কুপ্রস্তাবে রাজি হননি গৃহবধূ: ছেলে-ভাতিজাকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন

ঠাকুরগাঁওয়ে চুরির অপবাদ দিয়ে দুই কিশোরকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

নির্যাতনের শিকার দুই কিশোর হলো- সুমন ও তার মামাতো ভাই কামরুল।

গত ২২ মে জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার সেনগাঁও ইউনিয়নের দেওধা গ্রামে ঘটনাটি ঘটে। এরপর পরিবারটিকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। সুযোগ পেয়ে গত শুক্রবার (৫ জুন) পীরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নির্যাতনের শিকার সুমনের মা ও সুমনের মামাতো ভাই কামরুলের ফুফু সরিফা খাতুন। এরপরই ঘটনাটি জানাজানি হয়।

পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার রায় বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলায় পীরগঞ্জ উপজেলার সেনগাঁও ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলাম, তার সহযোগী মোতালেব আলী, সাইদুর রহমান, আনিসুর রহমান, মনসুর আলী, জিয়াবুল ও আব্দুল লতিফকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পীরগঞ্জ উপজেলার সেনগাঁও ইউনিয়নের দেওধা গ্রামের বাসিন্দা মোতালেব আলী তার প্রতিবেশীর স্ত্রীকে অশালীন প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এতে রাজি ছিলেন না ওই গৃহবধূ।

এরই জের ধরে গত ২২ মে ওই গৃহবধূর ছেলে সুমন (১৩) ও তার ভাতিজা কামরুলকে (১৬) মোবাইল চোর অপবাদ দেন মোতালেব আলী। ওই দিনই স্থানীয় ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলাম, মোতালেব আলীসহ বাকিরা মিলে ওই দুই শিশুকে মামলার ৭ নম্বর আসামি আব্দুল লতিফের বাড়ি নিয়ে যান। সেখানে স্থানীয় গণ্যমান্যদের নিয়ে সালিশ হয়। সেখানে ওই দুই শিশুর হাত-পা বেঁধে মাটিয়ে ফেলে লাঠিপেটা করেন ইউপি সদস্য ও তার সহযোগীরা। আর নির্যাতনের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দিও করেন তারা।

মারপিটের এক পর্যায়ে ইউপি সদস্য ও তার সহযোগীরা ওই দুই শিশুর বাড়িতে গিয়ে ভিডিওটি গৃহবধূ সরিফা খাতুনকে দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। গৃহবধূ চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ইউপি সদস্য ও তার সহযোগীরা গৃহবধূকেও মারধর করে ও শ্লীলতাহানীর চেষ্টা চালায়। সেসময় তারা গৃহবধূর বাড়ি থেকে একটি গরু নিয়ে যায়। এরপর তারা ওই পরিবারটিকে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে ইউপি সদস্য ও তার সহযোগীরা সাদা কাগজে ওই গৃহবধূ, তার ছেলে ও ভাতিজার স্বাক্ষর নেন এবং ওই দুই শিশুকে ছেড়ে দেন।

এ বিষয়ে জানতে ইউপি সদস্য সদস্য জহিরুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূ বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে ইউপি সদস্য ও তার সহযোগীরা আমাদের একঘরে করে রেখেছিল। হাসপাতালেও যেতে দেয়নি। পরে লুকিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আমরা পীরগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি হই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা আমার ছেলে ও ভাতিজাকে হাত-পা বেঁধে অমানবিক নির্যাতন করেছে। আমাকে নির্যাতন ও খারাপ আচরণ করেছে। আমি তাদের কঠোর শাস্তি চাই।’

এদিকে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে একটি মহল তৎপর বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী গৃহবধূর।

সেনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি ঘটনাটি শুনেছি। এটি খুবই নিন্দনীয় কাজ। এর বিচার হওয়া দরকার। তবে আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। আমি নিজ উদ্যোগে ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলামকে কয়েকবার ফোন দিয়েছি। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। লোক পাঠিয়ে তাকে যোগাযোগ করতে বলেছি, এরপরও তিনি যোগাযোগ করেননি বা ফোন ব্যাক করেননি।’

নির্যাতিত পরিবারটির সাথে যোগাযোগ করেছিলেন কি না জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করার আগেই একটি মামলা হয়েছে। সে সেক্ষেত্রে পরিবারটির সাথে যোগাযোগের আর কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনি।’

সেনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি ঘটনাটি শুনেছি। ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলামসহ তার সহযোগীরা মিলে দুই শিশুকে হাত-পা বেঁধে যেভাবে নির্যাতন করেছেন, এটি বড় ধরনের অপরাধ। এর বিচার হওয়া দরকার। তবে এ ঘটনায় আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। আমি নিজ উদ্যোগে ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলামকে কয়েকবার ফোন দিয়েছি, তিনি ফোন রিসিভ করেননি। লোক পাঠিয়ে তাকে যোগাযোগ করতে বলেছি, এরপরও তিনি যোগাযোগ করেননি বা ফোন ব্যাক করেননি।’

নির্যাতিত পরিবারটির সাথে যোগাযোগ করেছিলেন কি না জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করার আগেই একটি মামলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পরিবারটির সাথে যোগাযোগের আর কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনি।’

এদিকে মামলা দায়েরের সাত দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এ ঘটনার পর থেকে ইউপি সদস্য জহিরুল ও তার সহযোগীরা পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার রায়।

তিনি জানান, ‘মামলার তদন্ত চলছে। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

এদিকে মামলা দায়েরের সাত দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে না পারায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বার্তা বাজার/টি.সি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর