করোনা সচেতন নন ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ

ঠাকুরগাঁওয়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে মাত্র ৭ দিনে। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে আতঙ্ক বেড়ে চলেছে। কিন্তু বাড়েনি সচেতনতা। এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ে মার্কেট-শপিংমল খোলার এক সপ্তাহের যেতেই আবারও বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু থেমে নেই ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের ঈদ শপিং। ভোরের আলো ফুটতেই উঠছে দোকানগুলোর সাঁটার। এটাই ঠাকুরগাঁওয়ের বর্তমান চিত্র।

এদিকে সাধারণ মানুষ যখন ঈদ শপিংয়ে ব্যস্ত তখন ঠাকুরগাঁওয়ের কোভিড যোদ্ধারা ব্যস্ত জীবনের মায়া ত্যাগ করে সাধারণ রোগী, করোনা উপসর্গে আক্রান্তসহ করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দানে। মহান এই পেশায় আগতরা যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন।

ছবি: বার্তা বাজার

তাদের একজন মোঃ জিয়াউল হক জিয়া। তিনি ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের একজন স্বাস্থ্যকর্মী। বৈশ্বিক মহামারিতে মানবজাতি যখন ভয়ে আতঙ্কিত তখন তিনি স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে রয়েছেন সবার সামনের সারিতে। গত পরশু তিনি টানা ১৬২ ঘন্টা করোনা আইসোলেশন ইউনিটে দায়িত্ব পালন শেষে ঘরে ফিরেছেন, আক্রান্তদের খুব কাছাকাছি ছিলেন টানা ৭দিন। বর্তমানে তিনি ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া সম্মুখ সারির এই যোদ্ধার সাথে কথা বলতে চাইলে আমার সুরক্ষার কথা ভেবে প্রাথমিকভাবে রাজি ছিলেন না। আমাকে শর্ত দেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে আসতে। তাঁর বাসার গেটে এলাম। তিনি এলেন, দাঁড়ালেন আমার থেকে তিন মিটারের বেশি দূরত্বে।

তিনি যা বললেন তা শোনার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি জানান, এতদিন ধরে যা শুনে এসেছি তার সবটাই ছিল ভুল। যদি করোনায় আক্রান্ত ১০০ রোগীর মাঝে থেকেও সামাজিক দূরত্ব মানি, সংস্পর্শে না আসি তাহলে আমার করোনা আক্রান্ত হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

ছবি: বার্তা বাজার

তিনি আরও জানান, আমরা করোনা আইসোলেশন ইউনিটে থাকা রোগীদের ইমিউন সিস্টেম বাড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ শাকসবজি, ভিটামিনযুক্ত খাবার ও হাই প্রোটিন ডায়েট প্রদান করেছি। কারণ হিসেবে তিনি জানান, আমাদের শরীর (ইমিউন সিস্টেম) এই ভাইরাসের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে প্রাণপনে চেষ্টা করে। নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম শরীরের অভ্যন্তরে ক্রমাগত প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি বা যোদ্ধা সেল তৈরি করতে থাকে ভাইরাসকে পরাস্ত করতে। ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির গতি অপেক্ষা আক্রান্তের ইমিউন সেলের বংশবৃদ্ধির গতি বেশি হলে দ্রুত এ ভাইরাস থেকে মুক্তি মেলে। আর দুর্বল ইমিউন সিস্টেম হলে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি বেড়ে যাবে ও ফুসফুস ক্রমান্বয়ে পরাস্ত হতে থাকবে ভাইরাসের হাতে।

ছবি: বার্তা বাজার

তিনি তাঁর কথার মাঝে বারবার সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ও নাকে-মুখে হাত দিতে মানা করেন। সংস্পর্শে আসা রোধ করাটাই করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকার একমাত্র হাতিয়ার। সেই সাথে ইমিউন সিস্টেম বাড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ শাকসবজি ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন।

একই ধরণের কথা শোনা গেল ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. মো.মাহফুজার রহমান সরকারের কন্ঠেও। তিনিও জানালেন সামাজিক দুরত্ব মেনে চলা ও নাকে-মুখে হাত না দেওয়ার কথা। ইমিউন সিস্টেম বাড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ শাকসবজি ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনিও। সংস্পর্শে আসা রোধ করাটাই করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ঠাকুরগাঁওবাসীকে সাবধান করার সুরে এই মহামারিতে হাটবাজার, মার্কেট, ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভিড় না জমানোর অনুরোধ করেন সিভিল সার্জন।

অনেকেই হয়ত বলছেন এগুলো ২-৩মাস আগেও শুনেছি। কিন্তু মেনেছি কি আসলে? পুরাতন কথা নতুনভাবে বলার পিছনে রয়েছে বিস্তর কারণ। কেননা, করোনা এখন ঠাকুরগাঁওবাসীর নিকট এক আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। হ্যাঁ আতঙ্কের, তবে সেটা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে ঠিক তখন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এই করোনাভাইরাস থেকে দূরে থাকতে বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। আজ আবার জেনে নেই কী কী সে সব?

• প্রথম এবং প্রাথমিক শর্ত, বার বার হাত ধোওয়া। সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুয়ে নিন। বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে খুব ভাল করে কনুই অবধি হাত ধুয়ে নিন। আঙুলের ফাঁক, নখের কোনা, হাতের উপরিভাগ— সবটাই ভাল করে ধুয়ে নিন।

• বাইরে বেরোতে হলে এড়িয়ে চলুন ট্রেন-বাসের রড, সিঁড়ির রেলিংসহ যত্রতত্র হাত দেওয়ার মতো বদভ্যাস।

• বাসার বাইরে বের হলে বা ভিড়ের মাঝে থাকলে মাস্ক পরবেন কিন্তু কোন কিছু টাচ করে মাস্ক এ হাত দিবেন না। কারণ এতে ভাইরাস হাত থেকে মাস্কের মাধ্যমে নাকে-মুখে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।

• হাতের তালু ঢেকে হাঁচবেন বা কাশবেন না। বরং বাহু ঢেকে হাঁচুন বা কাশুন।

• ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলুন। অনেক লোকের জনসমাগম হয় বা নিকট সংস্পর্শে আসতে হয় এ সব জায়গা এড়িয়ে চলুন। বাজার-দোকান করুন, তবে চেষ্টা করুন সম্ভব হলে অনলাইনেই বেশির ভাগ কেনাকাটা সারতে।

পরিশেষে এটুকুই বলা— আসুন, সামাজিক দুরত্ব মেনে চলি, একে অপরের থেকে কমপক্ষে ৬ফুট বা ৩মিটার দূরে থাকি। নাকে-মুখে হাত দেওয়ার অভ্যাস পরিহার করি। সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুই। জনসমাগম হয় এমন স্থান যেমন- হাটবাজার, মার্কেট, ধর্মীয় উপাসনালয় এড়িয়ে চলি। তবে আসুন আজ সিদ্ধান্ত নেই— এবারের ঈদে আপনার পরিবারকে কি উপহার দেবেন? ভিড়ভাট্টা ঠেলে বিজয়ের হাসিতে কেনা ঈদের পোশাক, নাকি ভয়ডরহীন নিরাপদ জীবন?

বার্তা বাজার/পি.বি

বার্তা বাজার/পি.বি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর