করে সেখানে জুম বা অন্যান্য অ্যাপস ব্যবহার করে কয়েকজন বন্ধু একসাথে যুক্ত হয়ে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর তথ্য-উপাত্ত যোগাড় করে আলোচনা করতে পারি। আলোচনার মাধ্যমে জ্ঞান বাড়ে। এভাবে একাডেমিক বিষয়ে বন্ধু-বান্ধব মিলে আলোচনা করা যায়। দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত কার্যক্রম। ব্যাক্তিগত কার্যক্রম বলার আগে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি বা ধাপ নিয়ে একটু কথা বলা যাক৷ যারা এই মুহুর্তে অনার্স প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাদের অনেকেই সেশনজটের কথা চিন্তা করে হা-হুতাশ করে।
কিন্তু বাস্তব বিষয় হল এই সময়ে শিক্ষা কার্যক্রমে একাডেমিক বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে কারো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নাই। কারণ পুরো সিস্টেমটাই বন্ধ হয়ে আছে আবার সচল হলে পুরো সিস্টেম একসাথে সচল হবে। সংগত কারনে হা-হুতাশ না করে আমাদের এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন আমরা ক্লাস, এসাইনমেন্ট এবং অন্যান্য একাডেমিক বিষয়ের কারনে পর্যাপ্ত সময় পাইনা ভাষা শেখা সহ অন্যান্য দক্ষতা অর্জন করার। এই সময়টাকে আমরা বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় সঠিক শব্দচয়ন, শব্দের সঠিক ব্যবহার এবং নতুন শব্দ শেখার ক্ষেত্রে ব্যায় করতে পারি। আমাদের মাতৃভাষায় যখন আমরা কথা বলি তখন বিভিন্ন অসংগতি লক্ষ্য করি। ইংরেজিতে কথা বলতে অনেক শিক্ষার্থী ভয় পায়। এই ভয়ের মূল কারণ চর্চার অভাব। দেখা যায় অনেক শব্দের অর্থ জেনেও অনেকে কথা বলতে সাহস করেনা৷ এই সময় ইউটিউব প্লাটফর্ম ব্যবহার করে আমরা যারা ইংরেজিতে দূর্বল আছি তারা সেটা কাটিয়ে উঠতে পারি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশিরভাগ বই আমাদের ইংরেজি ভাষায় পড়তে হয়, তাই ইংরেজির ভয়কে জয় করতে না পারলে একাডেমিক ক্ষেত্রে তো বটেই বাকি চাকরি ক্ষেত্রে সহ অনেক জায়গায় গিয়েই পিছিয়ে পড়তে হবে। একটি ভাষার চারটি উপাদান। পড়া, লেখা, শোনা এবং বলা। এই চারটি বিষয়ের সাথে বুঝা বিষয়টা সাধারণ ভাবে জড়িত। অর্থাৎ কোন কিছু পড়ে বুঝতে হবে, বুঝে লিখতে হবে, শুনে বুঝতে হবে এবং বুঝে বলতে হবে। এভাবে চারটি উপাদান যদি আমারা বুঝে কোন ভাষা শিখতে পারি তাহলে ভাষা শেখার ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হবে।
আমরা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই স্মার্টফোন ব্যবহার করি৷ এই সময়টাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশিরভাগ সময় ব্যায় না করে অনলাইনে অনেক প্লাটফর্ম আছে ইংরেজি শেখার সেখানে মনোযোগ দেই। বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় যদি দক্ষতা অর্জন না করতে পারি তাহলে অনেক কিছুই অপূর্ণ থেকে যাবে। যাদের লেখালেখির অভ্যাস আছে তারা এই সময়টাতে তাদের লেখালেখির মান ভালো করার কাজে মনোযোগ দিতে পারে। আর যারা লেখালেখি করতে ইচ্ছুক তারা বিভিন্ন উৎস হতে সহায়তা নিতে পারি বিশেষ করে যারা লেখালেখি করে তাদের শরণাপন্ন হতে পারি। মোটকথা, এই লম্বা সময় শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় অপচয় করা , মুভি দেখা এবং অহেতুক কাজে না খরচ করে সময়টাকে কিভাবে লাভজনক করা যায় সেদিকে দৃষ্টি দেই। তাতে সময়ের সঠিক ব্যবহার হলো সেই সাথে নতুন কিছু অর্জনও হলো।
লেখক: মোঃ শফিকুল ইসলাম নিয়ামত
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
* প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বার্তা বাজার-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বার্তা বাজার কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
বার্তা বাজার/সি.কে