করোনার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সাভারের ইউএনও করোনা পজিটিভ!

করোনা নামক অচেনা প্রাণঘাতি ভাইরাস যখন বিশ্বে তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে করোনার থাবা থেকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের অন্যান্য উপজেলার মত সাভার উপজেলা প্রশাসনও করোনা মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং করোনা সংকট মোকাবেলায় অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে অদ্যাবধি নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

ছবি:বার্তাবাজার।

আর যে মানুষটি এই উপজেলার প্রশাসনিক কান্ডারি, তিনি ইউএনও পারভেজুর রহমান। করোনার ভয়াল থাবা থেকে ষাট লক্ষাধিক সাভারবাসীকে রক্ষা করার নিরন্তর সংগ্রামরত মানুষটি নিজেই আক্রান্ত হলেন করোনা ভাইরাসে!!
ছবি:বার্তাবাজার।

গত মঙ্গলবার (২৬ মে) রাতে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সায়েমুল হুদার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। মুঠোফোনে ডা. মোহাম্মদ সায়েমুল হুদা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, গত শনিবার (২৩ মে) সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সহ মোট ৮৩ জনের (এর ভিতরে এই প্রতিবেদকও রয়েছেন) নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ প্রাণি সম্পদ গবেষনা ইনস্টটিটিউট (বিএলআরআই) এর ল্যাবে পাঠানো হয়।

আজ (২৬ মে) তার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ওই দিনের রিপোর্টে ইউএনও পারভেজুর রহমান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন মেডিকেল অফিসার সহ মোট ২৯ জন করোনা পজেটিভ শনাক্ত হন।

ছবি:বার্তাবাজার।

প্রসঙ্গত, একজন মানবিক ইউএনও হিসেবে সাভারে পারভেজুর রহমান লকডাউন অবস্থায় মৃত্যুভয়ে ভীত এক জনপদে দিনরাত সমানে কাজ করে গেছেন। তিনি এখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করার পর থেকে এই উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভূত উন্নতি হয়েছে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন, স্বাস্থ্যসেবা, মোবাইল কোর্ট ইত্যাদি কর্মকান্ডের মাধ্যমে সাভারের পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক আছে এই লোকটার জন্য। যেখানে আমাদের পাশের কেরানীগঞ্জ ও সিঙ্গাইর উপজেলার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

সবাই যখন নিজেকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টায় লিপ্ত, ঠিক তখনি এই মানুষটি নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা না ভেবে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাবারের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি খাবারের যোগানের সাথে প্রয়োজন নিরাপত্তারও। আর এই সবগুলোর সমন্বয় করে প্রশাসন।

আর একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে এই সমন্বয়ের অংশ হিসেবে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজুর রহমান জুম্মন রাতের অন্ধকারে নিজের নিরাপত্তা আর পরিবারের কথা না ভেবে খাদ্য নিরাপত্তায় ত্রান সামগ্রী বিতরণ থেকে মানুষকে সচেতনতা আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে সাভারের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। করোনার ভয় কে উপেক্ষা করে মানুষের বাড়ি বাড়ি হেঁটে হেঁটে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন। চাইলে তো অন্য কাউকেও পাঠিয়ে তদারকি করতে পারতেন; কিন্তু তা করেন নি।

ত্রাণ সামগ্রীর যাতে সুষ্ঠ বন্টন হয় এবং তিনি নিজেও পরিস্থিতি বুঝতে পারেন তাই নিজেই প্রতিবার গিয়েছেন এবং যাচ্ছেন। এমন কোন দিন নাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাইরে বাইরে টহল দেয়া, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা, বাজার ‘মনিটরিং’ করা ছাড়া বাসায় অলস সময় কাটিয়েছেন তিনি! এমনকি জাতীয় পর্যায়ে 333 থেকে তাঁর কাছে ত্রাণের তালিকা আসে, সেটাও তিনি নিজে দেখে পৌঁছে দিয়ে আসেন!!

এছাড়াও, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহার হিসেবে ত্রাণ (জি আর) সুনির্দিষ্টভাবে উপজেলার নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে পৌঁছে দেয়া হয়েছে এবং চলমান আছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট ফোনকল, এসএমএস বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে কোনো পরিবারের ত্রাণের প্রয়োজন গোচরীভূত হলেই তা প্রদান করা হচ্ছে।

তিনি তাঁর জায়গায় কতটুকু দায়িত্বশীল এবং কর্তব্যপরায়ণ তার একটি উদাহরণ দিয়েই এই প্রতিবেদন শেষ করবো। করোনা পরিস্থিতির ভিতরেই তাঁর আপন ভাই মারা গেছেন। তিনি শুধু জানাজা এবং দাফন করে আবার নিজ কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন শুধুমাত্র তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য। এই অবস্থায় আপনি কি করতেন পাঠক?

বড় ভাইয়ের মৃত্যু পরবর্তী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে তিনি একটি ‘স্ট্যাটাস’ দিয়েছিলেন, তার শুরুর কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম-

“সদ্য ভ্রাতৃহারা পাষাণ আমি। আজ এক সপ্তাহ হল আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি অথচ দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে শোক করার অবকাশও নেই!! এই প্রথম অনুধাবন করলাম সবকিছু অবহেলা করা যায় কিন্তু রাষ্টীয় দায়িত্ব সেটা অবহেলা করা যায় না যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

সাভারের ষাট লক্ষাধিক মানুষের নিরাপত্তার কাছে আমার এই শোকের মাতম খুবই তুচ্ছ!!! চুয়াল্লিশ বছর বয়সী ভাইয়ের অকাল মৃত্যুতেও কত নির্বিকার আমি!! এতগুলো মানুষের নিরাপত্তা, বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাময়িক বেকার পরিবার গুলোর বাড়ি বাড়ি খাবার সরবরাহ, জনসমাগম রোধে চেকিং, প্রবাসীদের হোমকোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকরন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে সহায়তা করা, লকডাউন নিশ্চিতকরন, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরন, ডাক্তারদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরন, আজ আমি নাকি মানবতার ফেরিওয়ালা!!! অথচ আমি নিজের পরিবারের প্রতি কতটা অমানবিক??!!!?”

এমনই চিন্তাধারার একজন মানুষ আমাদের সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান। নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি এই ভয়াল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সমগ্র সাভারবাসী সহ দেশবাসীর অকুন্ঠ ভালোবাসা এবং দোয়া রয়েছে তাঁর প্রতি। তিনি ইনশা আল্লাহ দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও একজন ‘ফ্রন্ট লাইন করোনা সোলজার’হিসেবে সাভারবাসীর পাশে দাঁড়াবেন এই কামনা সকলের।

কারণ ইউএনও পারভেজুর রহমান এমনই একজন মানুষ, যিনি হেরে গিয়ে কখনও ভেঙ্গে যান না, ‘ডিপ্রেশন’ থেকে বেরিয়ে এসে আবারও নতুন করে শুরু করেন। চেষ্টা কখনওই ছাড়েন না তিনি; কারণ তিনি জানেন, রাত শেষে ভোর আসবেই।।

কেএ/বার্তাবাজার

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর