সংক্রমণের মাত্র ৯৫ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যায় করোনার উৎপত্তিস্থল চীনকে ছাড়িয়ে গেল বাংলাদেশ। আজ (শনিবার) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া সর্বশেষ তথ্যমতে গত ২৪ ঘন্টায় দেশে নতুন করে আরও এই ভাইরাসটিত আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার… জন।
যার ফলে এখন পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৪ হাজার ৩৭৯ জন। যার চীনের মোট আক্রান্তের তুলনায় ১২৮৫ জন বেশি।
চীনের সরকারি তথ্যমতে দেশটিতে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর। সেদিন ৫৫ বছর বয়সী আক্রান্ত ব্যাক্তিটিই বিশ্বের নতুন করোনা আক্রান্ত রোগী। যা বর্তমানে মহামারী আকার ধারণ করেছে। ৮৩ হাজার ৬৪ জন মানুষকে আক্রান্ত করে ২২ মে জানা গেল সেদিন নতুন করে এই ভাইরাসে দেশটিতে আর কেউ আক্রান্ত হয়নি।
এই ৬ মাস ৫ দিনে দেশটিতে মারা গেছে ৪ হাজার ৬৩৪ জন মানুষ। বিশ্ব পরিসংখ্যান রাখার বিশ্বস্ত ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের মতে এখন মাত্র ৬৫ জন আক্রান্ত ব্যক্তি আছেন দেশটিতে। তারাও হয়ত দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।
আর বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছিল মার্চের ৮ তারিখ। এরপর নির্দিষ্ট গতিতে ক্রমশ বেড়েই চলেছে আক্রান্তের হার। এখনও উর্ধ্বমুখী হয়ে আছে এই হার। ৮ মার্চ দেশে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ জন। তাদের মাঝে দুইজন ছিলেন পুরুষ আর একজন নারী।
এর ঠিক এক মাস পর অর্থাৎ ৮ এপ্রিল দেশে আক্রান্তের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ২১৮ জনে। প্রথম একমাসে মারাও যান ৫ জন। এরপর থেকে বাংলাদেশে আর পিছনে ফিরে তাকায়নি ভাইরাসটি। পরের একমাসে অর্থাৎ ৮ মে তারিখে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়ে গেল ২ হাজার ১০১ জনে। একমাসে দশগুন বৃদ্ধি পাওয়ার পর ৮ জুন অর্থাৎ ৯০তম দিনে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৬৮ হাজার ৫০৪ জনে। বাকী ৫ দিনেই আরও সংক্রমিত হয়েছেন ১৯ হাজার ৮৭৫ জন।
আমরা যদি চীনের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করি তাহলে দেখি চীনে ৬ মাস ৫ দিনে যে পরিমান করোনায় আক্রান্ত রোগী পেয়েছে বাংলাদেশ তার চেয়ে বেশি পেয়েছে মাত্র ৩ মাস ৫ দিনে। চীনের সমান সময়ও যদি বাংলাদেশে এই ভাইরাস থাকে তাহলে বর্তমান খুব সহজ হিসাবে আক্রান্ত হবে দুই-আড়াই লাখ মানুষ।
কিন্তু করোনাতো আর সেই হিসাব মানে না। কারণ এই ভাইরাসটি গত এক মাসে যে পরিমান সংক্রমণ ঘটিয়েছে তা আগের মাসের চেয়ে প্রায় ৩৪ গুনেরও বেশি। এভাবে গুনোত্তর ধারায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে দেশের অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কল্পনাতীত।
আইন না মানার জাতি হিসাবে আমাদের বেশ সুনাম আছে। দেশের উপর মহল থেকে সাধারণ জনগন,সবার মাঝেই সাধারণ একটা প্রবণতা আছে আইঞ না মানার। যেন যে যত আইন ভঙ্গ করবে সেই তত বড় মাপের মানুষ। দেশে যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে তখন যদি সবাই আইন কানুন ঠিকঠাক মেনে চলতো তাহলে আজকে হয় বাংলাদেশকে করোনা নিয়ে এই দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো না।
দেশের প্রথম বড় আকারের সমস্যাটার সৃষ্টি হয় গার্মেন্টস সেক্টরের কর্মীদের নিয়ে করা নাটকের মাধ্যমে। তাদেরকে সাধারণ ছুটি দিয়ে দেওয়ায় তারাও ছুটলো বাড়িতে। আবার ডাকা হলো, তারাও পেটের দায়ে পাহাড় ডিঙানোর মতন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে আসলো।
কিন্তু পরক্ষণেই যখন ঘোষণা দেয়া হলো আবার ছুটি, তখন তারা পড়লো বিপাকে। আবার বাড়িতে ছুটলো। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শহরের ভাড়া বাসায় থাকা খাওয়ার খরচ বাঁচাতেই বাড়ির দিকে এই যাত্রা। প্রচন্ড ভিড় ঠেলে তারা আবারও বাড়ি গেল।
এই সময়টার মাঝে ৪৬ লক্ষ মানুষ সারা দেশের সকল প্রান্তে ভিড়, ঠেলাঠেলি করে যাতায়াত করলো। তাও একবার না, ৩/৪ বার করে। দায় অস্বীকার করলেও সবাই জানে এই সময়টাতেই অনেক ভাইরাস ছড়িয়েছে। হয়ত অজ্ঞ গার্মেন্টস কর্মীরা জেনেশুনে এই কাজটা করেনি। কিন্তু পুতুল নাচের মতন তাদেরকে যারা সূতা ঝুলিয়ে নাঁচালো তাদেরই দায় থেকে যায় অনেকটা। এ যে আইন না মানার এক প্রতিযোগীতা।
তারপর থেকে দেশে ক্রমশই বাড়তে থাকলো সংক্রমণ। এই সময়টায় গার্মেন্টস সেক্টর ছুটি না দিলেও হয়ত আজ আমাদের এই অবস্থায় আসতে হতো না। কারণ, সাধারণত পরিশ্রমী গার্মেন্টসকর্মীরা অযথা কোথাও বেড়াতে যায় না ছুটি না পেলে। আর যদিও বেড়াতে যায় তাহলেও সেটা তাদের অফিসের সহকর্মীদের বাসাতেই বেশিরভাগ সময়।
তার যদি কারখানা থেকে বাসায় যাতায়াত করো তাহলেও এতটা সংক্রমণ বাড়তো না। সামাজিক পর্যায়ে সাধারণের মাঝে এতটা ঝুঁকি নিয়ে আসত না করোনা। এক পক্ষের নাটক আর কামখেয়ালির শিকার হলো সমগ্র দেশবাসী।
সেটাও যদি বাদ দেই তাহলেও আমরা অনেক কিছু দেখতে পাই। যেমন লকডাউন না মানার প্রবণতা। এমনকি হাসপাতালের বেড থেকে করোনা রোগীরাও বাইরে যাচ্ছে বিড়ি সিগারেট কিনতে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ঐ সংবাদটা অনেকের কাছেই কৌতুকের বিষয় হলেও বাংলার মাঠিতে বসবাস করা প্রতিটা মানুষের জন্য ভীতির কারণ।
এখনও সময় আছে, আমাদেরকে সরকারের নির্দেশনা যতটুকু সম্ভব মেনে চলতে হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই। নিজদের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হবে। করোনা কালে ফ্রন্টলাইনাররা যেভাবে আকান্ত হচ্ছে তাতে দেশে চিকিৎসক, নার্স সংকট দেখা দেয়ারও বেশি দেরী নেই। আমদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে আমাদেরকেই লড়াই করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। চীন পারলে আমরাও পারবো।
বার্তাবাজার/এসজে