করোনা: ক্ষতির চেয়ে আতংকটাই যার বেশি

বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে সারা বিশ্বে চলছে আতঙ্ক। বর্তমানে বিশ্বের প্রতিটা মানুষের মুখে প্রতিদিন অসংখ্যবার উচ্চারিত শব্দটির নাম ‘করোনা ভাইরাস’। গত ৩ জুন পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ৬৪ লাখ মানুষ। একই সময়ে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ জন।

মহামারী কোভিড-১৯ নামের এই ভাইরাসের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে বিশ্বের উন্নতসব দেশ। চীন থেকে ছড়ানো এই ভাইরাসে স্থবির হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেনসহ বিশ্বের ধনীসব দেশের মানুষের জনজীবন।

গত ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে এই ভাইরাসটিকে বৈশ্বিক মহামারী হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

যুগেযুগে অনেক মহামারী বিশ্বে তাণ্ডব ঘটিয়েছে। সেগুলোতে আক্রান্ত কিংবা মৃত্যুর হার করোনা ভাইরাসের চেয়ে বহুগুন বেশি। করোনায় আক্রান্তের হিসাব যেখানে এখনও লাখের কোটায়, ওইসব ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যাই ছিল কোটির কোটায়। তবুও করোনার কারণে অচল হয়ে গিয়েছে পৃথিবী। ঘরে বসে সবাই এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করতে গিয়ে থমকে দিয়েছে বিশ্বের অর্থনীতি ও মানব জীবন।

কিন্তু পরিসংখ্যান ঘটলে দেখা যায় করোনা ভাইরাস যতটা না ছড়িয়েছে তার চেয়ে বেশি ছড়িয়েছে তার আতঙ্ক।

বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর বিশেষ কিছু কারণ

বিশ্বে প্রতিদিনই নানা কারণে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হয়। সারাবিশ্বে পরিসংখ্যান রাখার জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যমতে বুধবার (৩ জুন) দুপুর ১টা পর্যন্ত সারা বিশ্বে জন্ম নিয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৯০০ জন মানুষ। আরা মারা গিয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার মানুষ। সংক্রামক রোগের চেয়ে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের সংখ্যা এই তালিকায় অনেক বেশি।

২০১৯ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান জানান, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যান।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছরই মারা যাওয়া প্রচুর মানুষ

২০১৬ সালে ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের এই স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায় বিশ্বের মোট মৃত মানুষের মাঝে প্রতি তিনজনে ১ জনের মৃত্যু হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান বিশ্বের প্রতি ৬ জন মানুষের মাঝে ১ জন।

শতাংশে হিসাব করলে দেখা যায় বিশ্বের ৩২.৩ ভাগ মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ থাকে হৃদরোগ। ক্যান্সারে মারা যায় ১৬.৩ ভাগ মানুষ। আর ফুসফুসের রোগে ভোগে মারা যায় ৫.৮ শতাংশ ।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যাও কম না। বিশ্বের মোট মৃতদের মাঝে আরও ৫.৮ শতাংশ লোক মারা যায় এই রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে। এছাড়াও যুদ্ধ, দাঙ্গা আর সন্ত্রাসের কারণে বিশ্বে ৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় প্রতিবছর।

২০১৯ সালের ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষা দিবসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় বিশ্বে প্রতিবছর রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। আর প্রতিদিন মৃত্যুবরণ করেন প্রায় ৪৫০০ জন।

২০১৭ সালে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ওই বছরে মোট মৃতের মাঝে ১৬ লাখই ছিল ডায়রিয়া রোগী। সড়ক দুর্ঘটনায় ওই এক বছরেই মারা যান ১২ লাখেরও বেশি মানুষ। সে বছর নিওনেটাল ডিজঅর্ডারে মারা যায় বিশ্বের প্রায় ১৮ লাখ নবজাতক।

এছাড়া বায়ুদূষণেও প্রতিবছর বিশ্বে মারা যান প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ। সন্ত্রাস, দাঙ্গা আর যুদ্ধে মারা যাওয়ার ঘটনাতো সবসময়ই চলমান। যদিও সেগুলোর সঠিক পরিসংখ্যান সংশ্লিষ্টরা প্রকাশ করেনা অনেক সময়।

বাংলাদেশে মানুষ মৃত্যুর প্রধান কারনসমুহ

বাংলাদেশে প্রতিদিনই নানা কারণে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এসব মৃত্যুর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মাঝে একটা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা।

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের এক রিপোর্টে জানানো হয়, ২০১৯ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন ৫ হাজার ২২৭ জন। একই কারণে দেশে ২০১৮ সালে মারা গিয়েছিল ৪ হাজার ৩৯ জন।

ছবি: বার্তা বাজার

আর এই দুই বছরে এই কারণে আহত হয়েছিল ১৪ হাজার ৩৭৮ জন। এই সংখ্যার মাঝে অনেকেই আছেন যারা দীর্ঘদিন আহতাবস্থায় চিকিৎসা নিয়ে পরে মারা গিয়েছেন। এছাড়া রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় দেশে মারা গিয়েছেন ২৬২ জন আহত হয়েছেন ৩৫৫ জন। নৌপথে নিখোঁজ আছেন আরও ১১০ জন।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি)’র ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর বাংলাদেশে ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং এর মধ্যে ৯১ হাজার রোগী মারা যান।

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যাও কম না। ২০১৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে প্রতিবছর ১৭ হাজারের মতন শিশু শুধু পানিতে ডুবেই মারা যায়।

গত ৪ মার্চ দেশের করোনায় মৃত্যু সম্পর্কে এক বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ জানান, বাংলাদেশে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন ২৫০০ মানুষ।তাদের মাঝে ৬৫ ভাগ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে আর ২৪ ভাগ মারা যান বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগে।

বজ্রপাতের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও দেশে কম না।

যুগে যুগে যত মহামারীর তাণ্ডব

পৃথিবীতে মানব সভ্যতার শুরু থেকেই যুগে যুগে মহামারী হয়েছে। এসব মহামারীর কোনোটা আবার মৃত্যর মিছিলে যোগ করেছে কোটি কোটি প্রাণকে। ১৭২০ সালে সারা বিশ্বে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল প্রায় ২০ কোটি মানুষ।

প্লেগ রোগের ভয়াবহতা বুঝাতে ১৭২০ সালে আঁকা একটি চিত্রকর্ম

এরপর নানান ধরণের কম শক্তিশালী মহামারীতে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর পর ১৮২০ সালে আবারও ছড়ায় আধূনিক প্লেগ রোগ। এবারও এই রোগে ইহলোক ত্যাগ করেন প্রায় ৫ কোটি মানুষ।

স্পেনীশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মানুষ

১৯১৮ সালে শুরু হওয়া গ্রেট ফ্লু নামের এক ভাইরাস জ্বরে বিশ্বজুড়ে মারা যান ৩ কোটি মানুষ। ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালের ‘স্প্যানীশ ফ্লু’ নামের এক ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে মৃত্যুবরণ করেন আরও ৫ কোটি মানুষ। বিশ্বের ইতিহাসে এই রোগটিকে দ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক’ নামেও আখ্যা দেয়া হয়।

এছাড়া এইচআইভি, জিকা ভাইরাস, নিপাহ ও সার্সের মতন ভাইরাস এই শতকের শুরুর দিক থেকেই বেশ দাপটের সাথে মানুষকে কাবু করে যাচ্ছে।

করোনার পরিসংখ্যান

বিশ্বে কাঁপন ধরানো করোনার সংক্রমণ মূলত শুরু হয়েছিল ১৯৬০ সালের দিকে। বিবর্তনের মাধ্যমে সর্বশেষ ২০১৯ সালে এটি চীন থেকে শুরু করে আক্রমণ।
এই ভাইরাসে সারা বিশ্বে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩০০ জন মানুষ। এই ভাইরাসের আক্রমণে এই পর্যন্ত সারা বিশ্বে মারা গিয়েছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ৭০০ জন মানুষ।

কিন্তু আশার কথা হচ্ছে এখন পর্যন্ত ভাইরাসটি থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৩০ লাখ ৭৭ হাজার ৬২৩ জন মানুষ। যা এখন পর্যন্ত কোনো মহামারীতে সুস্থতার হারে বেশি।

ছবি: বার্তা বাজার

ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ এই সংকটকে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এসেছে। করোনার জন্মস্থান চীনে গত ১৯ দিনে ৯৯ লাখ মানুষকে পরীক্ষা করে নতুন কোনো আক্রান্ত পাওয়া যায়নি।

ভয়াবহ অবস্থায় চলে যাওয়া ইতালিতেও কমেছে সংক্রমণ। স্পেনের বারগুলো চালু হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবার খুলে দেয়া হয়েছে সৌদি আরবের মসজিদগুলো। ধীরে ধীরে পৃথিবীতে আবার প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে।

আমাদের করনীয়

করোনার কোনো কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কার না হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটাকে প্রতিরোধ করা পুরোপুরি সম্ভব। কারণ যুগে যুগে ঘটা মহামারীর তুলনায় করোনা এখনও ততটা ব্যপক হতে পারেনি।

কয়েকদিন আগেও যে সব দেশ করোনায় লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল তারা আজ অনেকটাই সামলিয়ে উঠেছে। এর কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে সেদেশের নাগরিকদের আইন মানা ও নিজেকে সুরক্ষিত রাখার প্রবণতা।

বাংলাদেশ প্রেক্ষপটে উন্নত দেশগুলোর মতো হয়ত বেশিদিন ঘরে বসে থাকা সম্ভব না। কিন্তু সরকার যে সময়টা অঘোষিত লকডাউন হিসাবে পার করেছে সেই সময়টাও যদি দেশের মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলতো তাহলে দেশে আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে এত দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো না।

করোনার স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া কোনো ওষুধ নেই

দেশের প্রশাসন দিনরাত তাদের দায়িত্ব পালন করতে মরিয়া। তারা যে করোনা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রধান ধাপ হচ্ছে মানুষকে জোর করে ঘরে রাখা, চায়ের দোকানে, পাড়া মহল্লাতে অযথা আড্ডা থেকে বিরত রাখা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কাজ করা।

অথচ এই কাজগুলো যদি তাদের না করতে হতো তাহলে করোনার আসল যে যুদ্ধ অর্থাৎ মানুষের ঘরে খাবার পৌছে দেয়া, আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করাসহ সকল কাজ করতে তাদের এতটা বেগ পেতে হতো না।

বাংলাদেশের মানুষ যতটা আতঙ্কে আছে ঠিক ততটাও যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতো তাহলে দেশের করোনা নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই সহজ হয়ে যেত।

পরিশেষে সবার কাছে একটাই অনুরোধ ‘আতঙ্ক নয়, স্বাস্থ্যবিধি মানুন, সুস্থ থাকুন’।

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর